রাজনীতিতে আদর্শিক ও নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্রমশ নীতিনির্ধারকদের দৃশ্যপট হতে আড়ালে চলে যাচ্ছে৷ রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি আর তাদের কাছে নেই৷ যে মানুষটা যে দলের নেতাকর্মীদের মারপিট করেছেন পরবর্তীতে দেখা গেছে ক্ষমতার পালাবদলে তিনিই সে দলের নেতা হয়ে গেছেন৷ নেতাদের জন্মদিন, মৃত্যুদিনও হয়ে উঠছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক৷ যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের প্রতিষ্ঠাতার জন্মদিন, মৃত্যুদিন পালন হয় একরকম ক্ষমতার বাইরে থাকলে হয় অন্যরকম৷ নেতারাও ভুলে যান রাজপথের লড়াই সংগ্রামের স্মৃতি৷ সবাই মুখেমুখে কেবল বলেন ত্যাগীদের মূল্যায়ন হচ্ছেনা কিন্তু কেউ মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠা করছেন না৷
রাজনীতির অঙ্গনে হাইব্রিড, মৌসুমী পাখি, কাউয়া, ফার্মের মুরগী, মশারির ভেতরে মশারী প্রভৃতি কত কত মজাদার কথা শোনা যাচ্ছে৷ যত বেশি তাদের সম্বন্ধে বলা হচ্ছে তত বেশি তাদের সংখ্যা বাড়ছে৷ ক্ষমতার গন্ধের ঝাঁজ ক্ষমতাবিহীন সঙ্গকে নিমেষেই ভুলিয়ে দেয়৷ তারা তখন পছন্দ করে চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে৷ তখন হারিকেন জ্বালিয়ে যারা দলীয় কার্যালয়ে বসে থেকেছে, খেয়ে না খেয়ে যারা দলের কর্মসূচিতে থেকেছে, রাজপথে পুলিশের পিটুনি খেয়েছে সেসব সঙ্গকে ভুলিয়ে দেয় ক্ষমতার গন্ধ৷ বাম, ডান, বুর্জোয়া, আধা বুর্জোয়া সব জায়গাতেই ক্ষমতার গন্ধের বিপুল প্রভাব৷ বামনেতা ক্ষমতার গন্ধে শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে দিচ্ছে অতীত দিনের স্মৃতি৷ অথচ সেইদিনই তাকে এই দিনে নিয়ে এসেছে৷ কাজী জাফর আহমেদ যদি বাম কমিউনিষ্ট নেতা হিসেবে স্বীকৃত না হতেন তাহলে কি এরশাদ তাকে ডেকে এনে প্রধানমন্ত্রী বানাতেন? অাবদুল মান্নান ভুঁইয়া, সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা ফখরুল, বেগম মতিয়া চৌধুরী, নূরুল ইসলাম নাহিদ তারা কোত্থেকে এলেন? ক্ষমতার স্পর্শ পেয়ে তারা কি মূল্যায়ন করেন তাদের সেদিনের সেই সাথীদের? বিরোধী দলে থাকার সময়টুকুই নেতাকর্মীদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ এসময়টা কেবলই দলীয় আদর্শিক চেতনার ভিত্তিতে আত্মদানের সময়৷ ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় কথিত হাইব্রিড, মৌসুমী পাখি, ফার্মের মুরগী গংদের কোন অানাগোনা থাকেনা৷ এদের অনুপ্রবেশ না ঘটালে দলের কী কোন ক্ষতি হতো? বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে জাসদের সভাপতি ছিলেন হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া৷ এই ক্ষমতা বঞ্চিত সময়ে শরীফ নূরুল আম্বিয়া যদি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন না করতেন হাসানুল হক ইনু কি পারতেন দলকে এই ক্ষমতার পর্যায়ে নিয়ে আসতে?কিন্তু বাস্তবে কী ঘটল তিনি মন্ত্রী হলেন আর আম্বিয়াকে ছুঁড়ে ফেললেন৷ ক্ষমতার গন্ধ এক জাসদকে দুই জাসদে পরিণত করল৷ কেন এমন হচ্ছে?
বামজোট পার হয়ে ১৪ দলীয় জোটে এসে বামনেতা দীলিপ বড়ুয়া টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হয়ে গেলেন৷ মন্ত্রী হওয়ার পরে সাম্যবাদী দল(এম,এল) বিভক্ত হয়ে গেল৷ ক্ষমতার স্পর্শ দিয়ে দিলীপ বড়ুয়া সকলকে এক রাখতে পারলেন না৷ কিন্তু ক্ষমতাহীন থাকার সময় ঠিকই তারা এক থাকতে পেরেছিলেন৷ ক্ষমতাহারা দুঃসময়ে যদি তারা সাম্যবাদী দল(এম,এল) এর রাজনীতি চালু না রাখতে পারতো তাহলে কি দিলীপ বড়ুয়া মন্ত্রী হতে পারতেন?ক্ষমতার গন্ধে হয়তো দিলীপ বড়ুয়া বদলে গেলেন তাই নয় কি?যে দলকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যায় সে দলেই গড়ে ওঠে বৈষম্য, গড়ে ওঠে ক্ষমতাগন্ধী সিন্ডিকেট৷ মন্ত্রী তার পছন্দের লোককে নিয়োগ দেয় সহকারী এক্ষেত্রে দলের মতামতের কোন তোয়াক্কা করা হয়না৷ মন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের হাতেই থাকে সর্বময় ক্ষমতা৷ বর্তমানে ১৪ দলের শরীক হিসাবে সরকারে রয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি৷ এখানেও দুঃসময়ের নেতা কর্মীদের নিস্ক্রিয় হয়ে যেতে অথবা অন্যদলে যোগদানের কথা শোনা যায় ৷ এ নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্টও হয়েছে৷দলের দুঃসময়ে একত্রে থেকে পার্টি করতে পেরেছেন কিন্তু সুমময়ে পারেননি এমন ঢের নজীর রয়েছে এখানে৷ বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রভাবশালী নেতা হায়দার আকবর খান রনো দল ত্যাগ করলেন৷ ক্ষমতাগন্ধী সময়ে দল ত্যাগ করলেন আজিজুর রহমান, আব্দুস সাত্তার, মোজাম্মেল হক তারা, রাগীব আহসান মুন্নাসহ অসংখ্য নেতাকর্মী৷ কেন এমন হয়?
