নিধাস ট্রফির ফাইনাল হেরে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে দেশে ফিরেছিল বাংলাদেশ দল। বিমানবন্দরে ক্রিকেটারদের চেহারায় মূর্ত হয়েছিল গগনবিদারী আক্ষেপ। দেরাদুন থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে হোয়াইটওয়াশ হয়ে ফেরা সাকিব-তামিমরা সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে একরকম মুখ লুকিয়েই বিমানবন্দর ছেড়েছিলেন। দুই মাসের ব্যবধানে সেই বাংলাদেশ দল ফ্লোরিডা থেকে ফিরলো হাসিমুখে। খেলোয়াড়দের চোখেমুখে মার্কিন মুলুক জয়ের আনন্দ। সাফল্য কীভাবে পাল্টে দেয় একটা দলের শারীরিক ভাষা, সেই বার্তাই যেন ছড়িয়ে পড়ছিল বিমানবন্দরের আকাশে-বাতাসে!
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশের হেড কোচ স্টিভ রোডস সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা, রেকর্ডারের সামনে আসলেন লিটন দাসকে সঙ্গে নিয়ে। কথা বলার জন্য অদূরেই তখন অপেক্ষমাণ সাকিব আল হাসান। এমন দৃশ্য আগে কখনো খুব একটা দেখিনি বিমানবন্দরের ভিআইপি গেটে।
যে সাকিব সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে যেতে চান সবসময়; সেই কিনা দেড় মাসের লম্বা সফর, ২৪ ঘণ্টা বিমানভ্রমণের ধকল উপেক্ষা করে সারলেন সব আনুষ্ঠানিকতা। ওয়ানডের পর টি-টুয়েন্টি সিরিজ জেতায় দলের আত্মবিশ্বাস কতটা উঁচুতে সেটি নিয়ে বললেন। আঙুলের চোট নিয়ে লুকোছাপা না করে সোজা জানিয়ে দিলেন সার্জারি করাতে হবে এবং সেটি যত দ্রুত সম্ভবপর হয়। আনফিট হয়ে খেলতে চান না।
দলে জুনিয়র ক্রিকেটারদের অবদান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ঢাল হন সাকিব। বলেন, ‘দেখুন, আপনারা যাদের নাম (সিনিয়র ক্রিকেটার) বললেন, তারা ব্যাট করে উপরের দিকে। ব্যাট করার সুযোগটা আমরা বেশি পাই, স্বাভাবিকভাবে অবদান রাখার সুযোগ আমাদেরই থাকবে এবং আমাদেরই করা উচিত। সে কারণে আমাদের কন্ট্রিবিউশনের পারসেন্টেজ বেশি হয়।’
একটি ব্যাপার শুধু এড়িয়ে গেছেন সাকিব। টিম হোটেলে ফেরার সময় প্রবাসীভক্তের সঙ্গে বাজে আচরণ কেন করেছিলেন, সে প্রশ্নে নীরব থেকেছেন। যদিও সাকিব নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে অমন আচরণের কারণ ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন দেশে আসার আগেই।

একবার চিন্তা করুণ তো বাংলাদেশ দল যদি সাফল্য সঙ্গী করে না ফিরতো বিমানবন্দরে সকালের পরিবেশ কতটা গুমোট থাকতো। তখন হয়তো সাকিবকে কিছু একটা বলতেই হতো। দল খারাপ করলে সাকিব হয়তো আগের মতোই সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে যেতেন। সুযোগই দিতেন না জেনেবুঝে নিজেকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার।
অধিনায়কত্ব ফিরে পাওয়ার পর টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটে সাফল্যের দেখা পাচ্ছিলেন না। সেভাবে নিজেকে মেলেও ধরতে পারছিলেন না দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বসেরার অলরাউন্ডারের তকমা নিয়ে চলা সাকিব। চলছিল নানা সমালোচনা। দুটি প্রত্যাশাই পূরণ হয়েছে উইন্ডিজের বিপক্ষে। দল জিতেছে সাকিবের অলরাউন্ড নৈপুণ্যেই। হয়েছেন সিরিজসেরা। তরুণ ক্রিকেটাররা অবদান রাখতে পারছিলেন না সিনিয়রদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সেই আক্ষেপও মিলিয়ে গেছে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে লিটন দাসের বিস্ফোরক ইনিংসের পর। রঙিন পোশাকে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সাফল্য বদলে দিয়েছে দলের আবহ। সাফল্য-ব্যর্থতা যে দুই মেরুর বাসিন্দা সেই বাস্তবতাই যেন মঞ্চস্থ হলো বিমানবন্দরে।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থা থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। টি-টুয়েন্টিতে পাঁচ ম্যাচ হারের পর টানা দুই জয়। তাতেই সিরিজ বাংলাদেশের পাল্লায়। তার আগে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার অসাধারণ নেতৃত্বে ওয়ানডে সিরিজ জয়ে ক্রিকেটাররা পেয়েছিল আত্মবিশ্বাস। সেন্ট কিটসে টি-টুয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচে তার প্রতিফলন অবশ্য দেখা যায়নি। হেরে ফ্লোরিডায় পা রাখা বাংলাদেশ মাঠের লড়াইয়ে নামতেই দেখা মেলে ভিন্নরূপ। দাপুটে পারফরম্যান্সে ক্যারিবীয়দের ওয়ানডের মতোই ২-১ ব্যবধানে টি-টুয়েন্টি সিরিজে হারিয়ে দেয় টিম টাইগার্স।
টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটে হতাশার রাজ্যে ঘুরপাক খাওয়া বাংলাদেশ দলের জয়ের ধারা লেখা হয় ফ্লোরিডার লডারহিল থেকে। জ্যামাইকা, অ্যান্টিগায় টেস্টের বাজে পারফরম্যান্স ব্র্যাকেটবন্দী করলে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে সফল সফর শেষ করেই ফিরেছে বাংলাদেশ দল। রঙিন পোশাক আর সাদা বলের ক্রিকেটে বাংলাদেশ যে সবখানেই কঠিন প্রতিপক্ষ সেটি প্রমাণ হয়েছে এবারের সফরে। বিদেশবিভুঁইয়ে এমন পারফরম্যান্সের পর স্বস্তি ফিরেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে। সাকিব মনে করেন ‘সফল সফর’ ছিল বাংলাদেশের। তার যুক্তি তিনটা সিরিজের মধ্যে দুটিই জিতেছে বাংলাদেশ।

ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সাকিবকে দেখা গিয়েছিল প্রত্যাশিতরুপে। যেমন ব্যাটিং, তেমন বোলিং আর অধিনায়কত্ব। এবারের সফরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তো এটিই। সাকিব চাইলে প্রতিপক্ষকে দুমড়েমুচড়ে দিতে পারেন সেটি তো কারও অজানা নয়। মাশরাফী প্রায়ই একটি কথা বলেন, সাকিব চলে মুডের উপর। মন থেকে ইচ্ছা পোষণ করলে ও ভালো পারফরম্যান্স করবেই।
বিতর্ক এড়িয়ে, ক্রিকেটে আরো বেশি মনোনিবেশ করে বাংলাদেশকে নিয়ে যাবেন আরেকটি ধাপে সেটিই প্রত্যাশা করেন সবাই। মাঠে ‘অলরাউন্ডার’ সাকিব জাগলে বাংলাদেশকে হারানো খুবই কঠিন, এটা বিশ্বাস করেন সবাই। এজন্যই এত প্রত্যাশা, এত ভালোবাসা, এত আবদার!







