একটা ওয়ানডে দলে কয়জন তারকা থাকে? ক্রিকেটের তিন মোড়ল দাবি করা- ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড দলে ছয় থেকে সাতজনের মতো আছেন। কিন্তু এই তিন দলের মধ্যে কেবল একটা দলই ফাইনালের টিকিট পেয়েছে। অন্য যে দলটা ফাইনালে খেলবে সেই নিউজিল্যান্ডের তারকা (মহাতারকা বলার উপায় নেই) বলতে গেলে দুই কিংবা তার চেয়ে খানিকটা বেশি!
কারা সেই তারকা? একজন হলেন ট্রেন্ট বোল্ট, যিনি তার লাস্যময় চেহারা আর বাঁহাতের তোপে কোহলির স্বপ্ন ভেঙে ছারখার করেছেন। আরেকজন লোকি ফার্গুসন, আগামীদিনের গতিময় বোলিংয়ের সফল বিজ্ঞাপন হতে পারেন যিনি। স্কুল ক্রিকেট থেকে উত্থান, বর্তমান তো চোখের সামনেই ভাসমান। ছয় সপ্তাহ আগে এই তালিকায় মার্টিন গাপটিলকে রাখা যেত, তবে তার ব্যাট কথা না শোনায় আপাতত তাকে রাখা যাচ্ছে না। তবে এই বিশ্বকাপে গাপটিলের পরিচয় ‘বিশেষজ্ঞ ফিল্ডার’!
কিউইদের দলে যিনি সত্যিকার অর্থে তারকা, তার আলোটা পাঁচ বছর ধরে বাড়ছেই। ঠাণ্ডা মাথার সেই অসাধারণ ক্রিকেটারটির নাম কেন উইলিয়ামসন। চলতি বিশ্বকাপে উইকেট অনেকবার দুমুখো আচরণ করেছে, কিন্তু উইলিয়ামসন যেন অতিমানব কেউ। একমাত্র ঝড়ে বক মারলেই যেন তাকে ৪০ রানের নিচে আউট করা সম্ভব! এই বিশ্বকাপে সেটা একবারই হয়েছে এবং সেটা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপপর্বে। ২৭ করার পর রানআউট হন কিউই অধিনায়ক।
উইলিয়ামসনের অভিজ্ঞতা চলতি বিশ্বকাপে একদম খাপে খাপ মিলে গেছে। ‘ও হচ্ছে প্রচণ্ড হিসাবী’ -উইলিয়ামসন সম্পর্কে এমনটাই বলেছেন তার কলেজ টারুঙ্গা বয়েজ কলেজের কোচ জস সিমস, ‘সবসময় ব্যাকরণ মেনে খেলে। খেলার সঙ্গে কখনো আবেগকে মেশায় না। যেকোনো কিছু করার আগে জিজ্ঞেস করে বলে, এটা করলে ফলাফলটা কী?’
বিশ্বকাপে উইলিয়ামসন প্রতিটি ম্যাচেই নিজেকে অন্যভাবে চিনিয়েছেন। সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ছয় মেরে ম্যাচ তো জিতিয়েছেনই, সঙ্গে তুলেছেন সেঞ্চুরিটাও। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করেছেন ক্যারিয়ার সেরা ১৪৮ রান। সেমিতে ভারতের বিপক্ষে কঠিন পরিস্থিতিতে করলেন ৬৭ রান। ফিল্ডিংয়ে দারুণ দুটো ক্যাচ নিলেন। শুধু ক্যাচই ধরেননি একইসঙ্গে নিজের মাথাও ঠাণ্ডা রাখতে হয়েছে তাকে, যা সেই মুহুর্তে বেশ কঠিন ছিল।
বর্তমানে ক্রিকেটে যে চারজন মিডলঅর্ডার ব্যাটসম্যান বিশ্ব মাতাচ্ছেন, তাদের মধ্যে একমাত্র উইলিয়ামসনই তার অধিনায়কত্বকে সেরা বলে প্রমাণ করেছেন। কোহলি দারুণ অধিনায়ক হলেও খুব বেশি আবেগী। বল যেখানে যায় সেখানেই ফিল্ডার সাজাতে চান। জো রুট বড্ড বেশি লাজুক। টেস্টের মতো ওয়ানডেতেও তিনে নেমে রান করছেন ঠিকই, তবে মনে রাখা ভালো তিনি কিন্তু দলে ‘বস’ নন! স্টিভেন স্মিথ তার সময়ে দারুণ ছিলেন, কিন্তু শিরিষ কাগজে বল ঘঁষায় এখনও কলঙ্কিত। তাই তার অধিনায়কত্বও কেড়ে নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।
শুধু অধিনায়ক হিসেবেই নয়, উইলিয়ামসন ব্যাটসম্যান হিসেবেও তার দলের সেরা। হয়তো রোহিত শর্মার মতো অনেক অনেক রান করেননি। কিন্তু এই বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের ৩০ শতাংশ রান এসেছে তার ব্যাট থেকেই। মাত্র ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি উচ্চতার ছিপছিপে শরীর নিয়েই দেশের সমস্ত প্রত্যাশার ভার বইতে হচ্ছে তাকে।
যদি চলতি বিশ্বকাপে সেরা অধিনায়ক হিসেবে কাউকে বাছাই করা হয় সেটা যে উইলিয়ামসনই হবেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দলের সুনামকে আরও বাড়িয়েছেন তিনি। ব্রেন্ডন ম্যাককালামের হাত ধরে ভয়ডরহীন নিউজিল্যান্ডকে চিনেছিল ক্রিকেটবিশ্ব। সেই ছায়া থেকে দলকে বের করে এনেছেন উইলিয়ামসন। ম্যাককালামীয় ক্রিকেট থেকে বের করে এনে বরং দলকে বাস্তববাদী করেছেন তিনি। এই বিশ্বকাপে যদি কেউ ম্যাককালামকে মনে করিয়ে থাকে তবে সেটা ইয়ন মরগান!
খেলার ধরণে তিনি টেস্ট ব্যাটসম্যান। কিন্তু উইলিয়ামসন যে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের রসায়নটাও ভালো জানেন সেটা টের পেয়েছে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। মানুষ হিসেবে উইলিয়ামসন নরম মনের, কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে পেরেকের মতো শক্ত। তার সম্পর্কে স্কুল কোচের মন্তব্যটা তাই যথার্থ, ‘সে মহামানব হতে তৃষ্ণার্ত, কিন্তু বেহিসেবী নয়। আর প্রতিপক্ষকে ছাড় দেয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না।’







