সৈয়দ শামসুল হক কতটা রাজনীতি করতেন তা জানি না; কিন্তু তিনি ছিলেন সব্যসাচীর মত জ্ঞানী। মানে দুহাত সমানভাবে ব্যবহারে পারদর্শী, অপূর্ব কুশলী বাংলার গণমানুষের
পক্ষে ছিলেন সারা জীবন। বাংলাদেশের গণমানুষের স্বাধীনতা ও অর্থ-মুক্তির
জন্য কলম যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন সব সময়। সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ১৯৩৫
সালের ২৭শে ডিসেম্বর। সেই ২৭ তারিখেই তবে ভিন্ন মাসে মানে সেপ্টেম্বর ২০১৬
তারিখে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামে। আট ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন সৈয়দ হক। ১৯৫১ সালে ‘অগত্যা’ নামে একটি ম্যাগাজিনে তার প্রথম প্রকাশিত লেখাটি ছিল একটি গল্প। এরপর তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন সাহিত্যের নানা ক্ষেত্রে। তাঁর মৃত্যুর পরেও একজন দুর্মুখ আজ ফেসবুকে তাঁর সম্পর্কে অনেক বাজে কথা লিখেছে, দালাল শব্দটি লিখতেও তাঁর বাঁধেনি, বলতে চেয়েছে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাবার জন্য দালালী করেছেন সৈয়দ হক। তিনি কীপন্থী তা আর বুঝার বাকী নেই। তাদের সরকারের আমলেই মানে ১৯৬৬ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে সৈয়দ হক পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
আমরা জানি তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। কয়েকদিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাতের ছবি যারা দেখেছেন তাঁদের কাছে আমাদের প্রধামন্ত্রীর আন্তরিকতা স্ফটিকের মতই স্পষ্ট। ৮১ বছর বয়সী সৈয়দ শামসুল হকের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বয়সের তফাৎ ১০ বছরের বেশী। প্রধানমন্ত্রী হয়তো মাঝে মাঝে সৈয়দ হকের কাছে পরামর্শ নিতেন, তাতেই তাঁদের মাঝে তৈরী হয় খুব ভালো হৃদ্দিক সম্পর্ক, কৃতজ্ঞতা বশে। সৈয়দ হককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক শ্রদ্ধা করতেন তা তাঁর হাসপাতালে ছুটে যাওয়া ছাড়াও নানা সময়ের বিভিন্ন কথায় ও কাজে প্রকাশ পেয়েছে। একই ভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রতি সৈয়দ হকের ছিল আলাদা মাত্রার সম্মানের ভালোবাসা। তাই তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্যে সৈয়দ হক লিখেছিলেন-
আহা, আজ কী আনন্দ অপার!
-সৈয়দ শামসুল হক
আহা, আজ কী আনন্দ অপার
শুভ শুভ জন্মদিন দেশরত্ন শেখ হাসিনার
জয় জয় জয় জয় বাংলার
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বপ্নবাহু তাঁর
শুভ শুভ জন্মদিন দেশরত্ন শেখ হাসিনার
পঁচাত্তরের কলঙ্কিত সেই রাত্রির পর
নৌকা ডোবে নদীর জলে
সবাই বলে নৌকা তুলে ধর
কেইবা তোলে কে আসে আর
স্বপ্নবাহু তাঁর
বঙ্গবন্ধু কন্যার
শুভ শুভ জন্মদিন দেশরত্ন শেখ হাসিনার
শেখ হাসিনা সব নদীতে
দুর্জয় গতিতে
টেনে তোলেন নৌকা আনেন উন্নয়ন জোয়ার
শুভ শুভ জন্মদিন দেশরত্ন শেখ হাসিনার
জাতির পিতার রক্তে দেশ
এখনও যায় ভেসে
সেই রক্তের পরশ মেখে দেশ উঠেছে জেগে
এ দেশ তোমার আমার
জয় জয় জয় জয় বাংলার
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বপ্নবাহু তাঁর
শুভ শুভ জন্মদিন দেশরত্ন শেখ হাসিনার
আহা, আজ কী আনন্দ অপার!
