‘দেখ এই কি মানুষের জীবন? সুখ নেই, স্বস্তি নেই, গৃহ নেই, কেবলি প্রাণ নিয়ে পলায়ণ করতে হচ্ছে, এর শেষ কোথায়? এ জীবন কী যাপন করা যায়? বলো কতোদিন এভাবে চলবে?’
উপন্যাসের মাধ্যমে এ প্রশ্নগুলো ৩৫ বছর আগে যিনি করেছিলেন তিনি বাংলা কথা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান পুরুষ শওকত আলী। জনগণের সেই দুর্দশা এখনো কাটেনি বলে তার আফসোস।
‘জনগণের যে কষ্ট এটা কিছুতেই দূর হচ্ছে না এবং দূর করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। এইটাই আমার আফসোস।’ কিছু দিন আগে বলেছিলেন শওকত আলী।
বাংলাভাষার অন্যতম শক্তিমান এই লেখক, প্রদোষে প্রাকৃতজনের এই লেখক গুরুতর অসুস্থ। গুরুতর অসুস্থ কথাসাহিত্যিক শওকত আলীকে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ৮১ বছর বয়সী শওকত আলীর ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছে বলে তার ছেলে সাংবাদিক শওকত কল্লোল জানিয়েছেন।
শওকত আলী একমাত্র কথা শিল্পী, যিনি বাংলা উপন্যাসে বৈচিত্র এনেছেন। একহাতে লিখেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূগোল, তৃণমূল মানুষের জীবন, মধ্যবিত্ত, দেশভাগ, প্রেম। সব স্বাদ আছে তার লেখায়। একটা উপন্যাসের সাথে আর একটার মিল কম। বাংলা সাহিত্যে উল্লেখ করার মতো উপন্যাসের তালিকা করলে সে খেরো খাতায় তিনি এগিয়ে। প্রদোষে প্রাকৃতজন তার কালজয়ী উপন্যাস। উপন্যাস ছাড়াও লিখেছেন ছোটগল্প, প্রবন্ধ, বাচ্চাদের জন্য গল্প-উপন্যাস। সব মিলে তার বই সংখ্যা হবে ৩০/৩৫।
ছড়া লেখার চেষ্টা করেছেন। গতক বছর নিজের লেখা নিজেরই মনোপুত হয়না। তাই নিজের লেখাকে বলেন বদঅভ্যাস। চোখে কম দেখেন, পড়তে পারেন না ঠিক মতো। স্মৃতি শক্তিটাও দুর্বল হয়ে আসছে। ঘরের মধ্যেই উঠা-বসা আর নাতির সাথে কথা বলে সময় পার করেছেন। কথার শব্দমালা সাজিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনন্য হওয়া এই মানুষের বাড়ি রাজধানীর হাটখোলায়।
কথা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদক। এছাড়া, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮), হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, অজিত গুহ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, লেখিকা সংঘ, ফিলিপস্ পুরস্কার, স্বদেশ চিন্তা সংঘসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ছাত্র জীবনে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেন। ছাত্রজীবনে কিছু দিন সাংবাদিকতাও করেছেন।
১৯৩৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি তার জন্ম। বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। বাবা সংসারি ছিলেন না। বৈরাগ্য ধারণ করেছিলেন। তার বাবা স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকসেনার গুলিতে শহীদ হন এপ্রিল মাসের ১৪/১৫ তারিখে। শওকত আলী সারা জীবন শিক্ষকতা করে পার করেছেন। বীরগঞ্জ হাইস্কুুলে প্রধান শিক্ষকের চাকরি দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু। ১৯৫৮ সালে তিনি ঠাকুরগাওঁ কলেজে যোগ দেন। সেখানে চার বছর শিক্ষকতা করেন। পরে ১৯৬২ সালে যোগদেন আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগে। চাকরি থেকে অবসর নেন গর্ভমেন্ট মিউজিক কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে, ১৯৯৩ সালে। এর আগে বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ারের সম্পাদক পদে চাকরি করেন ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯, তিন বছর। এ পদে প্রথমে সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। পরে সম্পাদক হন। এরমধ্যে ১৮ দিনের জন্য বদলী করা হয় আনন্দমোহন কলেজে।
শ্রীরামপুরের মিশরনারি স্কুলে তিনি পড়াশুনা শুরু করেন। বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যার অবদান আগ্রণী সেই ইউলিয়াম কেরি এই মিশনারি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে রায়গঞ্জ করনেশ্বর হাই স্কুল থেকে ১৯৫১ সালে মেট্রিকুলেশন ১৯৫২ সালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করেন।
ছাত্র থাকাকালীন সাংবাদিকতার কাজও করেছেন। মিল্লাত পত্রিকায়। কাজ করেছেন, সিকান্দার আবু জাফরের মাসিক ‘সমকাল’ এবং সাপ্তাহিক ‘মিঠেকড়ায়’।
তার লেখা অন্যতম উপন্যাসের মধ্যে আছে, প্রদোষে প্রাকৃতজন, ওয়ারিশ, অপেক্ষা, গন্তব্যে অতঃপর, পিঙ্গল আকাশ, উত্তরের খেপ, অবশেষে প্রপাত, জননী ও জাতিকা, জোড় বিজোড় ইত্যাদি।







