চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মোহনীয় সুরগুলোই সুরস্রষ্টা আলম খানকে বাঁচিয়ে রাখবে

সত্তর, আশি ও নব্বই দশকে আধুনিক ও সিনেমার গানে কিংবদন্তী সুরকার আলম খান যে অপার মুগ্ধতা ছড়িয়েছিলেন তা যেনো তার প্রয়াণের মধ্যে দিয়ে ফের প্রতিধ্বণিত হলো। ৮ জুলাই তার প্রয়াণের দিনে প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে বাজছিলো তার সুরের মোহনীয় সব গান। তার সুর ও কম্পোজিশনের বেশিরভাগ গান এখনও সেই আগের মতোই প্রাণময় এবং চিরসবুজ। সময়কে জয় কওে তার অনবদ্য সুরের যে গানগুলো কালজয়ী হয়ে আছে তার সংখ্যাও। গানগুলো প্রাণময় সুরের ছোঁয়ায় উদ্ভাসিত। এই বরেণ্য সুরকারের জন্ম না হলে যে এমন অসংখ্য গান আমরা পেতাম না তা তর্কাতীত। এই বরেণ্য সুরকার বাংলা গানের ভাণ্ডারকে যে শুধু সমৃদ্ধ করেছেন তা নয়, উচ্চ মর্যাদায়ও সিক্ত করেছেন। মোহনীয় সুরের শ্রুতিমধুর গান উপহার দিয়ে আমাদের সিনেমা শিল্পকে ভীষণ সৌন্দর্যময়ও করে তুলেছিলেন তিনি। তার সঙ্গীত পরিচালনার বেশিরভাগ ছবিই ছিল ভীষণ ব্যবসা সফল। আর এই ব্যবসা সফল হওয়ার ক্ষেত্রে ছবির কাহিনীর চেয়ে তার সুরের গানগুলো যে মুখ্য ছিল তা বলাই বাহুল্য। এররকম অনেক অনেক ছবির উদাহরণ দেওয়া যাবে। সেই সব ছবির গানগুলো এখনও কতোটা শ্রোতাদের কাছে টানে তা ইউটিউবের ভিউ দেখেই আঁচ করা যায়।

Reneta June

গত ৮ জুলাই এই অনন্য সঙ্গীতজন সুরের জগত ছেড়ে চলে গেলেন পরপারে। অনেকদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। তিনি চিরকালের জন্য চলে গেলেও রেখে গেছেন কালজয়ী আর জনপ্রিয় সব গান। যে গানগুলো এখন হাটে, মাঠে, ঘাটে সর্বত্র শুনতে পাওয়া যায়। তথ্যপ্রযুক্তির এইকালে যে গানগুলো প্রায়শই সোশ্যাল মিডিয়াতে ফিওে এসে আমাদের স্মৃতিতে হানা দেয়। গানগুলো আমাদের হ্নদয়ে সেই আগের মতোই অনুরণন তোলে।

