বাংলাদেশ

বঙ্গভবনের ফোনে খুলে যায় কারাগারের দরজা: যেভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে

বঙ্গভবনের ফোনে খুলে যায় কারাগারের দরজা: যেভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে

ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। তখনো ভোর হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত ঢাকা। বঙ্গভবন থেকে একের পর এক টেলিফোন যাচ্ছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারা কর্মকর্তাদের জানানো হচ্ছে, সশস্ত্র লোকজন কারাগারে প্রবেশ করতে পারে। কিছুক্ষণ পর সত্যিই কারাগারের ফটকে হাজির হন কয়েকজন সশস্ত্র সামরিক সদস্য। তাদের উদ্দেশ্য সাধারণ কোনো বন্দিকে স্থানান্তর করা নয়। তারা খুঁজছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের চার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে: সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।

কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে আপত্তি জানালেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের পর তাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করা হয়। সেখানেই গুলি করে হত্যা করা হয় তাদের।

ঘটনার পাঁচ দশকের বেশি সময় পর সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি কারা কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য, হত্যা মামলার নথি, সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং ইতিহাসবিষয়ক গবেষণা। এসব দলিল থেকে উঠে আসে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের হত্যাকাণ্ড ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে সংঘটিত একটি পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। সেনাবাহিনীর একটি অংশের প্রত্যক্ষ সমর্থনে গঠিত সেই সরকারের সময় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দেওয়া চার নেতাকে আটক করে রাখা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

চারজনের প্রত্যেকেই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানও সেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন সমীকরণে এই চার নেতা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কেন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিশেষ বিবরণ দিয়েছেন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে।

মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের অন্যতম দুই সামরিক কর্মকর্তা ফারুক রহমান ও আবদুর রশিদ এবং খন্দকার মোশতাকের মধ্যে আগেই একটি বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলে কারাগারে আটক চার নেতা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেন।

বইটিতে ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে মাসকারেনহাস লিখেছেন, সম্ভাব্য পাল্টা অভ্যুত্থানের পরিস্থিতিতে চার নেতাকে হত্যা করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সামরিক সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তার এই বিবরণ পরিকল্পনাকারীদের একজনের বক্তব্যনির্ভর হলেও বিচারিক নথিতে হত্যাকাণ্ডের পেছনে সংগঠিত ষড়যন্ত্রের বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।

ঘটনার তাৎক্ষণিক পটভূমি ছিল সেনাবাহিনীর ভেতরের ক্ষমতার সংঘাত। ২ নভেম্বর রাত থেকে ৩ নভেম্বর ভোরের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান শুরু হয়। সেনাবাহিনীর একটি অংশ তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে তার বাসভবনে অন্তরীণ করে। একই সঙ্গে বঙ্গভবনকেন্দ্রিক সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ওপর চাপ তৈরি হয়।

এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে শুরু হয় হত্যাকাণ্ডের প্রস্তুতি।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ২০১৩ সালের রায়, যা ২০১৫ সালে ‘সুপ্রিম কোর্ট অনলাইন বুলেটিন’-এ প্রকাশিত হয়, তাতে ৩ নভেম্বর ভোররাতের ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। আদালতে উপস্থাপিত মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাত প্রায় তিনটার দিকে তৎকালীন কারা মহাপরিদর্শক নুরুজ্জামান হাওলাদার বঙ্গভবন থেকে একাধিক টেলিফোন পান। তাকে জানানো হয়, সশস্ত্র লোকজন কারাগারে ঢুকে কয়েকজন বন্দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। দ্রুত কারাগারে উপস্থিত থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়।

কারা মহাপরিদর্শক বিষয়টি কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়ালকে জানান। দুজনই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। কারাগারের জেলার আমিনুর রহমানকেও সতর্ক করা হয়। কারাগারের নিরাপত্তাকর্মীদের জরুরি ভিত্তিতে দায়িত্বে আসতে বলা হয়।

এর কিছুক্ষণ পর কারাগারের মূল ফটকে পৌঁছান মোসলেহউদ্দিনের নেতৃত্বে পাঁচজন সশস্ত্র সামরিক সদস্য। বিচারিক নথিতে তাকে ক্যাপ্টেন মোসলেম উদ্দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য বিবরণে তার পদবি রিসালদার বা নায়েক রিসালদার হিসেবে এসেছে।

কারা কর্মকর্তারা জানতে চান, তারা কেন এসেছেন। সামরিক সদস্যরা চার নেতাকে আলাদা করে রাখার বিষয়ে জানতে চান। উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তারা চার নেতাকে হত্যার কথা জানান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

এ অবস্থায় কারা মহাপরিদর্শক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলতে চান। এরপর বঙ্গভবন থেকে আসা টেলিফোনে খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে তার কথা হয়।

আদালতের নথিতে বর্ণিত সাক্ষ্য অনুযায়ী, খন্দকার মোশতাক কারা মহাপরিদর্শককে ওই সামরিক সদস্যদের ইচ্ছামতো কাজ করতে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই একটি টেলিফোন কথোপকথনই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, এর পর কারাগারের ভেতরের ফটক খুলে দেওয়া হয় এবং সশস্ত্র দলটি বন্দিদের কাছে যাওয়ার সুযোগ পায়।

