দেশজুড়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় রাজনীতির জোট ১৪ দল। দশম সংসদে দেখা গেছে জোট প্রার্থীরা কেউ একক প্রতীক নৌকা নিয়ে ভোট যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, কেউ কেউ দলীয় প্রতীকে অংশগ্রহণ করেছে। যেমন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা ও ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহ ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন আবার ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা হাফিজুর রহমান, খান টিপু সুলতান, জাসদ নেতা নাজমুল হক প্রধান ও শিরিন আক্তার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। তাদের কারও প্রতীক হাতুড়ি ও কারও মশাল।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম.এল) সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে তারা দলীয়ভাবে ৩০টি আসনে ও জোটগতভাবে ৬টি আসনে নির্বাচন করতে চায়। অনেক সংগঠন তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ১৪ দলের সমন্বয় কমিটিতে জমাও দিয়েছে শোনা যায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন যারা জমা দিয়েছে সেগুলো নিশ্চয়ই জোটগত প্রার্থিতা, তাই নয় কি? সুতরাং এগুলো চূড়ান্ত হলেও কি তারা আবার দলীয় প্রার্থিতা দেবে? যদি তাই হয় তাহলেতো দেখা যাবে একই দল হতে কেউ জোটের প্রতীকে নির্বাচন করবে আর কেউ দলীয় প্রতীকে। তখন সেটা কাদের জন্য সুফল দায়ক হবে? এ ব্যাপারে কি বক্তব্য ১৪ দলীয় জোটের নীতিনির্ধারকদের?
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হয়নি। কারণ বিএনপি নির্বাচনে আসেনি। রাশেদ খান মেনন, ফজলে হোসেন বাদশা, হাসানুল হক ইনু বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিএনপি যদিও বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার না দিলে নির্বাচনে যাবে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে তাদের একথা টিকবে না। শেষে তারা দলীয় সরকারের অধীনে হলেও নির্বাচনে যেতে বাধ্য হবে। কারণ তা না হলে পরপর দু’বার নির্বাচন বর্জনের দায়ে তাদের নিবন্ধন বাতিল করে দেবে নির্বাচন কমিশন। সুতরাং এবারের নির্বাচনে ১৫৪ জন কেন একজনেরও বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হবার সুযোগ নেই। তাছাড়া একক প্রার্থিতার বিষয়টিও কি ১৪ দলীয় বৈঠকে গৃহিত সিদ্ধান্ত? যারা বিগত দিনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করল সেটাও কি ১৪ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তক্রমেই? তবে একক প্রতীক প্রাপ্তি কেবলই হেভিওয়েট প্রার্থীদের বেলায় কেন? দলীয় প্রধানদের ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক রেখে নৌকাসহ অন্য কোন শরীক দলকে প্রার্থিতা হতে দূরে সরিয়ে রাখা যেত না? এব্যাপারে জোটের ও প্রধান শরীকের কী বক্তব্য, তা জানতে অনেকেই আগ্রহী। বিগত দিনে দেখা গেছে ওয়ার্কার্স পার্টিতে একক প্রতীক নয় দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের দাবি উঠেছে। এ দাবিতে বিরোধ করে দলত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। এখনও শরীক দলের নেতাকর্মীদের বেশির ভাগকেই দেখা গেছে দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার পক্ষে।
জাসদ(ইনু) একসময় শরীক জোটে বৈষম্যের শিকার হয়ে আওয়ামী লীগের ‘একলা চলো ‘নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে জাসদেও অাভ্যন্তরীন বৈষম্যের অভিযোগ ওঠে। জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া, কার্যনির্বাহী সভাপতি মঈন উদ্দীন খান বাদল এমপি, যুগ্ম সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান এমপি জাসদ(ইনু) হতে বেরিয়ে গিয়ে নতুন জাসদ গঠন করলেন। কিন্তু তারাও ১৪ দলে রয়ে গেলেন। নতুন জাসদও কি একক প্রতীকে নির্বাচন করছে নাকি তাদের দলীয় প্রতীকে? বৈষম্যের অভিযোগ যেমন প্রধান শরীকের প্রতি ছোট শরীকের রয়েছে। তেমনই রয়েছে প্রধান শরীকের অভ্যন্তরেও। সেখানেও নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী নেতারা উপেক্ষিত। ধনশালী ও ব্যবসায়ীরা এগিয়ে যাচ্ছে পিছিয়ে যাচ্ছে ত্যাগীরা। তার দৃশ্যমান উদাহরণ আতিকুল হক ও আদম তমিজির সিটি মেয়র মনোনয়ন প্রাপ্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি। ঢাকা সিটিতে কি নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী নেতা কর্মীদের মধ্যে কেউ ছিলনা সিটি মেয়র পদে নির্বাচন করার যোগ্য? দলের দুঃসময়ে কোথায় ছিলেন উনারা?