বিজ্ঞাপন

শৈশবে অ্যার্কডযি়ান ও বেঞ্জো-এই দুই মিউজিক্যাল ইনষ্ট্রুমেন্ট বাজানোর মধ্যে দিয়ে যন্ত্রসঙ্গীতের প্রাতিষ্ঠানিক দীক্ষা নিয়েছিলেন আলম খান। এরপর দীর্ঘ যাত্রায় আর কখনই থামেননি। কেবলই সুর খুঁজেছেন, সুরসৃষ্টির মধ্যে ডুবে থেকেছেন। সত্তর দশকের প্রারম্ভে সত্যিই তিনি দেশের চলচ্চিত্রে সুরের জাদুকর হয়েই এসেছিলেন। ৭০ সালে কাঁচ কাটা হীরে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি একক সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে দর্শক ও শ্রোতানন্দিত হন শ্লোগান’ ছবি দিয়ে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সঙ্গীত পরিচালনা করেন স্মৃতিটুকু থাক, আমার জন্মভূমি, অন্তরালে, লাভ ইন সিমলা, কি যে করি, গুন্ড, রাজরাণী, দোস্ত দুশমন, সারেং বউ, এমিলের গোয়েন্দাবাহিনী’, রজনীগন্ধা, মিন্টু আমার নাম, প্রাণসজনী, প্রতিহিংসা, চ্যালেঞ্জ, রাজদুলারী, আগুনের আলো, আসামী হাজির, জীবন নৌকা, আরাধনা, সোনার চেয়ে দামী, মহেশখালীর বাঁকে, ঘরজামাই, কন্যাবদল, জবাব, বারুদ, বন্দুক, আওয়ারা, লড়াকু, ছোট মা, সখি তুমি কার, কথা দিলাম, হুর এ আরব, যাদুনগর, বাঁধনহারা, প্রতিজ্ঞা, রেশমী চুড়ি, নাত বউ, সিআইডি, গাদ্দার, মৎস্যকুমারী, শারীফ বদমাস, মান সম্মান, ভেজা চোখ, দুইজীবন, অশান্তি, জনি, তিনকন্যা, সোহেল রানা, সততা, মাইয়ার নাম ময়না, অর্জন, স্যারেন্ডার’ ঘৃণা, যুবরাজ, একটি সংসারের গল্প, গৃহবিবাদ, অচেনা, ঘরদুয়ার, বাংলার মা, প্রিয়জন, এক বুক ভালোবাসা, বিদ্রোহী কন্যা, সত্যমিথ্যা, হ্নদয়ের আয়না, তুমি যে আমার, শেষ ঠিকানা, রাক্ষস, বিশ্বপ্রেমিক, অধিকার চাই, প্রিয় শত্রু, আসামী গ্রেপ্তার, বউ শ্বাশড়ি, মাস্টার সামুরাই, ভাঙচুর’, কথা দাও, অন্তরে অন্তরে, ঘরের শত্রু, দুঃসাহস’, বজ্রমুষ্টি, প্রতিবাদ, ত্যাগ, চাচ্চু, বাপের বেটা’সহ আরও অনেক ছবি।

এ সব ছবিতে তিনি রোমান্টিক, স্যাড, আধ্মাত্বিক, লোক- সব ধরনের গানই ফুটিয়ে তোলেন অপূর্ব সুর দিয়ে। আলম খানের প্রতিটি গানই বলা যেতে পারে সুরবৈচিত্র্যে অনন্য এবং অনবদ্য। সিনেমাতে তার সুরের গানগুলো দর্শকদের হৃদয়ে এতোটাই প্রভাব ফেলে যে, হয়ত একটি গানের কারণেই সিনেমা মারাত্মক ব্যবসা সফল হয়েছে। এটা সত্য, আমাদের এই উপমহাদেশে গান ছাড়া সিনেমা অচল। সত্তর, আশি ও নব্বই দশকে সেই ছবি বেশি ব্যবসা সফল যে ছবির গান দর্শকদের হ্নদয় জয় করেছে। তবে শুধু হ্নদয় জয় বলে কথা নয়, আলম খানের সুরের গানগুলো যন্ত্রের ব্যবহারেও দেখা গেছে নতুনত্ব।

