এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর দুই তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই কিশোর কিশোরী ও তরুণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ এই কর্মক্ষম ও তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্যের কারণে সুবিধা পাওয়ার সর্বোচ্চ সময়ে রয়েছে।
২০৪০ সাল পর্যন্ত তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কর্ম উদ্যোম চিন্তাশীলতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির শিখরে পৌঁছানোর অপার সম্ভবনা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন নীতিনির্ধারকরা। তবে এর জন্য অপরিহার্য হলো: তরুণদের মেধা মনন ও সৃজনশীল চিন্তাকে কাজে লাগানো। নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে তরুণেরা যেভাবে যে কোন পরিস্থিতিতে দ্রুত গ্রহণ করে সেই মেধা কাজে লাগিয়ে কর্মপরিবেশ ও কাজ করার জন্য সুযোগ করে দিয়ে বিপুল সংখ্যক তরুণদের জনশক্তিতে পরিণত করা।
তবে হালের বাস্তবতা হলো: কথায় কথায় আন্দোলন-সংগ্রামে মুখর হচ্ছে শিক্ষার্থী-তরুণেরা। এ’কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাঘাত ঘটছে তাদের শিক্ষা অর্জনে। এতে কি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতির লভ্যাংশের লাভের ফসল তুলতে পারবে বাংলাদেশ? কয়েক বছরের বাস্তবায়তায় ঘুরে ফিরে আসছে এই প্রশ্ন!
এখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন হতে পারে ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ কী? যে দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা বেশি, এই বিপুল মানুষের সম্মিলিত কর্মের হাতই দেশের উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি। তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও শ্রমের সম্মিলিত প্রয়াসে সেই দেশে উন্নয়নের গতি হয় নির্বিঘ্ন ও ঊর্ধ্বমুখী।
এখন প্রশ্ন হলো: আমাদের এদেশের তরুণদের কর্ম ও মেধার বাস্তব স্বরুপ কী? বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যার আধ্যিকের উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যার বিচারে এই তারুণের কতটা সরব। আরো সোজা করে বললে, তরুণেরা তাদের মেধা ও শ্রম কোথায় কিভাবে কাজে লাগাচ্ছে? নাকি ফেসবুক কেন্দ্রীক উপস্থিতি, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মানে ভিডিও গেইম আর সোস্যাল মিডিয়াতেই সরব। উচ্চতর শিক্ষার পর তরুণেরা দক্ষতায় যথাযথ প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ পাচ্ছে কি সেটাই একটি পরিস্থিতি বিবেচনার বিবেচ্য? হালের বাস্তবতা অবশ্য অতীতের প্রথাগত সীমাবদ্ধতা বেকারত্ব কাজের ও দক্ষত উন্নয়য়ের সুযোগ না পাওয়ার বাইরে নয়া আরেক সমস্যার স্বরুপ নিয়ে হাজির হয়েছে। সেদিকে আসুন আলোকপাত করে বিষয়টির গভীরের বিশ্লেষণ করি। এর জন্য হালের একটি পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিতে হবে।
চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা ভারী বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় আবারো সরব হয়েছে। মাঠে গড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় রাস্তায় নামা সমাজ বা রাষ্ট্রকে কী বার্তা দিচ্ছে?

এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ২০২৬ সালে ৯টি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণীতে এইচএসসি ও সমমানে সেই মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের নিয়মিত রেজিষ্ট্রেশন করা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরবর্তীতে চূড়ান্ত পরীক্ষা দিচ্ছে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে ফর্ম পূরন করছে না। যা হতাশা জনক। নিয়মিত উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হয়েও চূড়ান্ত পরীক্ষা অংশ নেওয়ার না পেছনের নতুন কী কী কারণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছে।
