বাংলাদেশ

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক বৈঠকে কী ঘটেছিল

সেনাবাহিনীর বৈঠকে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তারা. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার্স অ্যাড্রেস, ৩ আগস্ট, ২০২৪। ছবি: আইএসপিআর

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

৩ আগস্ট, ২০২৪। ঠিক এক বছর আগে এদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসারদের এক সভা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। দেশের সব গ্যারিসন থেকে সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি অংশ নেওয়া অফিসাররা বৈঠকে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত হাসিনার প্রস্থানকে নিশ্চিত করে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে এর আগে ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে সারাদেশে মোতায়েন করা হয়েছিল সেনাবাহিনী। পুলিশ, এলিট ফোর্স র‍্যাব ও আধাসামরিক বাহিনী বিজিবির গুলিতে নিহত হয়েছিল কয়েকশ প্রাণ।

পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ। পুরো দেশ তাকিয়ে ছিল সেনাবাহিনীর দিকে– তারা কি অন্য বাহিনীর সঙ্গে মিলে আন্দোলন দমন করবে, নাকি রক্তপাত থামাতে এগিয়ে আসবে?

২ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনাবাহিনীর একটি বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে পড়ে। তাতে বলা হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, যিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ২৩ জুন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, পরের দিন তার প্রথম অফিসার্স অ্যাড্রেসে আহ্বান করেছেন।

ইতিহাস সাক্ষী যে, ওই বৈঠক থেকে সেনাবাহিনী সেদিন জনগণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

৩ আগস্টের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তরুণ অফিসাররা দৃঢ়ভাবে বলেন: “নিজেদের জনগণের ওপর গুলি নয়।” সেনাপ্রধানও ঘোষণা দেন: “এখন থেকে গুলি নয়।”

এই সিদ্ধান্তই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও প্রস্থানের পথ খুলে দেয়। ৫ আগস্ট তিনি ভারতে পালিয়ে যান।

ওই সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তেমন কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তবে ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর)-এর বিজ্ঞপ্তিতে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়: “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।”

হাসিনার প্রস্থান পরবর্তীতে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পায়।

৩ আগস্টের বৈঠক
অংশগ্রহণকারী অফিসারদের ভাষ্যে, দুপুর দেড়টায় শুরু হয়ে ১০ মিনিটের বিরতিসহ বৈঠকটি প্রায় দেড় ঘণ্টা স্থায়ী হয়।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার ৩০ মিনিটের উদ্বোধনী ভাষণে ব্যাখ্যা করেন কেন সরকারের নির্দেশে সেনাবাহিনীকে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় মোতায়েন করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, “সংকটময় মুহূর্তে সরকার চাইলে আমরা মোতায়েন হতে বাধ্য।”

তবে তিনি স্পষ্ট করে যোগ করেন, সেনারা কাউকে হত্যা করেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনারা কোথায় কত রাউন্ড গুলি ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে তার পরিসংখ্যানও দেন তিসি।

এসময় তিনি দুটি গানের কথা উল্লেখ করেন।

এর একটি: “আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে”। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান যে, তিনি এ সংকট ডাকেননি, বরং সংকট নিজেই সেনাবাহিনীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর আরেকটি গান “আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে”র কথাও উল্লেখ করেন তিনি, যা সকল সেনা কর্মকর্তাই আবেগঘনভাবে উপলব্ধি করেন।

এরপর তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানতে অফিসারদের আহ্বান জানান।  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ঊর্ধ্বতনদের কথা বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়, যা কিছু সিনিয়রকে হতাশ করলেও জুনিয়রদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

মাঠপর্যায়ের কণ্ঠস্বর
ক্যাপ্টেন, মেজর ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যায়ের ছয় থেকে সাতজন অফিসার সেদিন সরাসরি মতামত দেন।

এক অফিসার বলেন, খুলনায় টহলরত সেনাদের উদ্দেশে আন্দোলনকারীরা যে অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করেছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশে কখনও শোনা যায়নি। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে প্রশ্ন করেন: “কিসের জন্য? কার জন্য?”

রাজশাহীর মেডিকেল কর্পসের এক নারী অফিসার বাংলায় লেখা এক আবেগঘন বক্তব্য পাঠ করে বলেন: “দেশের প্রতিটি মা আজ এই মৃত্যুর জন্য কাঁদছে।” তিনি তার প্রতিবেশী মীর মুগ্ধর কথা উল্লেখ করেন যে মুগ্ধ উত্তরায় আন্দোলনকারীদের পানি বিলাতে গিয়ে নিহত হন।

ঢাকা সেনানিবাসের হেলমেট হলে এবং দেশের অন্যান্য ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত সবাই তখন নীরবতায় ডুবে যায়।

হাস্যরসের একটি মুহূর্ত
গম্ভীর পরিবেশের মধ্যে এক পর্যায়ে কিছুটা হাস্যরসও দেখা দেয়।

মোহাম্মদপুরে গুলির একটি ভাইরাল ভিডিওর কথা উল্লেখ করে  এক ক্যাপ্টেন জানান, ভিডিওতে তাকে দেখে তার পরিবার ও বন্ধুরা সমালোচনা করেছেন। “তবে আমার স্ত্রী আমাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মজা করে বলেছে আমকে নাকি ‘কিউট’ দেখাচ্ছিল।”

সেনাপ্রধান হাসতে হাসতে বলেন, “আমাকে কেউ কখনও কিউট বলেনি।”

এরপেই তিনি গম্ভীর হয়ে যোগ করেন: “সেনাবাহিনী সর্বাগ্রে দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে।”

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
দুপুর ২:৪০ মিনিটের দিকে স্বল্প বিরতির পর বৈঠক আবার শুরু হয়। তবে দ্বিতীয় পর্ব ছিল সংক্ষিপ্ত।

সেনাপ্রধান তরুণ অফিসারদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে শেষ নির্দেশ দেন: “জনগণের ওপর গুলি চলবে না।”

দেশ সেই সিদ্ধান্তের সাক্ষী। এর ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সামরিক বিমানে বাংলাদেশ ত্যাগ করে বোন শেখ রেহানাসহ ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা।

বিষয়:জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা প্রধান সেনাবাহিনী

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…