দল বিদায় নিলেও শোক-দুঃখে আছন্ন আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতির কমতি নেই। কোয়ার্টার ফাইনাল নিজেদের পছন্দ মতো দলও বেছে নিচ্ছে আর্জেন্টাইনরা। দেশটির মিডিয়ার খবর, অধিকাংশ আর্জেন্টাইনই চাচ্ছেন উরুগুয়ে জিতুক। তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে অপর ম্যাচে ব্রাজিলের পক্ষেই তাদের বাজির দরটা বেশি।
আর্জেন্টিনার বিখ্যাত পত্রিকা ওলে’র খবর জুয়ারিদের তালিকায় ব্রাজিলের দর এক টাকায় ৩.৭৫ টাকা। এরপরই রয়েছে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড। শেষ আটের অন্য দলগুলোর মধ্যে ক্রমানুসারে রয়েছে বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, উরুগুয়ে ও রাশিয়া। সবার শেষে আছে সুইডেন।
আর্জেন্টিনার মানুষ যাই ভাবুক এবং বেলজিয়াম শক্ত টিম হলেও ব্রাজিলিয়ানদের বেশি চিন্তা যেন ফ্রান্সকে নিয়েই। ফ্রান্স তাদের তাড়া করছে বলেই কিনা পগবাদের ভয় পাচ্ছেন রোনাল্ডো। সেলেসাওদের ইতিহাসে জনপ্রিয় ফুটবলারদের মধ্যে অন্যতম এ তারকার সাফ কথা, ‘ফ্রান্সকে নিয়েই চিন্তা বেশি। ফরাসিরা উরুগুয়ের কাছে হারলেই ভালো।’
১৯৯৮ বিশ্বকাপের স্মৃতি হয়তো ফেনোমেনন রোনাল্ডোর কাছে দুঃস্বপ্ন। তাই হয়তো শেষ চারে ফরাসিদের এড়াতে চান তিনি। তবে এটা তো সেমিফাইনালের কথা।
তার আগে কাজানে ব্রাজিল বনাম বেলজিয়াম ম্যাচে কী হবে?
পুরনো ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, ষাটের দশকে এমন ম্যাচে (ব্রাজিল-বেলজিয়াম) হ্যাটট্রিক করেছিলেন পেলে। বাইসাইকেল কিকে ভুবনভোলানো এক গোল করেছিলেন ফুটবলের ‘কালো মানিক’।
তখন অবশ্য বেলজিয়ামকে কেউ তেমন একটা চিনত না। এখন যেমন ব্রাজিলের পত্রিকাগুলোতেও হ্যাজার্ডদের সেদেশীয় নাম রাখা হচ্ছে। ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমে হ্যাজার্ডের নাম রাখা হয়েছে ‘হ্যাজাদিনহো’। বেলজিয়ান তারকা নিজে রোনাল্ডো ও রিভালদোর ভক্ত জেনেও তৃপ্ত ব্রাজিলিয়ানরা।
তবে তাদের চিন্তা ‘হ্যাজাদিনহো’কে তারা কীভাবে সামলাবেন সেটা নিয়েই। যদিও ম্যাচের আগের দিন হ্যাজার্ডের ক্লাব সতীর্থ উইলিয়ান বলেছেন, ‘হ্যাজার্ড বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। এই প্রথম তার বিরুদ্ধে খেলতে নামব। তবে ভয়ের কিছু নেই। আমাদের টিমে নেইমার কৌতিনহোরা আছেন। এরা কারোর চেয়ে কম নন। তাই হ্যাজার্ডদের বিরুদ্ধে আমরা জিতেই ফিরব।’
একটা বিষয় জানা যে, চেলসিতে পুরনো এবং নতুন ব্রাজিলিয়ানদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা হ্যাজার্ডের। অস্কার (এখন চীনে), ডেভিড লুইস (যদিও দলে নেই, চেলসিতে আছেন), ডিয়েগো কস্তা (এখন স্পেনের হয়ে খেলেন) এবং বর্তমানে উইলিয়ান। এরা সবাই একে অপরের বাড়িতে যান এবং ক্রিসমাস গিফ্ট আদান-প্রদান করেন।
রাশিয়া বিশ্বকাপ নেইমারের জন্য এখন পর্যন্ত একটি ঘটনাবহুল টুর্নামেন্ট। যিনি সমানতালে আলো ছড়াচ্ছেন বিতর্ক ও পারফরম্যান্সে। নকআউটপর্বে মেক্সিকো ম্যাচেও দুর্দান্ত খেলেছেন নেইমার। গোল করে এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়ে ম্যাচের নায়ক তিনি। বিশ্বকাপের এপর্যন্ত সেরা পারফরম্যান্সের দিনে অবশ্য বিতর্কেও ছাড়িয়ে গেছেন আগেরগুলোকে।
