ময়মনসিংহের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন ‘আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল’ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সংস্কারের অভাবে ১৪৭ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনার বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে, খসে পড়ছে পলেস্তরা। চুরি হয়ে যাচ্ছে লোহার তৈরি বিভিন্ন অংশও। যেকোনো সময় ভবনটির কোনো অংশ ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ১৮৭৯ সালে বিদেশি অতিথিদের থাকার জন্য এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময়ে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত লোহার কুঠিটিতে ব্যবহার করা হয় বার্মা থেকে আনা সেগুন কাঠ, লোহা ও ইস্পাত। ১৪টি কক্ষের এই ভবনটি একসময় ময়মনসিংহের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা ছিল।
স্থাপনাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর নির্মাণশৈলী। ভূমিকম্প প্রতিরোধী কাঠামোতে নির্মিত ভবনটির কক্ষগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে গরমের সময় তুলনামূলক ঠান্ডা এবং শীতের সময় উষ্ণ পরিবেশ পাওয়া যেত। শৈল্পিক কারুকাজে সাজানো এই ভবনটি এখন দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্নে জীর্ণ হয়ে পড়েছে।
আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু গুণী মানুষের স্মৃতি। ১৯২৬ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধী এখানে অবস্থান করেছিলেন বলে জানা যায়। এ ছাড়া লর্ড কার্জন, চিত্তরঞ্জন দাস, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এই স্থাপনায় এসেছেন।
তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই ঐতিহাসিক স্থাপনার ইতিহাস সম্পর্কে জানে না। কারণ স্থাপনাটির সামনে নেই পর্যাপ্ত তথ্যসম্বলিত কোনো পরিচিতি ফলক। ফলে বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থীরাও এর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারছেন না।

আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা।
পর্যটক বিনয় হোসাইন বলেন, ‘এই ক্যাসেলটি ময়মনসিংহের ঐতিহ্য বহন করছে যুগ যুগ ধরে। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিরা এসেছেন। অথচ আজ এটি অবহেলিত।’
নগরীর বাসিন্দা সাংবাদিক কামরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ময়মনসিংহে জমিদার আমলের আরও বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। এগুলো সংরক্ষণ করা হলে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে দেশ-বিদেশের পর্যটক বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
স্কুলশিক্ষার্থী ইয়ার মাহামুদ বলেন, ‘আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল সম্পর্কে এখানে কোনো বোর্ড নেই। এটি কবে, কে এবং কখন তৈরি করেছে, আমরা কিছুই জানি না। একটি তথ্যফলক থাকলে আমরা সহজেই এর ইতিহাস জানতে পারতাম।’
স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। আসমা তাবাসসুম নামে এক অভিভাবক বলেন, তার ছেলে ক্যাসেলের পাশের একটি স্কুলে পড়ে। অভিভাবকেরা অনেক সময় ক্যাসেলের নিচে বসে অপেক্ষা করেন। ‘অনেক সময় ভেতরে লোহা ভেঙে পড়ার শব্দ পাই। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ে। এতে আমরা সবসময় আতঙ্কিত থাকি’, বলেন তিনি।

এদিকে স্থাপনাটিতে দিনের বেলাতেও মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এর নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়েও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সংস্কৃতিকর্মী ও পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, ‘শুধু স্থাপনা ধসে পড়ছে না, ধসে পড়ছে আমাদের ইতিহাস।’ দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সমাজ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে বলেও জানান তিনি।
তবে আলেকজান্দ্রার ক্যাসেল সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, ময়মনসিংহের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ১৪৭ বছরের পুরোনো আলেকজান্দ্রার ক্যাসেলকে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে নয়, ময়মনসিংহের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এতে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও জানতে পারবে এই স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গৌরবময় ইতিহাস।