তৎকালীন জেলার আমিনুর রহমানের সাক্ষ্যে চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করার বিবরণ পাওয়া যায়। ২০০৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত তার আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, কারাগারের ১৫ নম্বর সেলের পূর্ব দিকের একটি কক্ষে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ। অন্য দুটি কক্ষে ছিলেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।

মোসলেহউদ্দিনের নির্দেশে চারজনকে ১৫ নম্বর সেলের ১ নম্বর কক্ষে আনা হয়। ওই কক্ষে থাকা অন্য বন্দিদের সরিয়ে নেওয়া হয়। কারা কর্মকর্তারা চার নেতাকে একত্র করার পর সশস্ত্র ব্যক্তিরা সেখানে প্রবেশ করেন।

২০১০ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমিনুর রহমান সেই রাতের আরও কিছু স্মৃতি তুলে ধরেন। তার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তাজউদ্দীন আহমদ তখন কোরআন পড়ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম হাতমুখ ধুয়েছিলেন। এম মনসুর আলী অন্য কক্ষ থেকে আসার আগে পোশাক পরিবর্তন করেন।

এই বিবরণগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চার নেতা শেষ মুহূর্তে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শী কারা কর্মকর্তার কাছ থেকে। তবে এগুলো তার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ; ঘটনার প্রতিটি মুহূর্তের সমসাময়িক লিখিত নথি নয়।

চার নেতাকে একত্র করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সশস্ত্র ব্যক্তিরা গুলি চালান। কারাগারের ভেতরেই নিহত হন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের চার শীর্ষ নেতা।

হত্যাকাণ্ডের পরও কারাগারে সশস্ত্র ব্যক্তিদের দ্বিতীয়বার প্রবেশের বিবরণ পাওয়া যায়। আপিল বিভাগের রায়ে উপস্থাপিত মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, প্রথম দলটি চলে যাওয়ার পর আরও কয়েকজন সেখানে যান। চার নেতার মৃত্যু নিশ্চিত করতে তারা দ্বিতীয় দফায় হামলা চালান।

হত্যাকাণ্ডের পর কারাগারের কর্মকর্তারাও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েন। আদালতের নথি অনুযায়ী, কারা মহাপরিদর্শক ও উপমহাপরিদর্শক পরবর্তী করণীয় জানতে বঙ্গভবন ও সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কারাগারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগে।

অন্যদিকে চার নেতার পরিবার তখনো জানত না, তাদের প্রিয়জনদের কী হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি জানান, ৩ নভেম্বর পরিবারের সদস্যরা কারাগারে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সঠিক খবর পাননি। পরদিন, ৪ নভেম্বর, পুরান ঢাকার এক ব্যক্তি তাদের জানান, কারাগারের দিক থেকে গুলির শব্দ শোনা গেছে। এরপর বিকেলের দিকে চার নেতার মৃত্যুর খবর পরিবারে পৌঁছাতে শুরু করে।

এই বিলম্বিত সংবাদপ্রাপ্তির মধ্যেও ফুটে ওঠে সেদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চার সাবেক নেতা কারাগারে নিহত হলেও তাদের পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানোর স্বাভাবিক ব্যবস্থাটুকুও কার্যকর ছিল না।

হত্যাকাণ্ডের পরদিনই বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন তার ‘রক্তাক্ত দিনগুলো: ১৯৭৫–৮১’ বইয়ে লিখেছেন, ৪ নভেম্বর গঠিত সামরিক তদন্তের দায়িত্ব পান তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ জে এম আমিনুল হক, বীর উত্তম। কারা কর্মকর্তাদের বক্তব্য টেপ রেকর্ডে ধারণ করা হয়েছিল।

সাখাওয়াত হোসেনের বিবরণ অনুযায়ী, কারাগারের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে খন্দকার মোশতাক ও আবদুর রশিদের পূর্বজ্ঞান ছিল। তার বইয়ে আরও উল্লেখ রয়েছে, ঘটনাটি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সবাই একই সময়ে জানতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে কিছু অভিযুক্ত সামরিক কর্মকর্তা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান।

তবে ১৯৭৫ সালের সেই তদন্তে ধারণ করা সব বক্তব্য ও নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না। ফলে ঘটনার কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রধানত সাক্ষ্য ও পরবর্তী গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়।

কারাগারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৪ নভেম্বর লালবাগ থানায় মামলা করেন তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল; এমন তথ্য আদালতের নথি এবং পরবর্তী সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে রয়েছে। তবে ১৯৮২ সালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে ৫ নভেম্বর মামলা নথিভুক্ত হওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই তারিখের পার্থক্য সম্ভবত অভিযোগ দাখিল ও আনুষ্ঠানিক নথিভুক্তির পার্থক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, যদিও উৎসগুলো থেকে তা নিশ্চিত করা যায় না।

