বাল্য বিবাহ ন্যায্য কিনা এই বিষয়ে একটি টিভি প্রোগ্রামে আলোচনা হলে আমি মনে করি সেখানে থাক আমার উচিত হবে না। এটি সামাজিক পরিবর্তন আনয়নের জন্য ওয়াটারবোর্ডিং, অঙ্গচ্ছেদ অথবা শিরোচ্ছেদ করা একটি জোড়ালো পদ্ধতি কিনা সে বিষয়ে আলোচনার মতোই।
সেখানে কোনধরনের আলোচনা হতে পারে না যখন একপক্ষ কোন অতিরঞ্জিত অজুহাত বা বিশ্বাসের দ্বারা কোন প্রকার সহিংসতাকে ন্যায্যতাদান করে; বাল্যবিবাহ এক প্রকার সহিংসতা।
টকশো গুলোতে অভাবিতভাবে তারা যা করছে এতে করে বিষয়গুলো খুব দ্রুতই আরো খারাপ দিকে মোড় নিচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি একজন পুরুষ, পাকিস্তানি চলচ্চিত্র অভিনেতা মিরাকে আলোচনায় নিয়ে এসে বললেন তিনি এমন দেশ চাননা যেখানে মিরার মতো নারীরা নৈতিকতার মানদন্ডকে সংজ্ঞায়িত করে।
রাজনৈতিক দলের একজন কোন একটি বিষয়ে আলোচনাকালে বিনোদন জগতের একজন নারী সম্পর্কে যত দ্রুততার সাথে মানহানিকর বক্তব্য দেয় তা পাকিস্তানের বিবাহ অনুষ্ঠানগুলোতে খাদ্যের সরবরাহের ঘোষণা এবং তার কয়েক নেনোসেকেন্ড পরেই কোরমা ও বিরিয়ানির ট্রের উপর হামলে পরার সময়ের ব্যবধানকে খুব সহজেই পরাভূত করে।
এটা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ক্রমবর্ধিষ্ণু ঘটনা। সম্প্রতি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (সিপিআই) একজন নেতার মুখে এমনই একটা বক্তব্য প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যিনি একজন বলিউড অভিনেত্রী সানি লিওনকে দোষারোপ করেছেন এবং ভারতে ধর্ষণের হার বৃদ্ধির জন্য তার (সানি লিওনের) নতুন জন্মবিরতিকরণ বিজ্ঞাপনকে দায়ী করেছেন।
এটা একধরণের ভোগবাদীতা, এক প্রকার প্রশ্রয়, যার প্রতিক্রিয়ায় সবজায়গায় নারীদের অবস্থান আরও শোচনীয় হয়ে যাচ্ছে।
যেই দেশ অতিমাত্রায় জনসংখ্যাধিক্য এবং লাখ লাখ লোক দরিদ্রসীমার নিচে বসবাসের সমস্যায় জর্জরিত, সেই দেশে কনডমের একটি বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করাই রাজনৈতিক নেতার লক্ষ্য হতে পারে না। আতুল কুমার অঞ্জনের লক্ষ্যবস্তু হলো সানি লিওন। চলুন তার এই প্রবণতার কারণটি ব্যাখ্যা করি।
যেসব নারী তার যৌনতার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে, তারা পুরুষদের জন্য আতঙ্ক। যেই পুরুষেরা সমাজকে সাধারণভাবে গঠন প্রক্রিয়াকে পরিচালনা নিজের দায়িত্ব হিসেবে পরিগনিত করে। যেখানে পুরুষরা নির্দেশ দেয় এবং নারীদের কোন অংশগ্রহণ ছাড়াই রাজনৈতিক এবং পারিবারিক সীমা নির্ধারণে সীদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
যৌনতার বিষয়ে স্বাধীন একজন নারী বিষমকামী পুরুষদের দূর্বলতার প্রতিক- এটা মিথ্যা পৌরুষ, পুরষত্ব এবং সর্বোপরি ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করে। তার (পুরুষের) অদ্বিতীয় ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা, তার রাজত্ব তার (সানি লিওনের) দৃষ্টির সামনে ভঙ্গুর হয়ে যায়। এটা রাষ্ট্রের ধারণা এবং এর সামাজিক নির্দেশনার প্রতি হুমকি হয়ে দাড়ায়।
