দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি যে মহামারি আকার ধারণ করেছে, তা নতুন নয়। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় নিযুক্ত নেদাল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হ্যারি ভ্যারওয়ে ‘বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতারণা এবং দুর্নীতিই বড় বাধা’ বলে অভিযোগ করেছিলেন।
এবার অবশ্য অন্য একটি প্রকল্পে যেন সাগরচুরির মতো বিষয় উঠে এসেছে। এবারকার প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। একটি সহযোগী গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়: সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য সেখানে নির্মিত ভবনে আসবাবপত্র কেনা ও ফ্ল্যাটে তোলার ক্ষেত্রে ঘটেছে অস্বাভাবিক এ ঘটনা।
কেজিখানেক ওজনের একটি বৈদ্যুতিক কেটলি নিচ থেকে ফ্ল্যাটে তুলতেই খরচ হয়েছে প্রায় তিন হাজার টাকা। একই রকম খরচ দেখানো হয়েছে জামা-কাপড় ইস্ত্রি করার কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি ইলেক্ট্রিক আয়রন ওপরে তুলতে। প্রায় আট হাজার টাকা করে কেনা প্রতিটি বৈদ্যুতিক চুলা ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিতে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি।
এছাড়া প্রতিটি শোয়ার বালিশ ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় হাজার টাকা করে। আর একেকটি ওয়াশিং মেশিন ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার টাকারও বেশি। এভাবে ওয়াশিং মেশিনসহ অন্তত ৫০টি পণ্য ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ক্রয়মূল্যের প্রায় অর্ধেক, কোনো কোনোটিতে ৭৫ শতাংশ।
অস্বাভাবিক এই অর্থ ব্যয় কেবল ভবনে ওঠানোর ক্ষেত্রেই নয়, আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রেও দেখানো হয়েছে। প্রতিটি বিছানার চাদর কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৯৮৬ টাকা করে। এছাড়া ৩৩০টি বালিশের ক্ষেত্রেও দেখানো হয়েছে কাছাকাছি ব্যয়। কাপড় পরিষ্কারের জন্য ১১০টি ওয়াশিং মেশিনের প্রত্যেকটি কেনা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ১১২ টাকা করে। ১১০টি টেলিভিশনের প্রত্যেকটি কেনা হয়েছে ৮৬ হাজার ৯৬০ টাকায় এবং সেগুলো রাখার জন্য টেলিভিশন কেবিনেট কেনা হয়েছে ৫২ হাজার ৩৭৮ টাকা করে।
সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে যে সরকারি টাকা হরিলুটের মহোৎসব চলছে তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। নাহলে কোনোভাবেই সরকারি টাকায় আকাশ সমান দামে এসব আসবাবপত্র কেনা এবং পরবর্তী সময়ে তা ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে তুলতে অস্বাভাবিক হারে অর্থ ব্যয় করতে পারতেন না পাবনার পূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা।
আমরা মনে করি, দেশের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি শক্তির উন্নয়ন প্রয়োজন। এজন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন দরকার। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এখানে দুর্নীতির মহোৎসব চলবে। বরং এভাবে চলতে থাকলে কাজের বদলে দেশ-বিদেশে এই প্রকল্প দুর্নাম কুড়াবে।
তাই শিগগিরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সরকারি টাকার এমন হরিলুট বন্ধ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে আমরা সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানাচ্ছি।








