বাংলাদেশ

বড় বহর নামবে আকাশে, আয় বাড়বে কীভাবে?

বড় বহর নামবে আকাশে, আয় বাড়বে কীভাবে?
অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বড় বহর নিয়ে আকাশে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চার মাসের ব্যবধানে ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি। পাশাপাশি আরও ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তিও হয়েছে।

প্রায় ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ৯০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা) এই বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন রুট চালু ও ফ্লাইট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উড়োজাহাজ কেনার পর কাঙ্ক্ষিত আয় ও মুনাফা নিশ্চিত করা নির্ভর করবে রুট নির্বাচন, যাত্রী সংগ্রহ, বিজনেস ক্লাসের আসন বিক্রি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানের অংশ বাড়ানোর সক্ষমতার ওপর।

২০২৬ সালে বোয়িংয়ের সঙ্গে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এর মধ্যে ১৩টি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং ১০টি ৭৩৭-৮ রয়েছে। চুক্তিগুলোর মোট মূল্য প্রায় ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে ইউরোপের নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর কুর্মিটোলার একটি হোটেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও এয়ারবাসের মধ্যে চুক্তিটি সই হয়।

বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫০ ছাড়াবে

বিমানের বহর এখন ১৯টি উড়োজাহাজের। এর মধ্যে বোয়িং ১৪টি এবং ড্যাশ-৮ পাঁচটি। নতুন করে ২৫টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হলে বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫০ ছাড়াবে। এখন পর্যন্ত বিমানের বহরে বোয়িংয়ের আধিপত্য রয়েছে। এয়ারবাস যুক্ত হলে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং ও ইউরোপের এয়ারবাস, দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ পরিচালনা করবে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বলছে, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ আসা শুরু হতে পারে ২০৩১ সালে। সব উড়োজাহাজ পেতে ১১ থেকে ১২ বছর সময় লাগবে। তবে এভিয়েশন খাতের বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠছে বড় বহর তৈরি হলেই কি বড় ব্যবসা হবে?

লাভের চাবিকাঠি বিজনেস ক্লাসে

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘এয়ারলাইন্সের ব্যবসায় শুধু ইকোনমি ক্লাসের যাত্রী দিয়ে বড় ধরনের মুনাফা করা কঠিন। একটি ফ্লাইটের লাভ অনেকাংশে নির্ভর করে বিজনেস ক্লাসের আসন কতটা বিক্রি হচ্ছে তার ওপর। বিজনেস ক্লাসের আসন পূর্ণ থাকলে ইকোনমি ক্লাসের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মুনাফা করার সুযোগ থাকে।’

তিনি বলেন: ইকোনমি ক্লাস মূলত আয় ধরে রাখে, আর মুনাফা বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি হয় বিজনেস ক্লাসে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক পরিবহন, হজ ও ওমরাহ যাত্রী পরিবহনের বাজারে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ফলে বিজনেস ক্লাসের আসন বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় আলাদা বিপণন ও করপোরেট গ্রাহকভিত্তিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি।

কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, ‘‘ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, করপোরেট কর্মকর্তা ও উচ্চ আয়ের যাত্রীদের লক্ষ্য করে বিজনেস ক্লাসের প্রচার বাড়াতে হবে। সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে করপোরেট যাত্রীদের লক্ষ্য করে বিপণন বাড়ানো গেলে এসব রুটকে আরও লাভজনক করার সুযোগ রয়েছে।’’

নতুন উড়োজাহাজ, নতুন রুট কৌশল

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘নতুন এয়ারক্রাফট যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানের বিপণন এবং রুট ও সংযোগ কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হবে।’

যেসব রুটে যাত্রী ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বেশি, সেগুলোকে কেন্দ্র করে নেটওয়ার্ক সাজানোর পাশাপাশি দেশের আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলো সক্রিয় করা গেলে ঢাকাকেন্দ্রিক চাপ কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

‘‘সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রবাসী-অধ্যুষিত গন্তব্যে চাহিদা কাজে লাগিয়ে ফ্লাইট বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিমানের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা প্রায় ৫০টিতে পৌঁছালে কোন রুটে কত দূরত্ব ও আসনসংখ্যার উড়োজাহাজ প্রয়োজন, তা বিবেচনা করে এয়ারক্রাফট মোতায়েন করতে হবে। রুটের চাহিদা, যাত্রীসংখ্যা ও উড়োজাহাজের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে নতুন বহরকে আরও কার্যকর ও লাভজনকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।’’

প্রবাসী যাত্রীই কি নতুন বাজার?

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘নতুন রুট সম্প্রসারণে প্রবাসী বাংলাদেশি বেশি বসবাস করেন এমন গন্তব্যগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।’

‘‘কানাডার টরন্টো, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক এবং ইউরোপের লন্ডন, রোম, প্যারিস ও পর্তুগালের লিসবনে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে। এসব গন্তব্যে রুট চালুর আগে প্রবাসীদের যাতায়াতের চাহিদা, বর্তমান যাত্রীসংখ্যা এবং প্রতিযোগী এয়ারলাইনগুলোর সক্ষমতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’’

তিনি বলেন, ‘‘শুধু প্রবাসী যাত্রী নয়, পর্যটন, ব্যবসা ও ট্রানজিট যাত্রীর সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি কোন রুটে কত ফ্রিকোয়েন্সিতে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে, সেই বাণিজ্যিক পরিকল্পনাও আগেই নির্ধারণ করা জরুরি।’’

দেশীয় যাত্রী পরিবহনে বিমানের অংশ বাড়ানোর লক্ষ্য

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও এয়ারবাসের মধ্যে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘দেশের আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মাত্র ২০ শতাংশ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাতায়াত করেন। বাকি ৮০ শতাংশ যাত্রী বহন করে বিদেশি ও অন্যান্য এয়ারলাইনস।’

যাত্রীর চাহিদা বাড়লেও উড়োজাহাজের সংকটে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না বিমান। বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্তত ৫০ শতাংশ বাংলাদেশি যাত্রীকে নিজস্ব উড়োজাহাজে বিদেশে নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে চান তারা।

মন্ত্রী জানান, সঠিক নেটওয়ার্কের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত বহর, অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা।

বিমানকে বিশ্বের অন্যতম সেরা এয়ারলাইনস হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে গত সপ্তাহে সচিবালয়ে মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘২৫টি বোয়িংয়ের মূল্য সরকারি বাজেট থেকে সরাসরি পরিশোধ করা হবে না। বিমানের নিজস্ব আয় ও উপযুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই অর্থ পরিশোধ করা হবে। যাত্রী চাহিদা, রুট, উড়োজাহাজের রেঞ্জ, আসনসংখ্যা ও ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বিবেচনায় বহরের ধরন নির্ধারণ করা হয়েছে।”

এর মধ্যে ১৫টি ওয়াইডবডি বোয়িং ৭৮৭-৯ ও ৭৮৭-১০ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রুটে এবং ১০টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স আঞ্চলিক ও স্বল্প দূরত্বের রুটে ব্যবহার করা হবে। নতুন ন্যারোবডিগুলো পুরোনো ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজের জায়গা নেবে।

অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘‘এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বহর, রুট ও আর্থিক কৌশল পর্যালোচনা করে এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে। চুক্তিটি বিমানের বহর সম্প্রসারণে নতুন অধ্যায় তৈরি করবে।’’

বিষয়:এটিএম নজরুল ইসলাম এয়ারবাস বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বোয়িং

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…