দুঃসময়ের ও দুর্দিনের সাথীরা যেন কেবলই দুর্দিনেরই, সুদিনে তারা রয় উপেক্ষিত। ১৪ দলের শরীকদের বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখে প্রধান শরীক। আবার প্রধান শরীকেও রয়েছে উপেক্ষিত নেতাকর্মী। আবার ছোট শরীকের অভ্যন্তরেও রয়েছে বৈষম্য। আভ্যন্তরীণ বৈষম্যের কারণেই জাসদ (ইনু) ভেঙ্গে বাংলাদেশ জাসদের সৃষ্টি। এককথায় বাংলাদেশে বৈষম্য যেন নিয়তি হয়ে উঠছে। ক্ষমতার কাছাকাছি গেলেই যেন তা দৃশ্যমান হয়। যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাজনীতি করেন তারাও বাস্তবিক বৈষম্যের চাষ করেন। দিলিপ বড়ুয়া টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হলেন। অার সাম্যবাদী দল দু’ভাগ হলো। কেন তারা চরম দুর্দিনে একত্রে থাকতে পারল আর সামান্য সুদিনে পারলো না?
নিবেদিত প্রাণ ত্যাগীদের পাশ কাটিয়ে সুবিধাবাদীরা নীতিনির্ধারক হয়ে উঠছে সব দলেই। নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে টাকাওয়ালাদের হাতে। ছোট দল বলে ১৪ দলের অনেক দলকে কোন আসনই দেয়া হয়নি। আবার যাদের কোন দলই নেই তাদের ডেকে এনে মনোনয়ন দেয়া হয়। টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী বানানো হয়। দুঃসময়ে কি ভূমিকা ছিল তাদের? ১৪ দল শরীকরা রাজপথে লাঠি পেটা খেয়েছে। তাদের কাউকে কি মনোনয়ন কিংবা টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রীত্ব দেয়া যেত না? হয়তো যেতো যদি তারা বড় ব্যবসায়ী কিংবা ধনাঢ্য ব্যক্তি হতো। দলে দীর্ঘদিন বা দু:সময়ে অবদান না রাখা ব্যবসায়ীরা আওয়ামী লীগ হতে সিটি মেয়র পদে মনোনয়ন চাইছে। তা কি কেবলই টাকার জোরে নয়?
১৪ দলের বেশকিছু শরীক বিগত সংসদ নির্বাচনে কোন আসনেই মনোনয়ন পায়নি। মন্ত্রীসভাতেও তারা নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কোনকিছুর সাথেই তারা কোনভাবেই সম্পৃক্ত নয়। সিটি নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের না ডেকে তাদের কাউকে কি ডাকা যেতনা? প্রয়োজনে তাদের ডাকা হয়। ১৪ দলের বৈঠকে উপস্থিতি ছাড়া এসব নেতার জোট ও ক্ষমতার সাথে কোন অংশগ্রহণ নেই। তারা কেবলই ফুল বাগানের সাজানো ফুলের টব নয় কি? বাগানের মালি ইচ্ছে করলেই টব সরিয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে টবের কোন ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য নেই। তাদের সরিয়ে দিলে যেন বাগানের কিছু আসে যায় না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







