স্মার্ট টিভিতেও ছড়াতে পারে এআই, কী বলছে অ্যানথ্রপিকের গবেষণা?

স্মার্ট টিভি, ফ্রিজ, সিসি ক্যামেরা কিংবা স্মার্ট ওভেনের মতো ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এমনকি এ জন্য বড় কোনো ডেটা সেন্টারেরও প্রয়োজন নাও হতে পারে। ছোট আকারের এআই মডেলগুলো আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নিজেকে অন্য যন্ত্রে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা।
আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষণা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান-‘অ্যানথ্রপিকে’র ফ্রন্টিয়ার রেড টিমের গবেষক উইলিয়াম ঝৌ ও ড্যানিয়েল ফ্রিম্যানের মতে, কম খরচের এবং তুলনামূলক কম সুরক্ষিত ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্রগুলো এ ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এ ধরনের কাজ করার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা গবেষকদের।
কী এই স্বয়ংপ্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম এআই?
স্বয়ংপ্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম এআই এমন একটি ব্যবস্থা, যা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজের কার্যকর অনুলিপি তৈরি করতে পারে অথবা অন্য কম্পিউটার ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত যন্ত্রে নিজের কোড ছড়িয়ে দিতে পারে। এটি অনেকটা কম্পিউটার ওয়ার্মের মতো, যা নিজে থেকেই এক যন্ত্র থেকে অন্য যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গবেষকদের আশঙ্কা, সস্তা ও দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার আইওটি যন্ত্রে এমন এআই ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। কারণ, এসব যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার নাও থাকতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তবে এ ধরনের বিস্তার ধীরগতির হতে পারে এবং সংক্রমিত যন্ত্রের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
অ্যানথ্রপিকের গবেষকেরা তিনটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। প্রথম পরীক্ষায় প্রায় পাঁচ হাজার রুপি দামের ১৫টি কমদামি অ্যান্ড্রয়েড টিভি বক্স একসঙ্গে যুক্ত করে একটি বড় এআই মডেল চালানো হয়। এতে মডেলটি কাজ করতে পারলেও গতি ছিল খুব ধীর।
দ্বিতীয় পরীক্ষায় ছোট একটি এআই মডেলকে নয় ধরনের হার্ডওয়্যারে চালানোর চেষ্টা করা হয়। ছোট বোর্ড থেকে শুরু করে ডেস্কটপ কম্পিউটার পর্যন্ত বিভিন্ন যন্ত্রের মধ্যে আটটিতে মডেলটি চালু করতে সক্ষম হন গবেষকেরা।
তৃতীয় পরীক্ষায় আটটি কম্পিউটার নিয়ে একটি কৃত্রিম নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়। সেখানে একটি এআই মডেল পাঁচবারের মধ্যে চারবারই নিজেকে আটটি কম্পিউটারে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। অন্যবার সাতটি কম্পিউটারে ছড়াতে পারে। তবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অন্য মডেলগুলো প্রায় প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এখনো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া কোনো এআই প্রতিলিপি তৈরির ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। তবে এ ধরনের বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় পৃথক কাজগুলো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এআই এজেন্টগুলোর সক্ষমতা বাড়ছে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় করনীয় কী?
গবেষকদের মতে, ইন্টারনেট সেবাদাতারা অস্বাভাবিক নেটওয়ার্ক কার্যক্রম শনাক্ত করে আক্রান্ত বাড়ির সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন। মিরাই বটনেটের আগের একটি অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, গ্রাহকদের সতর্ক করে ব্যবস্থা নেওয়ায় ১৪ দিনে ৯২ শতাংশ সংক্রমণ দূর করা সম্ভব হয়েছিল। গ্রাহকদের না জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৭৪ শতাংশ।
এ ছাড়া স্মার্ট যন্ত্রের নির্মাতাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যের বাজারে আইওটি যন্ত্রে ডিফল্ট পাসওয়ার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বিধিনিষেধ রয়েছে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
ব্যবহারকারীদেরও স্মার্ট টিভি, রাউটার, সিসি ক্যামেরা ও অন্যান্য স্মার্ট যন্ত্রের ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা এবং নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা উচিত। এসব পদক্ষেপ এআই-নির্ভর সম্ভাব্য আক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষকদের সতর্কবার্তা, ভবিষ্যতে ধীরগতিতে ছড়িয়ে পড়া এ ধরনের এআই আরও দ্রুত ও জটিল সাইবার আক্রমণের পথ তৈরি করতে পারে। তাই এখন থেকেই যন্ত্রের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও নেওয়া প্রয়োজন।






