বাংলাদেশ ব্যাংকের শত কোটি টাকা লোপাট হওয়ার খবরে কে কতোটা মুষড়ে পড়েছেন জানি না, তবে দুঃখে শোকে আহাজারি করছে আমার খুব কাছের এক বন্ধু। তার মুখে একটাই আহাজারি ‘স্বামী কেনো হ্যাকার না?’
বাংলা সিনেমার নাম অনুসরণ করে তার এই সংলাপটি বিবাহযোগ্যা পাত্রীদের কাছে বেশ উৎসাহব্যঞ্জক হতে পারে। সত্যিই তো, নগদ ৮০০ কোটি টাকা যদি এতো সহজে হাতিয়ে নেয়া যায়, তাহলেতো বিয়ের বাজারে সিঁধেল চোর বা ডাকাত বা ডিজিটাল পরিচয়ে পরিচিত হ্যাকাররাই বেশ দামী পাত্র। এই পরিমাণ টাকা ১০০ জনে মিলে হাতালেও ৮ কোটি করে টাকার মালিক হতে পারবে একেকজন।
আমি হিসাব বুঝি না, পুরো হিসাবটাই লোকমুখে শোনা। উহ্! ভাবা যায় জীবনটা কতো আরামে কাটবে তাদের! আহারে দানে দানে একদানই যথেষ্ট।
অবশ্য হ্যাকারদেরই বা কী দোষ? আপনি যদি প্রতিদিন আপনার বাড়ির সামনে একটি নোটিশ বোর্ড টাঙিয়ে আপনার বাড়িতে আজ কতো টাকা গচ্ছিত আছে, সে খবর ঝুলিয়ে দিতে থাকেন, তাহলে তো ডাকাতদল উৎসাহিত হবেই। আমরা জানি মানুষ নানা ঝামেলা এড়িয়ে চলার জন্য নিজের বেতন, ব্যাংক ব্যালান্স ও বয়সটা গোপন করে রাখে। কে কতো ধনী, তা বোঝা যায় তার টাকা কোথায়, কীভাবে খরচ হচ্ছে, তা দেখে। এর জন্য কারো নোটিশ বোর্ড টাঙানোর দরকার হয় না।
অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছুদিন ধরে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ডে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের তথ্য প্রদর্শন করে আসছে। এর কোনো মানে হয়? জনগণকে তথ্য জানাতে চাইলে এর চাইতে আরো স্মার্ট উপায় ছিলো। এটা কি হোজ্জা টাইপ কাজ হয়ে গেলো না? সেই রিজার্ভের অংক দেখতে দেখতে নিজেদের আর ধরে রাখতে পারলো না চোরের দল। ব্যস, হাতিয়ে নিলো বেশ খানিকটা টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এহেন অবস্থা দেখে বারবার মনে হচ্ছে- অনেক আগে প্রচারিত বিটিভির সেই বিজ্ঞাপনটির কথা, ‘ঘরের কথা পরে জানলো ক্যামনে? এই যে এমনে’, মানে ওই নোটিশ বোর্ডের মাধ্যমে।
তবে অপ্রিয় হলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, হ্যাকারতো কোনো ভুল করেনি। যে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এতো টাকা সরিয়ে নেয়ার এবং এর কিছুটা অংশ ক্যাসিনোতে খরচ করারও প্রায় দুইমাস পর মাননীয় অর্থমন্ত্রী গণমাধ্যম থেকে এই ভয়াবহ তথ্য জানতে পারেন, নিজের দায়িত্বে থাকা কোষাগার থেকে জনগণের অগণিত টাকা লোপাট হওয়ার পরও গভর্নর সাহেব যখন কাউকে কিছু না জানিয়ে ভারতে গিয়ে মতবিনিময় সভায় বসতে পারেন, খোদ ব্যাংকিং সচিব এবং কোনো কোনো ডেপুটি গভর্নরও যখন বিষয়টি সম্পর্কে অন্ধকারে- তখন আর হ্যাকারদের আর দোষ কী? আর যেহেতু ইতোমধ্যেই টাকাটা ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে পাখা মেলে উড়ে গেছে, তা কি আর ফিরে আসবে কোষাগারে?
ভাগ্যিস হ্যাকাররা ইংরেজিতে সামান্য ভুল করেছিলো, তাতেই রক্ষা পেলো এক বিলিয়ন ডলার। নতুবা তাও নাকি চলে যেতো ওদের পকেটে। তাহলে এটা মানতে হচ্ছে সব ভুল মন্দ না। হ্যাকারদের ইংরেজিতে এই ভুলটাকে ব্যবসার মূলধন করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে সাইফুরস নামের একটি কোচিং সেন্টার। প্রশ্ন উঠেছে কেনো তারা এরকম মারাত্মক একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে সঠিক ইংরেজি শেখানোর বিজ্ঞাপন দিচ্ছে?
কেনো, এখানে তাদের দোষটা কোথায়? বিষয়টা হাস্যকর বটে কিন্তু অপরাধ নয়। তারা তো মিথ্যা কিছুকে ইস্যু করেনি। দোষ যদি কেউ করে সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ করেছে। তারা তাদের আইটির নিরাপত্তা বিধান করতে পারেনি অথচ প্রতিদিন কত টাকা জমা আছে সেই বিজ্ঞাপন চালিয়ে গেছে, আইটির সাথে যুক্ত কর্মকর্তারা সময়মতো বিপদ সংকেতটি দেননি, গর্ভনর সাহেবও একদম মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন যা সত্যি অনভিপ্রেত।
আর নিয়ম মাফিক কর্তৃপক্ষ আমাদের জানাচ্ছেন তদন্ত হবে, প্রয়োজনে মামলা হবে, দোষীদের খুঁজে বের করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। হলে ভালো, না হলেও ক্ষতি নেই। যা হয় না ছ’য়ে, তা হবেনা ন’য়ে। এতো বড় চুরির দুইমাস পর যখন অর্থমন্ত্রীসহ দেশবাসী সেই খবর জানতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে কী কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
সত্যিইতো ‘টাকা নিলো হ্যাকার, কেউ নেই দেখার’। তবে জনান্তিকে বলে রাখি ‘স্বামী কেনো হ্যাকার না?’ এই কথাটি আমার বেশ মনে ধরেছে। ভবিষ্যতে সিনেমা বানালে এটাই হবে তার নাম।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