যদিও চারপাশের চোখে দেখা ও শোনা বাস্তবতায় যেটা দেখা ও শোনা যাচ্ছে তা আশাবাঞ্জক না। ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্য কিশোর তরুণ অভিভাবকের আয়ত্বের বাইরে । বখে গেছে বিপুল সংখ্যক তরুণ যারা অভিভাবকের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়েছে। তবে সেই সত্যটা পরিবারে পরিবারে ভোগান্তির মাধ্যমে র্দমমান হলেও তা স্বীকার করে সেই সমস্যার স্বরুপ উন্মোচিত হচ্ছে না। বরং ঘরে-ঘরে পরিবারে পরিবারে যার যা গেছে সেই শোকের দায় একাকী অভিভাবকেরাই বহন করছেন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্র বিপুল সংখ্যক তরুণের শিক্ষা-বিরতির পিছনের কারণ অনুসন্ধান করছেন না। এই তরুণও একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হলো কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসলো না তারা কে কোথায় কী করছে? সেই হিসেব কেউ করছেন? কার কাছে পাওয়া যাবে বলুন তো? যদিও নানান গল্পে বাস্তবতায় ঘরে ঘরে শিক্ষার্থী-সন্তানদের আগ্রাসী মনোভাব তাদের উন্নাসিকায় বাবা মা ও স্বজনেরা ভুগছেন। সেই নজির পারিবারিক, সামাজিক নানান সংকটে ভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
‘জুলাই আন্দোলন ২০২৪’ পরবর্তী এদেশের বিপুল সংখ্যক কিশোর তরুণদের মনস্তত্ত্বে যে পরিবর্তন ঘটে গেছে সেটাও এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়। এর বিরুপ প্রভাব পড়ছে এদেশের রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও পরিবারে পরিবারে। তবে এখন ঘরে ঘরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিঃশব্দের কান্না এখনো অভিভাবকেরা ছাড়া আর কেউ মানে দল-মত, নির্বিশেষে রাজনীতিবিদ এমনকি নীতি নির্ধারকেরা আমলে নিচ্ছেন না। এটা একটি ভয়ানক সত্য নির্মম বাস্তবতাও বটে।
কিশোরদের আন্দোলনে সুফল হিসেবেই তাহাদের ক্ষমতার মসনদে আরোহনের আবেগ প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক মঞ্চ থেকে এদেশের সভা সমাবেশে আলোচনায়। অথচ বিপ্লব পরবর্তী সময়ে খুবই প্রত্যাশিত ছিল যে, শিশু কিশোর তরুণেরা এবার যার যার পড়ার টেবিলে ফিরবে। ফিরে যাবে শ্রেণীকক্ষে, তবে সেটা ঘটেনি। যেটা ঘটেছিল প্রতিবেশী নেপালে। বিপ্লব পরবর্তী দেশটির রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে প্রথম দফায় সেদেশের সরকার শিক্ষার্থী-তরুণদের ধন্যবাদ জানিয়ে আহ্বান করেছে নিজ নিজ কাজে গন্তব্যে পাঠ্য ও শ্রেণীকক্ষে ফেরা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটেছে পুরো উল্টো ও ব্যতিক্রম। ফলে বিপুল সংখ্যক তরুণ দীর্ঘ সময়েও ঘরে অভিভাবকের প্রিয় সান্নিধ্যে ফেরেনি।
রাষ্ট্র হয়ত ভুলেই গেছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কারও সন্তান। তাদের ঘিরে লাখো অভিভাবক ভবিষ্যতের স্বপ্ন গেঁথেছেন। অভিভাবকদের আশা ভরসার রঙ্গিন স্বপ্ন পূরণে এক একেক জন শিক্ষার্থী এক একেক জন দেখেন সেই স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে। আন্দোলন পরবর্তী সময়ে পাবলিক পরীক্ষা গুলোতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার নতুন নতুন বিষয় সমানে আসছে। যা এদেশের অর্থনীতিতে অপার হাতছানি দেওয়া বহুল আলোচিত ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট’র সুযোগ সাফল্য কাজে লাগিয়ে এর সুফল ঘরে তোলার বিষয়টিকে অনিশ্চিত করেছে। ‘জনমিতিক লভাংশ্য’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট’র এর বাস্তবায়নে নয়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

এই বাস্তবতায় যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক-গবেষক রবিউল ইসলামের কাছে প্রশ্ন ছিল: ২৪ এর ছাত্র আন্দোলন: এদেশের তারুণ্যের ভবিষ্যত কী? কথায় কথায় আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে নামা এই তরুণ জনগোষ্টী জনমিতিক লভাংশ্য বা ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্টের লাভের ফসল রাষ্ট্র বাংলাদেশ তুলতে পারবে কি?
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার এই শিক্ষক ও গবেষক রবিউল ইসলাম বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষার্থী-অভিভাবক সম্পর্ক এমনকি শিক্ষার্থীদের সামাজিক পরিসরে অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রেও বেশ অসংগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থী-ছাত্ররা প্রতিবাদে মুখর ছিল, দৃঢ় ভূমিকাও রেখেছে।
কিন্তু জুলাই পরবর্তী শিক্ষার্থীদের অনেকের ভেতর র্যাশানেলিটির রেশিও কম দেখা যাচ্ছে। অযৌক্তিকতা ও উগ্রতার প্রাবল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা সমাজের চিরায়ত মূল্যবোধগুলোকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলেছে। এমনকি তাদের স্মৃতিশক্তি বেশ দুর্বল বলে মনে হচ্ছে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এখনও সময় আছে বিষয়টি আমলে নিয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের শক্তি ও সম্ভাবনা ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