নারীর যৌনতার ধারণার উপর একটি প্রবঞ্চণাকর আক্রমণের তাৎপর্য বহন করে ধর্ষণ; বলতে গেলে একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা। শতবছর ধরে শত্রুতা, যুদ্ধ, বিতর্ক এবং ছোট ছোট ক্ষোভের প্রশমনের জন্য পুরুষদের ব্যবহৃত এটি একটি কার্যকরী কৌশল।
হাস্যকর বিবেচিত না হলেও এটা বলা একটি অপরাধ যে সানি লিওনের বিজ্ঞাপন প্রচারের ফলে যতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে তার কোন বিচার হয়নি। এটা দুর্ঘটনার জন্য চালককে দায়ী না করে ইঞ্জিনকে দায়ী করার মতো।
নারীদের প্রতি এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। একজন নারীকে আলাদা করার চেষ্টা, সে মিরা অথবা সানি লিওন যেই হোক, এই প্রবণতাটিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
এটা নারীদের সীদ্ধান্ত নেয়ার একটি মূল বিষয় যা আক্রমণের শিকার হচ্ছে, আজ এটি যৌনতা এবং কাল যৌনতার আবরণে আক্রমণের শিকার হতে পারে বাল্য বিবাহ, ডিভোর্স, উত্তরাধিকার, শিক্ষা এবং সক্রিয়তা।
শোষণ যে নামেই হোক তা শোষণ। যা নমনীয় লক্ষ্যকে আঘাত করতে প্রলুব্ধ হয় এটা মাপা যায় না তা শুধুই অপমানজনক।
দিল্লিতে বাসে ধষর্ণের সেই ভয়ানক ঘটনাটি এখনোও মানুষ বিস্মৃত হয়নি। গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকার জন্য আক্রান্ত মেয়েটিকেই দোষারোপ করার দক্ষিণ এশিয়ার সমাজগুলোতে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক আচরণও আমরা ভুলে যায়নি।
কেউ হয়তো ভেবেছিলো ধর্ষণের সেই পাশবিকতা রাজনৈতিক নেতাদের নির্ধারণ করে দেয়া চিন্তার দ্বারা সমাজের বিকৃত পুরুষতান্ত্রিকতাকে দূর না করলেও কিছুটা হলেও নাড়া দিবে।
নারীদের দ্বারা অনুভূতি এবং অবিরাম তাড়না পুরুষদের ধর্ষণের মতো অপরাধকে কখনোই ন্যায্যতা প্রমাণ করতে পারে না। কখনোই না।
এই ধারণাটি দক্ষিণ এশিয়ার অনেকের কাছেই গহণ করাটা কঠিন। কিন্তু আমরা ধর্ষণ সংস্কৃতিটিকে আরও বিস্তৃত এবং অপরাধীকে দোষারোপ করার বদলে আক্রান্তকে দায়ী করে অপরাধটিতে মর্যাদা আরোপের প্রবণতা থেকে রাজনৈতিক নেতাদের নিবৃত করার কাজটি শুরু করতে পারি। এবং এটাই আমাদের করা উচিত।
এই কাজটি হবে বেপোরোয়া বিবৃতি দ্বারা নারীদের প্রতি অমানবিক আচরণকে তুচ্ছ করে তোলার বিরুদ্ধে একটি সামান্য কাজ।
প্রতি মেয়েকে অবনমিত হওয়ার শিক্ষা দেয়া হয়, পর্দার আড়ালে থাকার শিক্ষা দেয়া হয়, উত্তক্তকারীদের উপেক্ষা এবং পুরুষেদের আচরণ সম্পর্কে সচেতন করা হয় যে আসলেই একজন প্রকৃত পুরুষ।
এটাই সময় পুরুষদের কাছে শুধুই নির্ভরশীল হওয়ার চেয়ে আরও ভালো কিছুর প্রত্যাশা করা। চলুন আমরা এমন কিছু দাবি করি যাতে নারীরা আরও মার্যাদার স্থান লাভ করতে পারে।
(পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘ডন’-এ প্রকাশিত আয়শা সারওয়ারীর মন্তব্য প্রতিবেদন থেকে অনুবাদ করেছেন সাবিত খান)