প্রাথমিক তদন্তের দায়িত্ব পান লালবাগ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ বি এম ফজলুল করিম। ঘটনাস্থলের তথ্য সংগ্রহ এবং মরদেহের সুরতহালসংক্রান্ত প্রক্রিয়াও শুরু হয়। কিন্তু মামলা দায়েরের পরও দীর্ঘদিন বিচারপ্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

জেলহত্যার বিচার বিলম্বিত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারি হওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ মূলত ১৫ আগস্টের ঘটনাবলির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা করেছিল। সেই রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতি বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জেলহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

জেলহত্যাসহ এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়। ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যে আইনজীবী ও সংসদ সদস্য স্যার টমাস উইলিয়ামসের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী শন ম্যাকব্রাইডসহ বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা।

১৯৮২ সালের ২০ মার্চ প্রকাশিত কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার না হওয়ার কারণ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর পরও অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কমিশন এটিও নথিভুক্ত করে যে অভিযুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে বিদেশে কূটনৈতিক দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর জেলহত্যা মামলার তদন্তে নতুন গতি আসে। ওই বছরের ১৮ আগস্ট অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি মামলাটির তদন্ত পুনরায় শুরু করে। ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার বিচারিক আদালত রায় ঘোষণা করেন। মোসলেহউদ্দিন, মারফত আলী শাহ ও আবুল হাশেম মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আরও আটজনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

পরবর্তী সময়ে মামলাটি হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগে যায়। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মারফত আলী শাহ ও আবুল হাশেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। বিচারিক আদালতে দেওয়া মোসলেহউদ্দিনের মৃত্যুদণ্ডও বহাল থাকে। অন্য আটজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও বহাল থাকে।

২০১৫ সালে প্রকাশিত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, সামরিক সদস্যদের ভূমিকা, কারা কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য এবং রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। তবে ষড়যন্ত্রের পৃথক অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি নিয়ে রায়ের বিচারকদের আইনগত যুক্তিতে পার্থক্যও ছিল। তাই হত্যাকাণ্ডের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে আইনগতভাবে প্রমাণিত অপরাধ; দুটিকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যায় না।

কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পরও প্রশ্ন থেকে যায়, কেন চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল?

ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের বিশ্লেষণে ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রাজনৈতিক যোগসূত্র বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাষ্ট্রক্ষমতার বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রোধ করা ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য; এমন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় মাসকারেনহাসের গবেষণায়। বিশেষ করে চার নেতার মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতৃত্ব, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হত্যাকারীদের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বলে তার বিবরণে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে নভেম্বরের শুরুতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সেই পূর্বপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে; এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রচিত বইগুলোতে।

তবে চার নেতা নিজেরা খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন; এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মাসকারেনহাস তার গবেষণায় এ ধরনের দাবির সমালোচনা করেছেন। কারাগারে তাদের যোগাযোগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।

এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে ১৯৭১ সালের দিকে ফিরে তাকাতে হয়। পাকিস্তানি কারাগারে বঙ্গবন্ধু বন্দি থাকার সময় স্বাধীনতাসংগ্রামের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছিলেন এই চারজন। তাদের নেতৃত্বেই গঠিত মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা করে।

মুক্তিযুদ্ধের সেই অভিজ্ঞতার কারণে তারা ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৭৫ সালের ক্ষমতার সংঘাতে তাদের হত্যা তাই শুধু চারজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু ছিল না; এটি মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার ওপরও গভীর আঘাত হানে।

৩ নভেম্বরের ঘটনার আরেকটি বিশেষ দিক হচ্ছে হত্যাকাণ্ডের স্থান। একটি রাষ্ট্রে কারাগার সেই প্রতিষ্ঠান, যেখানে বন্দির নিরাপত্তার দায় সরাসরি সরকারের ওপর বর্তায়। সাধারণ পরিস্থিতিতে বাইরের কোনো সশস্ত্র ব্যক্তি কারাগারে প্রবেশ করে বন্দির কাছে পৌঁছাতে পারেন না। অথচ ওই রাতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটেছিল।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, কারা কর্মকর্তারা সশস্ত্র ব্যক্তিদের প্রবেশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে যোগাযোগও করেছিলেন। তারপরও হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যায়নি। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে উঠে আসা বঙ্গভবনের টেলিফোন কথোপকথন এই কারণেই ঘটনাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল।

আজ ৩ নভেম্বর ২০২৬। জাতীয় চার নেতা হত্যার ৫১ বছর পূর্ণ হলো। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে বহুবার, বিচারিক প্রক্রিয়াও এগিয়েছে দীর্ঘ পথ। কিন্তু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেই রাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বন্দির নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতার এক স্থায়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ভোরে কারাগারের একটি কক্ষে শেষ হয়েছিল চার নেতার জীবন। তাদের হত্যাকাণ্ড আজও দেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বেদনাদায়ক অধ্যায়।

বিষয়:জাতীয় চার নেতা জেলহত্যা দিবস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার মুক্তিযুদ্ধ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…