মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে। ইচ্ছে হলেও সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে মিয়ানমারের মুসলমানেরা বৌদ্ধদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারবেনা, বাংলাদেশের হিন্দুরাও মুসলমানদের উপর পারবেনা। আবার এই রোহিঙ্গারাই বাংলাদেশে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে বলীয়ান হয়ে বৌদ্ধদের উপর হামলা চালায়।
যেমন রামুতে এরকম হামলা আমরা দেখেছি। ভারত গুজরাটসহ বিভিন্ন প্রদেশে হিন্দুদের দ্বারা মুসলমান নির্যাতনও দেখেছি। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের মুসলমানেরাও এর প্রতিবাদে হিন্দুদের উপর চড়াও হয়েছিল। এক্ষেত্রে একদেশের হামলাকারী ও আরেকদেশের প্রতিবাদকারী উভয়েই সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট। মিয়ানমারে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চলছে, রুখে দাঁড়াও বাংলার মুসলমান, এরকম আহ্বান চরম সাম্প্রদায়িক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ।
শুধু মুসলমান বলেই নির্যাতিতদের সীমান্ত খুলে দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়দানের আহ্বানও সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট। রোহিঙ্গারা মুসলিম না হয়ে যদি হিন্দু অথবা খ্রিষ্টান হতো তাহলে অনেকেই এই আশ্রয়দানের আহ্বান জানাতো না। কোনো গ্রামে ডাকাত পড়লে পুলিশ পাশের গ্রামের মানুষদের আক্রান্তদের আশ্রয়দান করতে চাপ সৃষ্টি করে না তারা গ্রামটিকে ডাকাত মুক্ত করতেই চেষ্টা করে। যদি তা না করে আক্রান্ত গ্রামবাসীদের বলা হয় তোমরা পাশের গ্রামে আশ্রয় নাও সেটা আইনশৃংখলা বাহিনীর চরম ব্যর্থতারই বহির্প্রকাশ হবে।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানের আহবান জানাচ্ছে জাতিসংঘ।কিন্তু এই আহবান কতটা যৌক্তিক।তবে কি জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে মিয়ানমারের সরকারকে নিবৃত্ত করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা রাখেনা? আর এদেশের অনেকেই কেবল মুসলমান বলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের পক্ষে কথা বলছে। আক্রান্তরা হিন্দু অথবা খ্রিষ্টান হলে তারা নিশ্চয়ই এই ভূমিকায় থাকতো না।
জাতিসংঘও ভারত চীন বাদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়দানের কথাও বলছে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বলেই। সুতরাং যদি বলি জাতিসংঘের এই আহ্বানের মূলেও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী, সেটা কি অযৌক্তিক হবে? মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান তথা সকল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাই পরিত্যাজ্য।সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কারও পক্ষ বিপক্ষ নেয়া খুবই অযৌক্তিক ও অজ্ঞতাপ্রসূত। মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়াবে এমন ভাবনাই মানবিক ভাবনা।
রোহিঙ্গা মুসলমানদের মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছে মিয়ানমারের সরকার। তাদের উদ্দেশ্য মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা মুক্ত করা। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান তাদের এই উদ্দেশ্যকেই সহায়তা করবে। এরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়বে। তখন টার্গেট হবে সকলকে অত্যাচার করে বাংলাদেশে পালাতে বাধ্য করা। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে একবার আশ্রয় নিলে তাদের আর মিয়ানমারে ফেরার কোনই সম্ভাবনা থাকছেনা। এক্ষেত্রে যারা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশী শরনার্থীদের ভারতে আশ্রয়দানের প্রসঙ্গ টেনে আনছেন তা ও রোহিঙ্গা ইস্যুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন নয়।
রোহিঙ্গারা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কোন যুদ্ধ করছে না যে তারা দেশ স্বাধীন হলে দেশে ফিরে যাবে। এমন অবস্থায় সকল রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে জায়গা দিয়ে তাদের মৌলিক চাহিদা মিটিয়ে মানবিকভাবে চলার সুবিধা করে দেয়া কি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব। নিছক মুসলমান এই আবেগে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলে পরে অমানবিকতার অভিযোগে এদেশকেই যে অভিযুক্ত হতে হবে এটা সুস্পষ্ট। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানবিক ভরনপোষন কোনো অবস্থায়েই সম্ভব হবে না।তখন রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়বে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা জড়িয়েও পড়েছে। তারা বাংলাদেশী পাসপোর্টে বিদেশে গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে বাংলাদেশকে বিব্রত করছে। 
ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসাতেও বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে জঙ্গীবাদ সম্পৃক্ততাও। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক হুজুগ তোলে জঙ্গীবাদের নীতি নির্ধারকরা তাদের উস্কে দেয় জঙ্গীবাদের দিকে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী নতুন করে সংযোজন হলে রোহিঙ্গা বস্তিগুলো হবে তখন জঙ্গিবাদের অভয়ারন্য। যারা বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব প্রমানে এখানে ঘাঁটি করতে স্বপ্ন দেখছেন। তখন তাদের স্বপ্ন বাস্তবের মুখ দেখবে। রোহিঙ্গা ইস্যূতে কোন সুদূর প্রসারী দূরভিসন্ধি রয়েছে কিনা সেটাও ভাববার। মুসলিম বিশ্ব ও ওআইসিও এ ইস্যূতে নিরব কেন? আইনী প্রক্রিয়ায় যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি দিলে যারা সেখানেও অমানবিকতা দেখেন। মানবাধিকার লংঘন দেখেন। এই হাজার হাজার নিরিহ নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যায় নিরব কেন। তবে কি রোহিঙ্গারা মুসলিম বলে আন্তর্জাতিক খ্রিষ্টান নেতারা নিরব?
তাদের মাঝেও সাম্প্রদায়িকতা? সমাজতান্ত্রিক দাবীদার চীন বৌদ্ধ বলে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মায়ানমারের নির্যাতক সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল? আসলে পৃথিবীর দেশে দেশেই সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধান মন্ত্রী হয়ে গেলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন। ক্ষমতা দখল ও রাজনৈতিক ইস্যূতে সাম্প্রদায়িক টোপটা ইদানিং খুব বেশি বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামকে দিয়ে ১৪ দল সরকারকে ফেলে দেয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরাগ ভাজন হওয়ার ভয়ে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বিলুপ্ত করে বাহাত্তরের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠাও সম্ভব হয়নি।
রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর বর্বর নির্যাতন সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারনারই কুফল। সাম্প্রদায়িকতার জবাব সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে দেয়াও কাম্য নয়। ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত। নির্যাতন বন্ধ না করলে আন্তর্জাতিক ভাবে মিয়ানমারকে একঘরে করা উচিত। প্রয়োজনে এই নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠীর উপর হামলা করা হোক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে জাতিসংঘের মাধ্যমে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরন করা হোক। সাগরে ভাসমান রোহিঙ্গাদের কান্না অভিশাপ দেবে গোটা বিশ্বকে।
তাই সিদ্ধান্ত গ্রহনে দীর্ঘসূত্রীতা নয় ত্বরিত উদ্যোগ চাই।এই সমস্যা সমাধানে বাস্তবতার আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন বাঞ্ছনীয়। বিশেষ কোন দেশকে আশ্রয়দান করতে বলার নামে গোঁজামিল তত্ত্ব পরিহারের আহবান জানাই। কারণ এই গোঁজামিল ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