যারা একদিন ঢাকা শহরে বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেত মন্ত্রী সাহচর্যে তারা হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট কারের মালিক৷ তাদের রয়েছে বেতনভূক্ত ড্রাইভার৷ আর এক শ্রেণীর নেতাকর্মী আগে যা ছিল এখনও তাই আছে৷ ক্ষমতার চালকরা তাদের ন্যায্য নাগরিক দাবি মেটাতেও চেষ্টা করেন না৷ মূলত দলের ভেতরে গড়ে ওঠা চরম বৈষম্যই ক্ষোভ সৃষ্টি করে চলেছে৷ দুঃসময়ের ঝাঁজ সবার কাছেই সমানভাবে পৌঁছায় কিন্তু সুসময়ের নয়৷ সুসময় বরণ করে নিচ্ছে সুবিধাভোগীদের ও চাটুকারদের৷ দুঃসময়ে দলের পতাকা ধরে রেখে যারা এই সুসময়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে তারা তলিয়ে যাচ্ছে৷ ক্ষমতার আঁচল তলে গিয়ে কেউই মূল্যায়ন করছেনা হয়তো সেইসব দুঃসময়ের সাথীদের৷ চলছে গ্রুপবাজি, নিন্দা, তোষামোদ ও সিন্ডিকেট বাজি৷ নিজ সিন্ডিকেটের বাইরে গেলে নিন্দাবাদ আর ভেতরে এলে প্রশংসাবাদ৷ যে নেতাকে ঘিরে আখের গুছালো একসময় তার মুখেও শোনা যায় তার নিন্দা৷ নিন্দা করতে করতে হঠাৎ দেখা যায় আবার তোয়াজ তোষামোদেও ফিরে আসতে৷ আসলে এর মূলেও পাওয়া না পাওয়ার বেদনাই৷ দুঃসময়ের সাথীরা এসবের খবর রাখেনা৷ সুসময়ের সুবিধাভোগী নেতারা তাদের খবরও নেয়না৷ অসুস্থ হলেও পাশে দাঁড়ায় না৷ দেয়না ক্ষমতা সম্পর্কিত ন্যায্য নাগরিক চাহিদা মেটানোর সুযোগ৷ সকলেই ব্যস্ত নিজ নিজ গ্রুপ নিয়ে৷ নেতারাও তাদের সাথে নানা অনৈতিক বিষয়ের সাথে জড়িয়ে যান বলে শত অভিযোগেও তাদের ছাড়েন না ৷ কারণ ছেড়ে দিলে সে শত্রু হয়ে যাবে ও সব তথ্য ফাঁস করে দেবে এই ভয়৷
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শীঘ্রই দুঃসময়ের নেতাকর্মী ও সুসময়ের নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হবে৷ যেসব দলে এমপিত্ব মন্ত্রীত্ব পায়নি সেসব দলের বাইরের সকল দলের বেলাতেই তা প্রযোজ্য৷ একই দল করবে আর তার ভেতরে থেকেই একটা শ্রেনী দলের জন্য সামান্য ত্যাগ স্বীকার না করেও বাড়ি গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হবে আরেক শ্রেনী দলের জন্য জীবন যৌবন বিসর্জন দিয়ে, হামলা মামলার শিকার হয়ে জেল খেটে কিছুই পাবেনা এই অবস্থার বিরুদ্ধে একদিন ভুক্তভোগীরা জাগবেই৷ চিকন স্বাস্থ্য ভালো না৷ মোটা হতে হবে৷ সেই মোটা যদি প্রতিমুহূর্তে কেবল বাড়তেই থাকে মোটা ব্যক্তির পতন কি অনিবার্য না?তখন বাঁচতে গেলে মোটাকে চিকনের দিকে নিয়ে যাওয়াই কি সঙ্গত নয়? না হয় স্ট্রোক হতে কে বাঁচাবে? ক্ষমতায় যাওয়া সকল দলেই এমন মোটাতাজাদের দৌরাত্ম বেড়েই চলছে৷ নীতিনির্ধারকরা যদি দ্রুত এর লাগাম টেনে না ধরে সামনে সমূহবিপদ ঘনায়মান৷ তারা একদিন বলবে, তুমি থাকবে অট্টালিকায় আর আমি থাকবো গাছতলায় তবু তোমাদের নেতা মানব, তোমরা নেতা হবে আমাদের ত্যাগে আমরা এই ত্যাগকে নিয়তি হিসাবে মানতে পারিনা৷ মানুষ জাগনা ঘুমে কিন্তু বেশিক্ষণ শুয়ে থাকেনা৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








