স্বাস্থ্য

১৭ ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাংলাদেশও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে

১৭ ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি, বাংলাদেশও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে

ছবি: সংগৃহীত

মহামারি, স্থূলতা, জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা, যুদ্ধ-সংঘাত, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, অপুষ্টি, ধূমপান, বৈষম্য, নিম্ন শিক্ষার হার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারসহ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত ১৭টি বড় হুমকি চলতি শতাব্দীর বাকি সময়ে বিশ্বস্বাস্থ্যের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছে দ্য ল্যানসেটের একটি আন্তর্জাতিক কমিশন।

দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলেছে, এখন নেওয়া প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি, নতুন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি শনাক্ত করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে আগামী প্রজন্ম কত বছর সুস্থ জীবন পাবে কিংবা হারাবে।

প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো সামগ্রিক ঝুঁকি তালিকা প্রকাশ করেনি। তবে যে ১৭টি হুমকিকে বিশ্বস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

ঘনবসতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের দ্বৈত চাপ, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার, অপুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমিত সামর্থ্য বাংলাদেশের ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি: বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু আরও বাড়তে পারে, কিন্তু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় সেই হারে বাড়বে না। অর্থাৎ মানুষ দীর্ঘদিন বাঁচলেও জীবনের বড় একটি সময় অসুস্থতা বা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে কাটানোর ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে একই সঙ্গে সংক্রামক রোগ ও ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ বাড়ছে, এই সতর্কতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কমিশনের হিসাবে ভবিষ্যতে স্থূলতা বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যবোঝা হয়ে উঠতে পারে। যথাযথ নীতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ২১০০ সাল পর্যন্ত স্থূলতার কারণে সম্ভাব্য দুই হাজার ৩১০ কোটি সুস্থ জীবনবর্ষ হারানো ঠেকানো সম্ভব হতে পারে। দ্রুত নগরায়ণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশেও অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার সমস্যা ক্রমে বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদনে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মহামারিকেও দীর্ঘমেয়াদি বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে মাঝারি মাত্রার মহামারির হার কিছুটা কমলেও অত্যন্ত বিধ্বংসী মহামারির ঝুঁকি একইভাবে কমেছে; এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

করোনাভাইরাস মহামারির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নতুন কোনো সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং স্বাভাবিক জীবন একসঙ্গে বিপর্যস্ত হতে পারে। বিপুল জনসংখ্যা, ঘনবসতি এবং আন্তর্জাতিক চলাচলের কারণে বাংলাদেশের জন্যও আগাম রোগ নজরদারি, পরীক্ষাগার সক্ষমতা এবং জরুরি স্বাস্থ্য প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠাকেও বড় বিপর্যয়কর হুমকির তালিকায় রাখা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় বা ভুল ব্যবহার অব্যাহত থাকলে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও ভবিষ্যতে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তখন অস্ত্রোপচার, প্রসূতি চিকিৎসা, ক্যান্সার চিকিৎসা কিংবা গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসায় ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে।

বাংলাদেশের মতো দেশে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এই হুমকিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

কমিশন উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, শৈশবের অপুষ্টি, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর বার্ধক্যকেও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যহানির বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আয়বৈষম্য ও নিম্ন শিক্ষার হার।

কমিশনের বিশ্লেষণ বলছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু রোগ বা জীবাণু থেকে আসে না; মানুষের শিক্ষা, আয়, সামাজিক অবস্থান এবং সুযোগের বৈষম্যও দীর্ঘমেয়াদে বিপুল স্বাস্থ্যক্ষতির কারণ হতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতি সত্ত্বেও শহর ও গ্রামের মধ্যে চিকিৎসাসেবার সুযোগ, দরিদ্র ও সচ্ছল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা গ্রহণের সামর্থ্য এবং বিশেষায়িত সেবার প্রাপ্যতায় বড় পার্থক্য রয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় তাই শুধু হাসপাতাল বা ওষুধ নয়, শিক্ষা, পুষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর নীতিকেও গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে কমিশনের বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদনে যুদ্ধ ও সংঘাতকেও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সংঘাত সরাসরি প্রাণহানি ঘটানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস করে, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি করে, টিকাদান ব্যাহত করে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। বড় একটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির স্বাস্থ্যগত প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।

কমিশনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর ব্যবহার নিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষতিকর ব্যবহার কমানো গেলে ২১০০ সাল পর্যন্ত এক হাজার ৪০ কোটি সুস্থ জীবনবর্ষ হারানো ঠেকানো যেতে পারে বলে কমিশনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু হুমকি হিসেবে দেখেনি কমিশন; যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বার্থে ব্যবহার করা গেলে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা গবেষণা এবং স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

কমিশন বলেছে, বিশ্বের বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে যথেষ্ট হবে না। একটি ঝুঁকি অন্যটিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্যনিরাপত্তা ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যুদ্ধ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে, বৈষম্য মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কমাতে পারে এবং ভুল বা ক্ষতিকর প্রযুক্তি ব্যবহার নতুন ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে।

এসব হুমকি মোকাবিলায় কমিশন বিশ্বনেতাদের সামনে তিনটি মূল করণীয় রেখেছে: আগাম প্রস্তুতি গড়ে তোলা, নতুন উদ্ভাবন ও কার্যকর সমাধানে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পরিবর্তনশীল ঝুঁকিগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।

বাংলাদেশের জন্য এই বার্তার অর্থ হলো, শুধু কোনো সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি থেকে বের হয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়ানো। সংক্রামক রোগ নজরদারি, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য, দুর্যোগ সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গবেষণা এবং নতুন প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারে এখন থেকেই সমন্বিত প্রস্তুতি না নিলে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।

দ্য ল্যানসেট কমিশনের মূল সতর্কবার্তাও সেখানেই: একুশ শতকের বড় স্বাস্থ্যহুমকিগুলোর অনেকটাই অনিবার্য নয়। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে বিপুলসংখ্যক অকালমৃত্যু এবং কয়েকশ কোটি বছরের সুস্থ জীবন হারানো ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যত দেরিতে আসবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি ততই বাড়বে।

বিষয়:দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ বিশ্বস্বাস্থ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…