আলম খানের অনবদ্য সুরের সিনেমার গানের তালিকা অগুনতি। ওরে নীল দরিয়া’ (ছবি: সারেং বউ, শিল্পী: আব্দুল জব্বার), চাঁদের সাথে আমি দেবনা তোমার তুলনা’ (ছবি: আশীর্বাদ, শিল্পী: রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর), ডাক দিয়েছেন দয়াল আমারে’ (ছবি: বড় ভাল লোক ছিল, শিল্পী: এন্ড্রু কিশোর), আমি চক্ষু দিয়া দেখতেছিলাম জগত রঙিলা ( ছবি: বড় ভালো লোক ছিল, শিল্পী: সৈয়দ আব্দুল হাদী), তোরা দ্যাখ তোরা দ্যাখ, দ্যাখরে চাহিয়া (ছবি: বড় ভালো লোক ছিল, শিল্পী: এন্ড্রু কিশোর), ভালবেসে গেলাম শুধু ভালবাসা পেলাম না’ (ছবি: কেউ কারো নয়, শিল্পী: এন্ড্রু কিশোর ), কী জাদু করিলা পিরিতি শিখাইলা’ (ছবি: প্রাণসজনী, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোর ), প্রেম করেছ তুমি আর মন দিয়েছি আমি ( ছবি রাজদুলারী: খুরশীদ আলম ও রুনা লায়লা), তোমায় একদিন আমায় না দেখিলে’ (ছবি: দুই জীবন, শিল্পী: রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর), কী সুখ তুমি পাও (ছবি: শ্লোগান, শিল্পী: আব্দুল জব্বার) কারে বলে ভালবাসা কারে বলে প্রেম’ (ছবি: মান-সম্মান, শিল্পী: এন্ড্রু কিশোর ), ওগো তুমি যে আমার কত প্রিয়’ ( লাভ ইন সিমলা, শিল্পী: ফেরদৌস ওয়াহিদ), সবাইতো ভালবাসা চায়’ (ছবি: স্যারেন্ডার, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোর), জীবনের গল্প বাকি আছে অল্প’ (ছবি: ভেজা চোখ, শিল্পী: এন্ড্রু কিশোর), তুমি যেখানে আমি সেখানে’ (ছবি: নাগপূর্ণিমা, শিল্পী: এন্ড্রু কিশোর), চোর আমি ডাকু আমি (ছবি: জনি, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন এন্ড্রু কিশোর), আমার পৃথিবী তুমি, তোমার পৃথিবী আমি ( ছবি: আসামী হাজির, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমীন ও ফেরদৌস ওয়াহিদ), বান্ধা তুলেছে দুহাত কবুল করো মোনাজাত (ছবি: প্রতিজ্ঞা, শিল্পী: খুরশীদ আলম, আন্জুমান আরা বেগম, সাবিনা ইয়াসমিন), মনে বড় আশা ছিল তোমাকে শোনাবো গান’ (ছবি: আরাধনা, শিল্পী: শাম্মী আখতার), তুমি আছ সবই আছে’ (ছবি: সখি তুমি কার, শিল্পী: আব্দুল জব্বার), ভুল না আমাকে ভুলে যেওনা’ ( ছবি: জীবন নৌকা, শিল্পী: রুনা লায়লা), তুমি কি এখন আমারি কথা ভাবছ (ছবি: জীবন নৌকা, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো ( ছবি: রজনীগন্ধা, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), কথা দাও আমাকে বন্ধু ( ছবি: আওয়ারা, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), তুমি বলে ডাকলে বড় মধুর লাগে’ (ছবি: আরাধনা, শিল্পী: খুরশীদ আলম), আমি তোমার বধু তুমি আমার স্বামী’ (ছবি: আরাধনা, শিল্পী: শাম্মী আখতার), তোমরা কাউকে বলনা’ (ছবি: বিশ্বপ্রেমিক, শিল্পী: সৈয়দ আব্দুল হাদী ও রুনা লায়লা), কে বলে আমি ভালো না’ (ছবি: সৎ মানুষ, শিল্পী: সৈয়দ আব্দুল হাদী), তুমি আশা ভালোবাসা’ (ছবি: ঘর দুয়ার, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), জীবন যতদিন থাকবে আমার’ ( ছবি: বাংলার মা, শিল্পী: সৈয়দ আব্দুল হাদী ও সাবিনা ইয়াসমিন), কি দিয়া মন কাড়িলা ও বন্ধুরে’(ছবি: অশান্তি, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), তুমি