অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটে-তরুণ নারী নেতৃত্ব। সেসময় থেকে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ না করলে এগুলো ভেঙে কয়েক টুকরো হবার সম্ভাবনা ছিল।
গতকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ মন্তব্য করেছেন।
আনু মুহাম্মদ লিখেছেন, অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে এই দলগুলোর নেতা কর্মীদের প্রাণপণ চেষ্টা ছিল পারিবারিক সূত্রে নেতৃত্ব সামনে আনা। আর কোনো বিকল্প না থাকায় সকলে বিপুল উৎসাহেই নারী ও তুলনামূলকভাবে তরুণ নেতৃত্ব গ্রহণ করলো। শেখ হাসিনার বয়স তখন ৩৩+, খালেদা জিয়ার ৩৫+। এই দুজনের ওপরই পড়লো দেশের সবচাইতে বড় দুটি দলের নেতৃত্ব ও সামরিক শাসন বিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের ভার। অনেকগুলো বাম দলও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এই দুই নেত্রীর নেতৃত্ব গ্রহণে জমায়েত হলো। এভাবে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াই হয়ে উঠলেন দেশের স্বীকৃত দুই প্রধান নেতা।

পোস্টে আনু মুহাম্মদ বলেন, জিয়া খুনের আগ পর্যন্ত রাজনীতি থেকে বহুদূরে থাকলেও এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনই ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার কঠিন যাত্রাকাল। এই সময়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী, দৃঢ় ও ধারাবাহিক ভূমিকা গ্রহণ করে খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী উপাধি অর্জন করেন। এই ধারাতেই তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন এবং এদেশে নারী নেতৃত্বাধীন সরকারের সূচনা করেন। নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্মবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর দীর্ঘ প্রচার থাকলেও তারা নারী নেতৃত্ব মেনে নিতে এবং একেক সময় কখনো খালেদা কখনো হাসিনার নেতৃত্বে নিজেদের ক্ষমতার ভিত তৈরি করেন।
পোস্টে তিনি আরও লেখেন, ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৯১ সালে আসন সংখ্যার সমস্যায় বিএনপি জামায়াতের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয় এবং সেই সুযোগে জামায়াত গোলাম আজমকে আমির হিসেবে ঘোষণা করে। সেই কারণে ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গোলাম আজমসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশাল গণআদালত অনুষ্ঠিত হয়। আবার ১৯৯৫ থেকে সেই জামায়াতকে সাথে নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলনে খালেদার পরাজয় ঘটে। ১৯৯৬ সালে জোরজবরদস্তি নির্বাচনে একচেটিয়া বিজয়ের পরেও তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন নি, তবে সেই সংসদেই তত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০১ সালে আবার জামায়াতকে সাথে নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং মন্ত্রীসভাতেও জামায়াত জায়গা পায়। জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবার সুযোগ দিতে বিএনপির অবদান অনেক, আওয়ামী লীগ তার পরেই।
‘এছাড়াও খালেদা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর সরকার যেসব নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তা নিয়ে অবশ্যই সমালোচনা থাকবে। কেননা মেগা দুর্নীতির বিস্তার, পাটশিল্প বিপর্যয়, জ্বালানি খাতে ক্ষতিকর চুক্তি, সার কানসাট ফুলবাড়ী হত্যাকান্ড, র্যাব গঠন ও ক্রসফায়ারে রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ ইত্যাদির দায় সেই সেই সরকারের। এসব নীতি ও চুক্তির ধারাবাহিকতা আওয়ামী লীগও অব্যাহত রেখেছে কেননা এগুলো এদেশের লুটেরা শাসক শ্রেণী এবং বহুজাতিক সাম্রাজ্যিক সংস্থাসমূহের অগ্রাধিকার বিষয়।’
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বিষয়ে অবদানের কথা উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, নারী হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চাপ খালেদাকেও বহন করতে হয়েছে। হাসিনা তাঁর স্বভাবসুলভ কটূক্তিতে খালেদাকে পুরুষতান্ত্রিক আক্রমণ করেছেন বহুবার। তবে তিনি একটি সাক্ষাৎকারে খালেদা এবং তাঁর যে নারী হিসেবে কত প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয় তা বলেছিলেন। বর্তমানে রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্রিয় নারীদের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়।
তিনি আরও বলেন, ২০০৭ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খালেদা ক্ষমতার বাইরে ছিলেন। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। শেখ হাসিনার নির্দয় ভূমিকায় খালেদার প্রতি মানুষের সহানুভূতি বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ে অপপ্রচার-কুৎসা মোকাবিলা করে তিনি যে সংযমের পরিচয় দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্লভ। খালেদা জিয়া তার শেষ রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের কথা বলেছেন। এই শেষ কথা তাঁর ভাবমূর্তি আরও উজ্জল করেছে।