হ্যাজার্ড-লুকাকুদের বিরুদ্ধে নামার আগেও নেইমারের ফাউল আদায়ের কৌশল নিয়ে সমালোচনা চলছে। পুরনো পত্রিকা বের করে অনেকে লিখছেন, ২০১২ সালে করিন্থিয়ান্স কোচ থাকার সময় কীভাবে নেইমারের ‘ডাইভিং’ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন কোচ টিটে নিজে। যিনি এখন নেইমারকে আড়াল করে চলেছেন।
নেইমারকে আক্রমণের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন টিটের ভক্ত জার্মান কিংবদন্তি লোথার ম্যাথিউসও। তিনি বলেছেন, ‘নেইমার যেমন খেলোয়াড় তাতে তার অ্যাক্টিংয়ের দরকার নেই। ম্যারাডোনার এমন দরকার হতো না, মেসির এমন দরকার লাগছে না। নেইমারের কী দরকার? আমাদের সময় ছিলেন শুধু ভালদ্রামা (কলম্বিয়ান সাবেক অধিনায়ক)। এখন এদের সংখ্যা বড্ড বেশি হয়ে গেছে।’
সহজ কথা, বেলজিয়াম ম্যাচেও নেইমারকে ছিঁড়ে খেতে অনেকে তৈরি। তবে এসবে কান দিচ্ছেন না নেইমার। তাকে নিয়ে যতই আলোচনা-সমালোচনা হোক না কেন, মাঠে নিজের কাজটা দারুণভাবেই করে যাচ্ছেন ব্রাজিলের নাম্বার টেন। সেলেসাওদের ১০ নম্বর জার্সির মালিক গোল করে সমর্থকদের নিশ্চিত করছেন বিশ্বকাপ হয়তো তাদেরই। চলতি বিশ্বকাপে নেইমার দুটি গোল করেছেন, সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়েছেন একটি।
ভালো-মন্দের আলোচনা যাই হোক, হ্যাজার্ড-লুকাকু-ডি ব্রুইনদের বিরুদ্ধে বিগম্যাচে মূল ফোকাসে থাকবেন নেইমারই। চলতি বিশ্বকাপে তার মাঠের পরিসংখ্যান অন্তত সেটাই বলছে। বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩৫ ড্রিবল করেছেন। সর্বোচ্চ ফাউলের (২৩) শিকারও তিনি। সতীর্থ ও দলের জন্য সর্বোচ্চ ১৬টি সুযোগ সৃষ্টি করেছেন প্যারিস সাঁ সাঁ’র সুপারস্টার। এছাড়া অন টার্গেটে সর্বোচ্চ ১২টি শটও তার, এর মধ্যে করেছেন দুই গোল।
অন্যদিকে নেইমারের পাশে থেকে কম যাচ্ছেন না ফিলিপে কৌতিনহো। নেইমারের সমান গোল করেছেন দুটি। ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সির পাশাপাশি তাই নজরে থাকবেন ১১ নম্বর জার্সির মালিক কৌতিনহোও।
ব্রাজিল ফেভারিট, তবে কম যাবে না বেলজিয়ামও। গ্রুপপর্বের তিন ম্যাচ ও নকআউট ম্যাচে সেই প্রমাণ দিয়ে এসেছে তারা। হ্যাজার্ড-লুকাকুরা যে যেকোনো ডিফেন্স ভেদ করার ক্ষমতা রাখেন তার চার ম্যাচে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ১২ গোলই তার সেটা বলে দিচ্ছে।
দল ও সমর্থকদের অভয় দিয়েছেন ডিফেন্সের মূল ভরসা ভিনসেন্ট কোম্পানি। বলছেন, ব্রাজিলের একক নৈপুণ্যের খেলোয়াড় থাকতে পারে, তাই বলে তারা রাতের ঘুম নষ্ট করতে রাজি নন।
ম্যানচেস্টার সিটি তারকা বলেন, ‘আলাদা খেলোয়াড়ের দিক থেকে ব্রাজিল এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। এটা তাদের জন্য প্রশংসা, তার মানে এই নয় এতে আমাদের সম্ভাবনা কমে যাবে। আমরা ইতিমধ্যে হেরে গেছি, কেউই এটা ভেবে ঘুম নষ্ট করবে না।’
ব্রাজিলের আক্রমণ আর রক্ষণের কথা উল্লেখ করে কোম্পানি বলেন, ‘তাদের রক্ষণ সলিড। আক্রমণও ভালো। আমরা তাদের চোখে চোখ রাখতে চাই। আমরা ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি দল হিসেবে খেলতে চাই। এককভাবে তাদের সঙ্গে খেলে পারা যাবে না।’