আরও কাছে আসিয়া’ (ছবি: অশান্তি, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোর), বুকে আছে মন’ (ছবি: লড়াকু, শিল্পী: রুনা লায়লা এবং এন্ড্রু কিশোর), কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক’ ( ছবি: অচেনা, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), তোমাকে যুগে যুগে ভালোবাসিব’ (ছবি: বিদ্রোহী কন্যা, সাবিনা ইয়াসমিন), আজ এই রাতে কিছু কথা আছে এসোনা বলি কানে কানে’ (ছবি: গাদ্দার, শিল্পী রুনা লায়লা), আমার এ ঘর যেনো স্বর্গ’ ( ছবি: সত্যমিথ্যা, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন), মন্দ হোক ভালো হোক বাবা আমার বাবা (ছবি: সত্যমিথ্যা, শিল্পী: শাম্মী আখতার), প্রেম করিতে মানা, আমি মিস রুনা ( ছবি: প্রতিজ্ঞা, শিল্পী: রুনা লায়লা), একবার যদি জানতাম আমি অন্তর কোথায় থাকে ’ (ছবি : একটি সংসারের গল্প, সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোর), তুমি চাঁদের জোসনা নও, তুমি ফুলের উপমা নও’ (ছবি: হ্নদয়ের আয়না, শিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোর), কেন আখিঁ ছলো ছলো’ (ছবি: হ্নদয়ের আয়না, শিল্পী: আগুন), আমি পাথরে ফুল ফোঁটাবো’ (ছবি: শেষ ঠিকানা, শিল্পী: এন্ড্রু কিশোর), তুমি যে আমার শুধু তুমি যে আমার’ (ছবি: তুমি যে আমার, শিল্পী: সাবিনা ও এন্ড্রু কিশোর), টুপ টুপ বৃষ্টি ঝরছে’ ( ছবি: ঘৃণা, শিল্পী: রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর), জীবনে সাধ হলো আরও একবার’ (ছবি: সততা, শিল্পী: রুনা লায়লা ও এন্ড কিশোর), একবুক ভালোবাসা তোমায় দিলাম’ (ছবি: একবুক ভালোবাসা, শিল্পী: কুমার বিশ্বজিত ও রুনা), বন্ধু আমার থাকে লন্ডন’ (ছবি: প্রিয় শত্রু, শিল্পী: রুনা লায়লা), হায় হায় হায় তার হাতে ছোঁয়ায়’ ( ছবি: যুবরাজ, শিল্পী: রুনা লায়লা), হ্যালো হ্যালো খেলা শুরু হলো’ ( ছবি : চ্যালেঞ্জ, রুনা লায়লা), কি কথা বলে চন্দ্র তারা’ (ছবি: মাস্টার সামুরাই, শিল্পী: রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর), কালতো ছিলাম ভালো আজ আমার কী হলো’ (ছবি অন্তরে অন্তরে, শিল্পী: রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর রনা), দুই নয়নে তোমায় দেখে নেশা কাটেনা, ( ছবি: মাইয়ার নাম ময়না, শিল্পী: রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর)।

রেডিওর গানেও তার রয়েছে অনবদ্য সব সৃষ্টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মো. রফিকুজ্জামানের কথায় রুনা লায়লার গাওয়া আমাকে দেখার সে চোখ তোমার কইগো, জাহিদুল হকের কথায় সুবীর নন্দীর কণ্ঠে ‘একটি গল্প বলার ছিল, মো. রফিকুজ্জামানের কথায় সুবীর নন্দী ও শাম্মী আখতারের কণ্ঠে ‘দেখো দেখো ঐ যে হিজল, মুকুল চৌধুরীর কথায় সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘এইতো এই চলে গেল,-এরকম আরও অনেক গান রয়েছে।

দু চার কথা লিখে এই সঙ্গীতজনের মূল্যায়ন করা অসম্ভব। তবে সত্যটা হলো তার জন্ম না হলে সত্যিই আমরা পেতাম না মনোমুগ্ধকর সুরের সব গান। যে গান কেবলই স্মৃতি জাগানিয়া, যে গান কেবলই আমাদের মনকে উদ্বেলিত করে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)