আন্তর্জাতিক

আমেরিকানদের টাকায় গাজা-ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্পের ভুল নীতির বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ?

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কীভাবে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে

গাজা যুদ্ধ ও তেলের দাম: ডুবছে কি রিপাবলিকানরা?

গাজা যুদ্ধ ও তেলের দাম: ডুবছে কি রিপাবলিকানরা?

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

আসন্ন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বাঁকঘোরানো অধ্যায় হতে চলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টি যখন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার স্বপ্ন দেখছে, তখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিশ্বমঞ্চে তাদের অবস্থান এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে।

‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) প্রতিশ্রুতি আজ ম্লান, কারণ মার্কিন নাগরিকদের করের টাকা দেশের উন্নয়নে ব্যয় না হয়ে শর্তহীনভাবে বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ঢালা হচ্ছে। ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক আধিপত্য এবং আমেরিকার বৈশ্বিক একাধিপত্য, উভয়ই আজ খাদের কিনারায়।

স্ট্যাটিস্টিক্যাল ওভারভিউ: ২০২৬ সালের মূল সংকট

গাজায় প্রাণহানি (সেপ্টেম্বর ২০২৬)

৭৩,৬৭০+

AIPAC নির্বাচনী ব্যয়

১০৪.৩ মিলিয়ন ডলার

আহত ফিলিস্তিনি

১,৭৪,৬৮২+

২৫ বছরের অন্তহীন যুদ্ধ এবং আমেরিকার ক্ষয়

গত ২৫ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা দেশটিকে কেবল অর্থনৈতিকভাবেই পঙ্গু করেনি, বরং বিশ্বদরবারে তার গ্রহণযোগ্যতাও কমিয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য, এই দীর্ঘ সময়ে যুদ্ধে অন্তত ৪৫ হাজার মার্কিন সেনা ও মিত্র নিহত হয়েছে এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন, তাঁর মূল প্রতিশ্রুতি ছিল আমেরিকাকে এই অন্তহীন যুদ্ধ (Endless Wars) থেকে বের করে আনা। তিনি সাধারণ আমেরিকানদের কথা দিয়েছিলেন যে, আমেরিকার অর্থ আমেরিকার ভেতরেই ব্যয় হবে। কিন্তু বাস্তবে, সেই প্রতিশ্রুতি বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। নিজের দেশের সীমানা সুরক্ষিত করা বা অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে বিদেশি সংঘাতগুলো অগ্রাধিকার পাওয়ায় সাধারণ ভোটাররা আজ প্রতারিত বোধ করছেন।

গাজার মানবিক বিপর্যয় এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭৩,৬৭০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। এই নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের পরও ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থন বিশ্ব কূটনীতিতে আমেরিকাকে কার্যত একঘরে করে ফেলেছে।

যেখানে কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো নীরব। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের স্বঘোষিত প্রবক্তা আমেরিকা যখন নিরীহ নারী ও শিশুদের হত্যার জন্য অস্ত্র ও অর্থ জোগান দেয়, তখন তা তাদের বৈশ্বিক আধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। মিত্রদের সঙ্গে এই বৈসাদৃশ্য স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এখন আর আমেরিকার নির্দেশনায় চলতে প্রস্তুত নয়। চীন ও রাশিয়া এই ভূ-রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের প্রভাব বলয় দ্রুত বৃদ্ধি করছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব: ইরান সংঘাত ও সাধারণ আমেরিকানদের দুর্ভোগ

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সমর্থন জোগাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের সঙ্গে একটি বৃহত্তর ছায়াযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। জ্বালানি তেলের দাম (Gas Prices) রকেট গতিতে বাড়ছে, যা আমেরিকার ভেতরে মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিচ্ছে।

সাধারণ কর্মজীবী আমেরিকান, যারা মুদি দোকানের বিল মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তারা দেখছেন যে, তাদের উপার্জিত করের টাকা বিদেশে যুদ্ধ উসকে দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের ভেতরে যখন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতের বেহাল দশা, তখন গ্যাস পাম্পে বাড়তি দাম চুকিয়ে বিদেশের যুদ্ধ চালানোকে কোনোভাবেই সমর্থন করছেন না মার্কিন করদাতারা।

