এআইয়ের কারণে হুমকিতে পড়তে পারে বিশ্বের ডিজিটাল অবকাঠামো

ছবি: সংগৃহীত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির উন্নয়নে একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি বাড়ছে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি। উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে একের পর এক সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করছেন গবেষকেরা। এতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে একটি অলাভজনক প্রোগ্রামিং ফাউন্ডেশন গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটির কথা জানালে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ ওয়েবসাইট পরিচালকদের জরুরি ভিত্তিতে সফটওয়্যার হালনাগাদের নির্দেশ দেয়। ‘পিএইচপি২শেল’ নামের এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা বিভিন্ন সিস্টেমে প্রবেশ করতে পারত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা ত্রুটিগুলো শনাক্ত করেন।
বহুল ব্যবহৃত ওপেন সোর্স ওয়েব প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির (PHP) কোডে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব দুর্বলতা ছিল। তবে উন্নত এআই প্রযুক্তি ছাড়া মানুষের পক্ষে সেগুলো কাজে লাগানো অত্যন্ত জটিল হওয়ায় এত দিন বিষয়টি নজরে আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পিএইচপি২শেল হতে পারে এআইয়ের মাধ্যমে সামনে আসা অসংখ্য নিরাপত্তা ত্রুটির প্রথম উদাহরণ। কারণ, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর বড় অংশ পরিচালিত হয় স্বেচ্ছাসেবীদের তৈরি সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এসব প্রকল্পের অনেকেরই নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত অর্থ, জনবল ও সময় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) ফিউচারটেকের গবেষক পিটার স্ল্যাটারি বলেন, এআইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব প্রথম যেসব ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, সাইবার নিরাপত্তা তার অন্যতম বলে অনেক দিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা।
স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভরশীল ডিজিটাল বিশ্ব
১৯৯৫ সালে ডেনিশ-কানাডীয় প্রোগ্রামার রাসমাস লেরডর্ফ নিজের অনলাইন জীবনবৃত্তান্ত কতজন দেখছেন, তা জানার জন্য পিএইচপি তৈরি করেন। পরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রোগ্রামাররা এতে নতুন সুবিধা যুক্ত করেন। একপর্যায়ে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের বৈশিষ্ট্য হলো, যে কেউ এটি ডাউনলোড, পরিবর্তন ও উন্নয়নের পর অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। ফেসবুক ও উইকিপিডিয়ার মতো ওয়েবসাইট তৈরিতেও পিএইচপি ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইট পরিচালনায় এই প্রোগ্রামিং ভাষার ভূমিকা রয়েছে।
২০২১ সালে পিএইচপির উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। তবে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করা অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো এ ফাউন্ডেশনও সীমিত অর্থায়নে পরিচালিত হয়।
বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যবহৃত ডিজিটাল অবকাঠামোর বড় অংশই ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল। মোজিলা ফায়ারফক্স ব্রাউজার, পার্ল, পাইথন ও জাভাস্ক্রিপ্টের মতো প্রোগ্রামিং ভাষা এবং ইন্টারনেটে কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন সফটওয়্যারও এর অন্তর্ভুক্ত। এসব সফটওয়্যারের অনেকগুলোই স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
ওপেন সোর্স সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওপেনইউকের প্রধান নির্বাহী আমান্ডা ব্রক বলেন, বর্তমানে মালিকানাধীন সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানসহ পুরো বিশ্বই ডিজিটাল অবকাঠামোর জন্য ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল।
মেটা, গুগল, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এসব সফটওয়্যার ব্যবহার করে। কিন্তু এখন তাদের তৈরি এআই প্রযুক্তিই দ্রুতগতিতে এসব সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে বের করছে। ফলে স্বল্প অর্থায়নে পরিচালিত ফাউন্ডেশনগুলোর পক্ষে প্রয়োজনীয় গতিতে ত্রুটিগুলো সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আমান্ডা ব্রকের ভাষ্য, শনাক্ত হওয়া সব নিরাপত্তা দুর্বলতা দূর করার মতো সক্ষমতা বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের নেই। ছোট ফাউন্ডেশনগুলোর হাতে শত শত কোটি ডলারের তহবিলও নেই। এআই যে গতিতে ত্রুটি শনাক্ত করছে, সেই গতিতে সেগুলো সমাধান করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্তে বাড়ছে চাপ
উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করে পিএইচপি২শেলের ত্রুটিগুলো শনাক্ত করা হয়। এসব মডেল মানুষের তুলনায় অনেক বেশি জটিল পদ্ধতিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করতে পারে। ফলে আগে যেসব দুর্বলতা শনাক্ত করা কঠিন ছিল, সেগুলোও সামনে আসছে।
গুগল জানিয়েছে, তাদের ক্রোম ব্রাউজারের সর্বশেষ হালনাগাদে এক হাজারের বেশি নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। আগের ২৪টি হালনাগাদে মিলিয়েও এত ত্রুটি পাওয়া যায়নি। একইভাবে ফায়ারফক্স ব্রাউজারের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মোজিলা জানিয়েছে, গত এপ্রিলে তারা ৪০০টির বেশি নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করেছে। এর আগের রেকর্ড ছিল মাত্র এক মাস আগে শনাক্ত হওয়া ৭৬টি ত্রুটি।
অ্যাপাচি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা দলের সদস্য জারেক পোটিউক বলেন, এআই ব্যবহারের কারণে তাদের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি নিরাপত্তা সমস্যা সামনে আসছে।
তার মতে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশন এখন এআই মডেল ব্যবহার করে সফটওয়্যারের নিরাপত্তা পরীক্ষা করছে। তবে এ কাজেও খরচ রয়েছে। এআই মডেল ব্যবহারের জন্য অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি শনাক্ত হওয়া প্রতিটি ত্রুটি মানুষের মাধ্যমে যাচাই করতে হয়। কারণ, এআই অনেক সময় ভুলভাবেও নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারে।
এদিকে চলতি বছরের শুরুতে অ্যানথ্রপিক ‘প্রজেক্ট গ্লাসউইং’ চালু করে। এর আওতায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারের নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে বের করতে তাদের উন্নত এআই মডেল ক্লদ মিথোস ব্যবহারের জন্য ১০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ক্রেডিট দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এক মাসে এক হাজারের বেশি ওপেন সোর্স প্রকল্পে ২৩ হাজারের বেশি নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হয়।
অন্যদিকে অ্যাপাচি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশনের ২৯০টি সফটওয়্যার প্যাকেজের নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে সহায়তা করছে ‘আলফা-ওমেগা’ প্রকল্প। অ্যানথ্রপিক, অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পরিচালিত এ প্রকল্পে বছরে প্রায় ৭০ লাখ ডলার ব্যয় করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও বেশি অর্থ ও জনবল বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। কারণ, বিনা মূল্যে পাওয়া ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক পণ্য ও সেবা পরিচালনাই সম্ভব নয়।
পোটিউকের মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়তা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। করপোরেট বিশ্ব এসব সফটওয়্যার থেকে বিপুল সুবিধা পেলেও সেগুলোর উন্নয়ন ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব অনেকাংশে থেকে যাচ্ছে সীমিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ওপেন সোর্স সম্প্রদায়ের।
বাস্তব দুনিয়ায় সাইবার হামলার আশঙ্কা
ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ঝুঁকির ভয়াবহতা এর আগেও দেখা গেছে। ২০২১ সালে অ্যাপাচি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশনের রক্ষণাবেক্ষণ করা বহুল ব্যবহৃত একটি সফটওয়্যার লাইব্রেরিতে ‘লগ৪শেল’ নামের একটি গুরুতর দুর্বলতা শনাক্ত হয়। এর মাধ্যমে হ্যাকাররা দূর থেকেই লাখ লাখ ডিভাইসে ক্ষতিকর কোড চালাতে পারত। তখন অবশ্য এআই ব্যবহার করে ত্রুটিটি শনাক্ত করা হয়নি।
অ্যাপাচি ফাউন্ডেশনের সদস্য জারেক পোটিউক বলেন, ওই দুর্বলতার কারণে গাড়ি, মাইক্রোওয়েভ ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র ঝুঁকির মুখে পড়ে। ঘটনাটি পুরো প্রযুক্তি খাতকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, ওপেন সোর্স সফটওয়্যারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
তার মতে, কোনো বড় নিরাপত্তা ত্রুটি যদি ক্ষতিকর হ্যাকারদের হাতে পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট ডিভাইস হালনাগাদের আগেই তারা সেটি কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
এমআইটির গবেষক পিটার স্ল্যাটারি বলেন, তার সহকর্মীদের তৈরি সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার তথ্যভান্ডারে দেখা যাচ্ছে, একদিকে যেমন আগের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনাও বাড়ছে।
তিনি বলেন, অনেক আগে থেকেই বিশ্ব এ ধরনের পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। এখন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা ও যন্ত্রের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শনাক্ত হওয়া নিরাপত্তা দুর্বলতার কিছু অংশ বাস্তবে কাজে লাগানো হবে কি না, তা এখন সময়ের ব্যাপার।





