‘ভুল আসামি’ হয়ে ২৬ মামলায় প্রায় ৩ বছর কারাগারে থাকার পর হাইকোর্টের যে বেঞ্চ থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন পাটকল শ্রমিক জাহালম, আজ ভাইকে নিয়ে ঢাকায় এসে তিনি সেই কোর্টটি ঘুরে দেখে গেলেন।
মামলা সংক্রান্ত একটি কাগজের কপি দুদক অফিসে দিতে বুধবার দিন ভাইকে নিয়ে ঢাকায় আসেন জাহালম। এইদিন বিকেল ৫টায় দুই ভাই ঢুকেন হাইকোর্টে।
এসময় চ্যানেল আই অনলাইনকে জাহালম বলেন: জীবনে এই প্রথম হাইকোর্টে আসলাম। এই হাইকোর্ট থেকেই আমার জামিন হইছিল বলেই আজ আমি মুক্ত।
তিনি বলেন: আমাকে জামিন দেওয়া সেই (এনেক্স ২৫) কোর্টকে ধন্যবাদ। বিচারপতি স্যারদের ধন্যবাদ। বর্তমানে আর্থিক সমস্যায় আছি। তবে আমার পরিবার সন্তানদের সাথে আছি বলেই ভাল আছি। আমি আদালত ও রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই।
অন্যদিকে জাহালমকে আটক ও কারাবাসের ঘটনার বিষয়ে হলফনামা আকারে দেওয়া দুদকের বক্তব্য সম্বলিত প্রতিবেদন আজ শুনানির জন্য হাইকোর্টে উঠে।
আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকসহ পাঁচটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে পক্ষভুক্ত করার দুদকের আবেদন গ্রহণ করেন। তবে জাহালমকাণ্ডে সম্পৃক্ত বাকি ব্যাংকগুলোকেও এতে পক্ষভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সেই সাথে জাহালমের বিরুদ্ধে দুদকের হওয়া সব মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর), অভিযোগপত্র (সিএস)সহ যাবতীয় নথি দাখিল করতে বলেন আদালত। আগামী ১০ এপ্রিল এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
বুধবার শুনানিতে আদালত বলেন: দুদক যখন জানতে পারলো জাহালম নির্দোষ, তখন তার জামিন করানো উচিত ছিল। এর দায় দুদককে নিতেই হবে।
এসময় দুদকের আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত বলেন: দুদককে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। দুদক একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠান। দুদক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা হোক, তা আমরা চাই না। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি জাহালমের জামিন আদেশের সময় হাইকোর্টের এই বেঞ্চ বলেন: জামিন নেয়ার মাধ্যমেই এ বিষয়টির শেষ হয়ে যাচ্ছে না। এ ঘটনার পেছনের ঘটনা কী, কারা এর সাথে জড়িত তা খুঁজে বের করতে হবে।
তখন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জাহালমের ঘটনার বিষয়ে সবিস্তার দুদকের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য চার সপ্তাহের সময় চান। আদালত সময় আবেদন মঞ্জুর করেন। সেই ধারাবাহিকতায় আজ বিষয়টি হাইকোর্টে উঠে।
‘ভুল আসামি’ হয়ে ২৬ মামলায় প্রায় ৩ বছর কারাগারে থাকা পাটকল শ্রমিক জাহালমকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি সব মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে ওইদিনই মুক্তির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আদেশ দেন। হাইকোর্টের ওই জামিন আদেশের কয়েক ঘণ্টা পরই কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম।
এর আগে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লোকটির বয়স ৩০-৩২ বছরের বেশি না। পরনে লুঙ্গি আর শার্ট। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এ বিচারকের উদ্দেশে তাকে বারবার বলতে দেখা যায়, ‘স্যার, আমি জাহালম। আমি আবু সালেক না,আমি নির্দোষ।
আবু সালেকের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ২৬টি মামলা হয়েছে। কিন্তু আবু সালেকের বদলে জেল খাটছেন, আদালতে হাজিরা দিয়ে চলেছেন এই জাহালম। যিনি পেশায় পাটকল শ্রমিক। যার কারাবাসের তিন বছর পূর্ণ হবে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি। যেখানে তদন্ত করে দুদক বলছে, জাহালম নিরপরাধ। একই মত দেয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।’’
পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনটি গত ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত। এরপর বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ জামিন আদেশ দেন।







