এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
সাভার-আশুলিয়ায় গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। একটি ঘটনার সূত্র ধরে আরেকটি আস্তানা, সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক বিস্ফোরক, পরদিনই আবার নতুন বোমা উদ্ধারের ঘটনায় সামনে এসেছে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির একটি চক্রের নাম। তদন্তে বারবার উঠে আসছে পাঁচজনের নাম—মামুন ওরফে ‘বোমারু’ মামুন, শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফ, রাকিব ও বাপ্পী। তাদের মধ্যে দুজন গ্রেপ্তার হলেও মূল সন্দেহভাজন মামুনসহ কয়েকজন এখনো পলাতক।
তদন্তকারীদের হাতে আসা তথ্য বলছে, এই চক্র শুধু বিস্ফোরক মজুতই করছিল না; সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনেও প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা ছিল। গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন একটি ওয়েবসাইট ও অ্যাপ ব্যবহারের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এ ঘটনায় গত বুধবার সাভার মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। পুলিশের ওপর হামলার প্রস্তুতি, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ এবং সংগঠনটির আদর্শ ও সত্তাকে সমর্থনের অভিযোগে ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ছয় থেকে সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান, নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’, আক্কাস আলী, কামাল হোসেন ডাক্তার, বাপ্পী ও রাকিব। সিটিটিসির এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মামলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একাধিক ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
আরিফকে ঘিরেই তদন্তের মোড়
গত মঙ্গলবার সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তে বড় ধরনের মোড় আসে। পুলিশের দাবি, তার কাছ থেকে একাধিক বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তকারীরা বলছেন গ্রেপ্তার মোহাম্মদ আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদে নব্য জেএমবির সদস্যদের যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তথ্য পেয়েছেন। পুলিশের দাবি, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগে তারা ‘প্রটেকটেড টেক্সট’ (পিটি) নামে একটি ওয়েবসাইট এবং অর্থ লেনদেনে ‘ইলিমেন্ট’ নামের একটি অ্যাপ ব্যবহার করতেন।
আরিফের দেওয়া তথ্যেই যেন খুলতে থাকে একটি অদৃশ্য নেটওয়ার্কের দরজা। তদন্তকারীদের ধারণা, ওই বাড়িটি শুধু বিস্ফোরক রাখার জায়গা নয়, চক্রটির কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাঁটি হতে পারে। তবে বাড়িটির প্রকৃত ব্যবহার এবং সেখানে আর কারা যাতায়াত করতেন, তা এখনো তদন্তাধীন।
এর পরদিনই সাভারের আরেক এলাকায় একটি প্রেশার-কুকারসদৃশ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ আরও বাড়ে। বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি নিয়ন্ত্রিতভাবে নিষ্ক্রিয় করে। পরপর দুই দিনের এসব ঘটনায় পৃথক মামলা হলেও তদন্তের গতিপথ এখন একই দিকে ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সাংগঠনিক যোগসূত্র রয়েছে কি না।
একই চক্রের ছায়া অন্য ঘটনাতেও
সিটিটিসি ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, সায়েদাবাদ, মতিঝিল ও আশুলিয়ার কয়েকটি ঘটনায় একই চক্রের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও বিস্ফোরণ ঘটেছে, কোথাও পরিত্যক্ত অবস্থায় বোমা উদ্ধার হয়েছে, আবার কোথাও পুলিশি তল্লাশির সময় হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতর এবং আশুলিয়ার একটি দোকানের সামনে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় ব্যবহৃত উপাদানের মধ্যে মিল পাওয়ার দাবি করেছে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র। এ ধরনের মিলকে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাগুলোর সম্ভাব্য সাংগঠনিক যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বারবার সামনে ‘বোমারু মামুন’
এই তদন্তের সবচেয়ে আলোচিত নাম নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’। পুলিশের দাবি, বোমা তৈরিতে দক্ষ এই ব্যক্তি আগে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০১৭ সালের পান্থপথের হোটেল ওলিও বিস্ফোরণের ঘটনাতেও তার বিরুদ্ধে বোমা তৈরির অভিযোগ ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওই মামলায় তিনি খালাস পাওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন করে বিভিন্ন বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় তার নাম সামনে আসে।
সিটিটিসির ভাষ্য অনুযায়ী, আরিফকে গ্রেপ্তারের পর পাওয়া তথ্যেই সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় মামুনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে মামুনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলোর বিচারিক সত্যতা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
দুই সপ্তাহে ১৬ বোমা, প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা নিয়ে
সাভার ও আশুলিয়ায় প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত ১৬টি বোমা উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর পাশাপাশি ককটেল তৈরির সময় বিস্ফোরণ ও একটি রাজনৈতিক সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় পৃথক মামলা হলেও সব ঘটনার নেপথ্যে কারা এবং বিস্ফোরকগুলো কীভাবে ওই এলাকায় পৌঁছাচ্ছে—এ প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই দুইটি বড় বোমা উদ্ধারের পাশাপাশি বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর মতে, ঘনবসতি, শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা এবং ভাসমান মানুষের আধিক্যের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা এখানে আস্তানা গড়তে পারে। এ কারণে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল, ভাড়াটিয়া যাচাই এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে।
নতুন নয় সাভারের জঙ্গি-যোগ
সাভারে জঙ্গি তৎপরতার ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার দিন সাভারেও বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরে ২০১০ ও ২০১৭ সালেও সাভার ও আশুলিয়া থেকে জেএমবি ও সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, ঢাকার আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো অপরাধীদের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। তাঁর পরামর্শ, গোয়েন্দা তৎপরতা ও পুলিশের সোর্স নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার পাশাপাশি ভাড়াটিয়া তথ্য যাচাই এবং সন্দেহজনক বিস্ফোরক উপাদানের কেনাবেচায় নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে যেন নিরপরাধ বা ভিন্নমতের মানুষ হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করলে চক্রটির আরও সদস্য ও তাদের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সাভারে পরপর বোমা উদ্ধারের ঘটনা তাই এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না তদন্তকারীরা। বরং এর সঙ্গে সাম্প্রতিক অন্যান্য বিস্ফোরক উদ্ধার ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাগুলোর সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে দেখাই তদন্তের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।


