তালেবানরা মেয়েদের ক্রিকেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার উপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা জারির মতো সিদ্ধান্ত নেয়ায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ খেলবে না অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডে সুপার লিগের অংশ তিন ম্যাচের সিরিজটি মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাতে হওয়ার কথা ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরই আফগানদের বিপক্ষে না খেলার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে বিবৃতিও দিয়েছে সিএ।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলীয় সরকারসহ এর সঙ্গে যুক্ত নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০২৩ সালের মার্চে আইসিসি সুপার লিগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নির্ধারিত অস্ট্রেলিয়া এবং আফগানিস্তানের তিন ম্যাচের ছেলেদের ওয়ানডে সিরিজটি হবে না।
এ সিদ্ধান্তটি তালেবানরা মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, পার্ক এবং জিমে যাওয়ার ক্ষমতার উপর আরও বিধিনিষেধের সাম্প্রতিক ঘোষণার প্রেক্ষিতে নেয়া হয়েছে।
তালেবান সরকারের নীতির কারণে সিএ ২০২১ সালের নভেম্বরে হোবার্টে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট খেলার সিদ্ধান্ত বাতিল করেছিল। যদিও সম্প্রতি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে আফগানদের বিপক্ষে খেলেছে অস্ট্রেলিয়া। দল দুটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চারবার মুখোমুখি হলেও টেস্টে কখনোই খেলেনি।
অস্ট্রেলিয়ার আগামী ফিউচার ট্যুর অনুযায়ী চক্রে আরও দুবার আফগানিস্তানের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে তিন ম্যাচের টি-টুয়েন্টি এবং ২০২৬ সালের আগস্টে অস্ট্রেলিয়া সফরে একটি টেস্ট এবং তিনটি টি-টুয়েন্টি খেলার কথা রয়েছে।
মেয়েদের ক্রিকেট প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজন করছে আইসিসি। ১৪ জানুয়ারি থেকে আসরের পর্দা উঠবে। ১৬ দলের টুর্নামেন্টে আইসিসির পূর্ণ সদস্য আফগানিস্তান অংশ নিচ্ছে না। দেশটিতে তালেবান শাসন ফিরে আসায় মেয়েদের সকল প্রকার খেলাধুলা বন্ধ রয়েছে।
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তালেবানদের অধীনে মেয়েদের ক্রিকেটে আফগানিস্তানে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অদূর ভবিষ্যতেও সম্ভাবনা না থাকায় আইসিসিও উদ্বিগ্ন। মার্চে সংস্থাটির পরবর্তী বোর্ড সভায় বিষয়টি আলোচনায় উঠতে চলেছে।
ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থার সিইও জিওফ অ্যালার্ডিস ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, ‘মার্চে আমাদের বোর্ডের পরবর্তী সভায় এ বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। কারণ আফগানিস্তান মেয়েদের দল ছাড়াই একমাত্র দেশ হিসেবে পূর্ণ সদস্য রয়ে গেছে।’
তালেবান শাসন ব্যবস্থা জারির পর মেয়েদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার উপর অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আইসিসির সিইওর মতে, এতে মেয়েদের ক্রিকেটে অগ্রগতির সম্ভাবনাগুলো সম্প্রতি আরও ক্ষীণ হয়ে উঠেছে।
‘অবশ্যই, আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। আমাদের বোর্ড শাসন পরিবর্তনের পর থেকে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে। এটি উদ্বেগের বিষয় যে আফগানিস্তানে অগ্রগতি হচ্ছে না। আমরা যতদূর অবগত, এই মুহূর্তে সেখানে মেয়েদের ক্রিকেটের কার্যকলাপ নেই।’
তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর থেকে অনেক আফগান মেয়েরা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে কিংবা চলে যেতে চেয়েছেন। কাবুলে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (এসিবি) সদর দপ্তরে বেশ কয়েকজন নারী কর্মরত ছিলেন। তারা আর অফিসে আসছেন না। বেশ কয়েকজন বিদেশ চলে গেছেন বলে খবর।
২০২১ সালে তালেবানরা ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানে ক্রিকেট পর্যালোচনা করার জন্য গ্লোবাল গভর্নিং বডির একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ করেছিল। আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজার নেতৃত্বে গ্রুপটি গত বছরের নভেম্বরে আফগানিস্তান সরকার এবং ক্রিকেট কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছিল। তালেবান মুখপাত্র সুহেল শাহীন সেই বৈঠকে ছিলেন। দেশটির সরকার মেয়েদের ক্রিকেটের উন্নয়নে নীতিগতভাবে সম্মত হওয়াসহ আইসিসির গঠনতন্ত্র মেনে চলার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছিল।
বাস্তবে মেয়েদের খেলাধুলা পুনরায় শুরু করতে কোনো উদ্যোগ এবং উৎসাহ দেয়ার জন্য কিছুই করা হয়নি। এমনকি ঘরোয়া কাঠামোকে প্রসারিত করতে এবং ক্রিকেটকে নতুন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রচেষ্টাকালেও সেই চেষ্টা করা হয়নি। ছেলেদের ক্রিকেটের জন্য বয়স থেকে সিনিয়র লেভেল পর্যন্ত সব ফরম্যাটে ছয়টি টুর্নামেন্ট রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মেয়েদের ক্রিকেটে কোনো বিনিয়োগ করা হয়নি দেশটিতে। আফগানিস্তান একমাত্র দেশ, যাদের ক্রিকেটে মেয়েদের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও আইসিসির পূর্ণ সদস্যের মর্যাদা টিকিয়ে রেখেছে।
এসিবির পরিচালক আসাদ উল্লাহ বলেছেন, ‘আফগানিস্তানে মেয়েদের ক্রিকেট সবসময় একটি উত্তপ্ত ইস্যু ছিল এবং আমি এখনই এর কোনো সমাধান দেখতে পাচ্ছি না। এটা একটা সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ হবে। আমাদের দেশে খুব কমই মেয়েদের খেলোয়াড়দের পুল আছে। আসলে তালেবান ক্ষমতায় আসার আগেও মেয়েদের দল কখনোই ছিল না। সেখানে মুষ্টিমেয় কিছু মেয়ে তাদের বাড়িতে বিনোদনমূলক কার্যকলাপের অংশ হিসেবে ক্রিকেট খেলতো। এটি কখনই মাঠে গড়ায়নি। কারণ কোনো প্রকৃত উদ্দেশ্য কিংবা প্ল্যাটফর্ম ছিল না।’
এটি মূলত মেয়েদের বাইরে যাওয়ার বিষয়ে গ্রহণযোগ্যতার অভাবের কারণে হচ্ছে। আইসিসির আমাদের দেশের গতিশীলতা বোঝা উচিত এবং এটি এমনকিছু নয় যা তারা প্রয়োগ করতে পারে এবং সরকার একবারে প্রয়োগ করতে পারে। এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব আইনের মধ্যে কাজ করে। সেখানে এমনকিছু ব্যাপার আছে যা পশ্চিমা সমাজের মতো উন্মুক্ত নয়।







