মাত্র ৩৭ বছরের একটা জীবন, এটুকুতেই নাড়িয়ে দিয়ে গেছেন অনেক কিছু। ধরা যাক তিনি আর কিছুই করেননি, এক ‘জীবন থেকে নেয়া’-ই করেছেন। তাতেই পাকাপাকি হয়ে গেলো তার জায়গা। ১৯৭০ সালে, মহান মুক্তিযুদ্ধের এক বছর আগে যে সিনেমা তিনি বানিয়ে গেলেন তাতে কী ছিল না!
‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’-বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার আগেই তিনি এই সিনেমায় এ গানকে গ্রহণ করে, বাঙালির নরম হৃদয়ে তা গেথে দিয়েছিলেন। আর ওই যে একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে খোলা পায়ে প্রভাত ফেরি, শহীদ মিনার, তার আগে এমন করে কেউ ব্যবহার করেননি সিনেমায়!
মাত্র ৩৭ বছরের একটা জীবন। কত কাজ করেছেন, আর রীতিমত আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে গেছেন তিনি। ১৯৭১ সাল, দেশ যখন বিপন্ন তখন মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক, কবি, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ লিখিয়ে, কাহিনিকার, প্রয়োজক এবং পরিচালক সব মিলিয়ে ঝড়ো একটা ইনিংস।
ছোট ছোট, কাট কাট বাক্যে গদ্য, গল্প আর উপন্যাস লেখার কাজটি তিনিই করেছেন এই বাংলায়। সূর্য গ্রহণ, শেষ বিকেলের মেয়ে, হাজার বছর ধরে, বরফ গলা নদী, আরেক ফাল্গুন, আর কত দিন, কয়েকটি মৃত্যু, তৃষ্ণা, একুশে ফেব্রুয়ারি- বইগুলো পাঠ করলেই প্রমাণ হাজির হয়ে যাবে আলগোছে।
জন্ম নিয়েছিলেন ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট। আর হারিয়ে গেলেন, নিখোঁজ হয়ে গেলেন ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি হারিয়ে গেলেন, ৩৭ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন! এখনও পর্যন্ত অফিসিয়ালি তার এই নিখোঁজ রহস্যেও জট খুলেনি। হারিয়ে গেলেন তিনি, পেছনে রইলো ৩৭ বছরের ছোট্ট একটা জীবন, যে জীবনের কর্ম অধ্যায়ে তিনি নির্মাণ করলেন অনেকগুলো সিনেমা। প্রায় সবই আলোচিত এবং বার বার দেখার মতো, সেই ছবি নিয়ে কথা বলা যায় ঘন্টার পর ঘন্টা।
খোঁজ নিলেই জানা যায় দেশে যতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আর ইন্সটিটিউশন আছে, যেখানে সিমেনা নিয়ে পড়ানো হয়, তার বেশির ভাগ জুড়েই থাকে জীবন থেকে নেয়া, বেহুলা আর স্টপ জেনোসাইড। বাংলাদেশের বাংলা সিনেমার সঙ্গে রাজ্জাক নামটি এখন সমার্থক। বেহুলা সিনেমায় এই রাজ্জাককে হিরো বানিয়ে ছিলেন তিনি। তারপর রাজ্জাকতো ‘নায়করাজ’ হয়ে জয় করেছেন তার ভূবন।
এখনো এই প্রযুক্তির এই অস্থিও সময়ে দাঁড়িয়ে বেহুলায় চোখ আর মন রাখলে বোঝা যায় কতটা নান্দনিক হতে পাওে একটি লোক কানিহি ঘেরা সিনেমা। কত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তখন দারুণ সিনেমাটোগ্রাফ ছিলো বেহুলায়। আর জীবন থেকে নেয়া, এটাতো মাইলস্টোন। বাঙালির যে কোনো মুক্তির সংগ্রামের কথা এলেই এই সিনেমার কথা উঠে আসবে সবার আগে।
মাত্র ৩৭ বছরের জীবন। দেখা যাক তার কীর্তি কখনো আসেনি (পরিচালনা, কাহিনি, সংলাপ,চিত্রনাট্য, গান), কাঁচের দেয়াল (প্রযোজনা, পরিচালনা,কাহিনি, সংলাপ, চিত্রনাট্য), সোনার কাজল (কলিম শরাফীর সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা), সংগম (কাহিনি, পরিচালনা), বাহানা (কাহিনি, পরিচালনা), বেহুলা (পরিচালনা, চিত্রনাট্য), আনোয়ারা (পরিচালনা, চিত্রনাট্য), জুলেখা (পরিচালনা), দুই ভাই(প্রযোজনা, গান), সংসার (প্রযোজনা, গান), সুয়োরাণী দুয়োরাণী (প্রযোজনা, চিত্রনাট্য, গান), কুঁচবরণ কন্যা (প্রযোজনা,গান), মনের মত বউ(প্রযোজনা), শেষ পর্যন্ত (প্রযোজনা), জীবন থেকে নেয়া (প্রযোজনা, পরিচালনা,কাহিনি, চিত্রনাট্য), জ¦লতে সুরুজ কি নিচে (পরিচালনা), লেট দেয়ার বি লাইট (প্রযোজনা, পরিচালনা, কাহিনি, সংলাপ, চিত্রনাট্য), প্রতিশোধ (প্রযোজনা)।
প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড (পরিচালনা), বার্থ অব এ ন্যাশন (পরিচালনা), লিবারেশন ফাইটার্স (প্রযোজনা), ইনোসেন্ট মিলিয়নস (প্রযোজনা)।
৩৭ বছরের ছোট্ট একটা জীবন, তার চেয়ে আরো ছোট কর্মজীবন, সেই জীবনটুকুতে তিনি এতো কাজ করেছেন, ভাবলেই বিস্ময় জাগে, বড় বিস্ময় লাগে। ছোটখাটো শরীর আর ছোবলহানা চোখের কীর্তিমান এই মানুষটির নাম জহির রায়হান। আজ তার জন্মদিন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