রক্ষণশীলদের ক্ষোভ: টাকার কার্লসনের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ

ইসরায়েলকে এই অন্ধ সমর্থন শুধু উদারপন্থীদেরই ক্ষুব্ধ করেনি, বরং কট্টর রক্ষণশীলদের মধ্যেও গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে। রিপাবলিকান পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব টাকার কার্লসন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন।

দোহা ফোরামে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘বোঝা’ (burden) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কার্লসনের মতে, ইসরায়েল ‘সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন একটি দেশ, যাদের নিজস্ব কোনো সম্পদ নেই।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা এর থেকে কী পাচ্ছি? কিছুই না। এটি কেবলই অর্থের অপচয়।’ কার্লসনের এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে বর্তমান রিপাবলিকান নেতৃত্বের শর্তহীন ইসরায়েল বন্দনার কোনো মিল নেই, যা দলের ভেতরে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি করেছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ: আইপ্যাক (AIPAC) ফ্যাক্টর

আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থি লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’-এর নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারা ইতিমধ্যে ১০৪.৩ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।

বিশেষ করে মিশিগানের মতো সুইং স্টেটে প্রগতিশীল আরব-আমেরিকান প্রার্থী ড. আব্দুল এল-সায়েদকে হারাতে এবং মডারেট হেইলি স্টিভেন্সকে জেতাতে আইপ্যাক একাই প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার ঢেলেছে। একটি বিদেশি লবিং গ্রুপ যখন বিপুল অর্থের বিনিময়ে আমেরিকার গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রশ্ন ওঠে, আমেরিকার নীতি আসলে কে নির্ধারণ করছে?

অভ্যন্তরীণ জাগরণ: একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান

ধর্ম বা বর্ণ নয়, বরং মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং মার্কিন করের টাকার সঠিক ব্যবহারের দাবিতে আমেরিকানরা আজ ঐক্যবদ্ধ। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগানের ডিয়ারবর্ন শহরের মেয়র আবদুল্লাহ হাম্মুদের মতো নেতারা এই নতুন রাজনৈতিক জাগরণের অগ্রদূত।

হাম্মুদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আমাদের করের টাকায় দেশের স্কুল, অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ না করে বিদেশে বোমা ফেলার যে নীতি, তার বিরুদ্ধে একটি সৎ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল এই আনকমিটেড ক্যাম্পেইন।’ তাঁরা সাধারণ ভোটারদের বোঝাচ্ছেন যে, আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে পররাষ্ট্রনীতিকে দেশের মানুষের কল্যাণের অধীন করতে হবে, বিদেশের স্বার্থের নয়।

রিপাবলিকান আধিপত্যের সম্ভাব্য অবসান

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল একটি রুটিন নির্বাচন নয়; এটি মার্কিন আধিপত্যবাদ এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি গণরায় হতে চলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানরা যদি তাদের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানকে কেবল ফাঁকা বুলি হিসেবে রেখে দেন এবং ইসরায়েলি লবির স্বার্থকে আমেরিকান করদাতাদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেন, তবে তাদের পতন অনিবার্য।

আমেরিকার সাধারণ মানুষ জেগে উঠেছে। তারা আর এমন কোনো নীতি মেনে নেবে না, যা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে এবং বিশ্বমঞ্চে আমেরিকাকে একটি যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রে পরিণত করে। এই নির্বাচন প্রমাণ করবে যে, আমেরিকার রাজনীতি আর কোটি টাকার লবিং দিয়ে কেনা সম্ভব নয়; বরং এটি নিয়ন্ত্রিত হবে সেই সব মানুষের দ্বারা, যারা আমেরিকার সত্যিকার অর্থে সংস্কার চায়।

বিষয়:Donald Trump US Politics ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাজনীতি রিপাবলিকান পার্টি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…