সৈয়দ হকের ইচ্ছা ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনে আজ মানে ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে কষ্ট করে হলেও কবিতাটি পড়ে শুনাবেন। দেশের প্রতি, বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের প্রতি তাঁর অন্তরের উপলব্ধির কথা সবাইকে জানাবেন। শেষ যাত্রার আগে সত্য প্রকাশ করে যাবে আর ১০ জনের মতো ক’রে। কিন্তু বিধি বাম, তা আর হলো না, চলে গেলেন সৈয়দ হক না ফেরার দেশে। এ খবরে হতবাক হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাঁর জন্মদিনের সমস্ত আয়োজন বন্ধ রাখতে বললেন।
তিনি বললেন, প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর শুনার পরে ঘটা করে জন্মদিন পালন অনৈতিক, অন্যায়। এটা প্রধানমন্ত্রীর বোধে লেগেছে। এই খবর জানলাম একটু আগেই মিডিয়ায়। আরো দেখলাম বিএনপি সৈয়দ হকের মৃত্যুতে কোন সমবেদনা জানায়নি তাই তাঁদের ঘরণার বুদ্ধুজীবী ডক্টর জাফরুল্লাহ উষ্মা প্রকাশ করেছেন।
যা হক, ঘটা করে জন্মদিন পালন না করার প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে মনে পড়ে ১৯৭২ সালের কথা। সদ্য স্বাধীন দেশে ফিরে মেজর জিয়া বেগম জিয়ার সাথে সংসার করতে অস্বীকার করে তাকে এড়িয়ে চলতেন, বাসায় যেতেন না। কারণ বেগম জিয়া পাক হানাদারদের হাতে বন্দি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন পুরো সময়ে। স্বাধীনতা পরিবর্তী সময়ে তখন বেগম খালেদা জিয়ার দুঃখদিনের সাথী ছিলেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রয়াত স্বামী ডক্টর ওয়াজেদ। তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে খুব আন্তরিক ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই সম্পর্কের সুত্র ধরেই বেগম মুজিবের চাপে বঙ্গবন্ধুর আদেশে মেজর জিয়া বেগম খালেদা জিয়াকে ঘরে তুলে নিতে বাধ্য হন। এই ঘটনার পরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর স্বামী ডক্টর ওয়াজেদ সাহেবের সাথে বেগম জিয়ার সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছিলো।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে দুষ্টু লোকেদের ষড়যন্ত্রে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বেগম জিয়ার সম্পর্কের একটু অবনতি হয় কিন্তু ডক্টর ওয়াজেদ সাহেবের সাথে তা টিকে থাকে আগের মতোই। তাঁদের সম্পর্ক নষ্ট করা যায়নি। তখন ৭ দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর ১৫ দলের নেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন এক সাথে মিলে। তাই বর্তমান বিএনপি ঘরণার সাংবাদিক সৈয়দ আব্দালকে দিয়ে এরশাদ সরকার সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় বেগম জিয়া আর ডক্টর ওয়াজেদকে জড়িয়ে নোংরা কভার স্টোরি করা হয়। যাতে ৭ দল আর ১৫ দলের ঐক্যে ফাটল ধরে। কিন্তু ধরেনি। তাও সম্পর্ক টিকে থাকে শেখ হাসিনা আর ডক্টর ওয়াজেদ সাহেবের সাথে বেগম জিয়ার। তাই ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া ছুটে যান বেগম জিয়াকে অভিনন্দন জানাতে। যা ফলাও করে মিডিয়ায় প্রচার করা হয় তখন।
যে বেগম জিয়াকে বঙ্গবন্ধু তাঁর সংসার ফিরিয়ে দিলেন। ইজ্জতের সাথে নতুন জীবন দিলেন, আর সেই বেগম জিয়া কার প্ররোচনায়, কীসের স্বার্থে ১৫ আগস্ট তাঁর বিতকিত জন্মদিন পালন করেন! অবাক একটু লাগে বৈকি। সেই সাথে নানা প্রশ্ন মনের জানালায় উঁকি দেয় আমাদের, আমরা যারা পুরাতন দিনের ঢের ঢের কথা জানি। আশা করি সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যু সংবাদের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ঘটা করে জন্মদিন পালন না করার এই সিদ্ধান্তের কথা বেগম জিয়ার দুষ্টু পরামর্শকগণ মনে রাখবেন, তাঁদের নিজেদের ইজ্জতের স্বার্থেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