ব্রাজিলকে হারাতে হলে যে পাওয়ার দরকার সেটা বেশ ভালোভাবেই জানেন কালো ঘোড়ারদের কোচ রবের্তো মার্টিনেজ। তার বক্তব্য, ‘একজন কোচ হিসেবে এই দলের আমার প্রচুর বিকল্প আছে। কিন্তু কি করতে হবে সেটা আমার মাথায় আছে। আমাদের পাওয়ার দরকার। আগের ম্যাচগুলোতে যা করেছি, সেই মানসিকতাটা ধরে রাখতে পারলে আমাদের বড় সুযোগ আছে।’
আরেকটু যোগ করে অলরেড কোচের মন্তব্য, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের জন্য এটা স্বপ্নের ম্যাচ। তারা এমন ম্যাচ খেলার জন্যেই জন্মেছেন। স্বভাবজাতভাবে আমরা জিততেই চাই।’
গ্রুপপর্বে তিন জয়ে সর্বোচ্চ পয়েন্ট-৯ পাওয়া তিন দলের একটি বেলজিয়াম। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার দুইয়ে আছেন বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু, ৪ গোল।
বেলজিয়ামের হয়ে নিজের শেষ ১৮ ম্যাচে ১৯টি গোলে অবদান রেখেছেন এডেন হ্যাজার্ড। নিজে ১০ গোল করেছেন এ সময়টাতে, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ৯টি। কোনো এক ম্যাচে সর্বোচ্চসংখ্যক আক্রমণ ৩১বার, বেলজিয়ামেরই।
তবে সবমিলিয়ে পরিসংখ্যান কথা বলছে ব্রাজিলের পক্ষেই। এ পর্যন্ত মাত্র ৪বার বেলজিয়ামের বিপক্ষে নেমেছে সেলেসাওরা। যেখানে তিন জয়ের বিপরীতে হার দেখেছে একটিতে।
১৯৬৩ সালে নিজেদের প্রথম দেখায় ৫-১ গোলে জয় পেয়েছিল ‘রেড ডেভিল’খ্যাত বেলজিয়াম। দুই বছর বাদে ৫-০ গোলের বিশাল এক জয় দিয়ে সেই হারের প্রতিশোধ নিয়েছিল সেলেসাওরা।
ব্রাজিল-বেলজিয়াম শেষবার লড়েছে ২০০২ বিশ্বকাপে। শুক্রবারের আগে সেটাই বিশ্বকাপে দুদলের প্রথম ও শেষ দেখা। দ্বিতীয় রাউন্ডে সেবারও ২-০ গোলে জয় পেয়েছিল ফেনোমেনন রোনাল্ডোর ব্রাজিল। পরে দলটি জিতে নেয় বিশ্বকাপই।
ব্রাজিল পাঁচবারের বিশ্বকাপ জয়ী। টুর্নামেন্টের শেষ তিন আসরে দুবার কোয়ার্টারে ছিটকে গেছে। নিজেদের শেষ ১৬ ম্যাচের ১৩টি জিতেছে ব্রাজিল, হারেনি কোনোটিতে।
পরিসংখ্যান যাই হোক, কোয়ার্টার ফাইনালে এক অন্যরকম ম্যাচ দেখবে ফুটবল বিশ্ব। মিডফিল্ড আর ফরোয়ার্ডের সঙ্গে জমাট রক্ষণ বেলজিয়ামের। তবে লাতিন এবং ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সঙ্গে ইউরোপের গতি যোগ করে যে শিল্প দাঁড় করিয়েছেন টিটে। তার সামনে যেকোনো রক্ষণ-দেয়ালই অনিরাপদ।
বেলজিয়াম দলে এই ম্যাচে খেলোয়াড় নিয়ে বড় ঝামেলা না থাকলেও ব্রাজিল পাচ্ছে না ডিফেন্সের অন্যতম সেরা অস্ত্র কাসেমিরোকে। হলুদ কার্ডের কারণে এই ম্যাচে খেলতে পারছেন না রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
তবে সবদিক থেকে একটা ভারসাম্যপূর্ণ দলের সঙ্গে ব্রাজিলের জন্য বাড়তি শক্তি কোয়ার্টার ফাইনালের অভিজ্ঞতাও। ১৯৯০ সালের পর কখনও বিশ্বকাপের কোয়ার্টারের আগে ছিটকে যায়নি ব্রাজিল। টানা ৭বারের মতো শেষ আটে খেলছে সেলেসাওরা। আগে মাত্র ২বার হেরেছে সেরা আটে।
ব্রাজিলের জন্য একটি ‘অপয়া’ পরিসংখ্যাও আছে। বিশ্বকাপের শেষ তিন আসরেই ইউরোপিয়ান দলের কাছে হেরে ছিটকে গেছে ব্রাজিল। ২০০৬-এ ফ্রান্স, ২০১০-এ নেদারল্যান্ডস ও ২০১৪-এ ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে। এবার ‘কালো ঘোড়াদের’ মিশনের সামনে হলুদ ঝড় তুলে সেলেসাওরা কী করে সেটাই দেখার বিষয়।









