রোববার মেঘ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো। আমাদের কান্না, অবিচারের আরেক নাম মেঘ। প্রিয় সাগর-রুনির মেঘ। একাত্তর টিভির প্রিয় ফারজানা রূপাকে অনুরোধ করেছিলাম, স্কুল শেষে মেঘকে যাতে আমার কাছে নিয়ে আসেন। আমরা সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাবো। এখন মেঘের মা এই রূপা। মেঘ আর তার মেয়ে মনফুলের মা।
গুলশান এলাকার স্কুল শেষে দীর্ঘ যানজট পেরিয়ে আমার ধানমণ্ডির ডেরায় যখন রূপা পৌঁছুতে পারলেন, মেঘসহ আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। চৈত্রের গরমে কাবু। তাদের সঙ্গে আসেন আমাদের সবার প্রিয় শাকিল আহমেদ। মেঘ-মনফুল দু’জনের পরনে খাকি রঙের স্কুল ড্রেস। আমি মেঘকে দেখি। কান্না চেপে রাখি।
আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম মেঘের সামনে সাগর-রুনির প্রসঙ্গ তুলবো না। আমার আশপাশের সবাইকে একইভাবে সতর্ক করে রেখেছিলাম। সবাইকে দিব্যি করে বলছি, সত্যি আমরা আমাদের শপথ রেখেছি। একবারও কিন্তু সাগর-রুনির নাম মুখে আনিনি! কে সাগর, কে রুনি তা যেনো আমরা চিনি-জানিই না! তারা তো খুন হয়নি বা মারাই যায়নি যে তাদের হত্যার বিচার হবে! কতো কপট-ভণ্ড আমরা একেকজন! সাগর-রুনির বন্ধু, ভক্ত, বড় ভাই বলে সারাদিন আমরা গলা ফাটাই! কয়েকদিন পরপর বক্তৃতাবাজি করি! লজ্জা-শরমও নেই আমাদের!
আমি মেঘকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি। আমি তার মাঝে পাই আমার সাগরের স্পর্শ। কতো দিনরাত্রি আমরা
একসঙ্গে কাটিয়েছি! পার্বত্য চট্টগ্রামসহ নানা অ্যাসাইনমেন্টে। কতো জুনিয়র বন্ধু আমার। কিন্তু কতো আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো আমাদের। সাগরের সারা পিঠ জুড়ে তিলের মতো কালো কালো দাগ ছিলো। এসব দাগ নিয়ে যে কতো মজা করতাম তার সঙ্গে।
সাগর জার্মানি থাকতে প্রায়ই ফোন করতেন আমার সিডনির বাসায়। প্রতিদিনের কতো কিছু যে শেয়ার করতেন। একবার রুনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন, বাবা-মায়ের বিয়ে দেখার বায়না ধরেছে মেঘ! সাগর আবার বর সাজবে। বউ সাজবে রুনি। তাদের আবার বিয়ের অনুষ্ঠান হবে! আমি সেখানে মন্তব্য করে বলি, মেঘ যখন চায় তখন তাই হোক। তবে এবার হানিমুনটা হোক অস্ট্রেলিয়ায়। রুনি মজা করে লিখেছিলেন, মেঘের বারী মামা যদি অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া-আসার টিকেট দেন তবে তাই হবে। এসব ভাবতে ভাবতে আমার কান্না পায়। কান্না চেপে যাই। চেপে রাখি।
মেঘরা এসেছিলো ধানমণ্ডিতে আমি যে বাসায় উঠেছি সেখানে। এটি আনন্দ-আরাফাতদের বাড়ি। এরা আমার বহু বছরের প্রিয়জন। এবার দেশে ফিরে আমি যাতে অন্য কোথাও না উঠি সে কারণে আগেভাগে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন আরাফাত। সেই সাতাশ মার্চ থেকে এটি আমার ডেরা। সঙ্গে সার্বক্ষনিক একটি
গাড়ি। প্রতিদিন যতো প্রিয়জন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাদের অভ্যর্থনা-আপ্যায়নের দিক সামলান এ বাসার গৃহলক্ষ্মী আনন্দ ভাবী।
মেঘকে কাছ থেকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিলো আনন্দ-আরাফাতেরও। এদের ঘরে তিন সপ্তাহ বয়সী একটি শিশু সন্তান। কিন্তু রূপা মেঘকে নিয়ে আসতে রাজি হয়েছেন শুনে আগের দিন থেকে রান্না শুরু করে দেন আনন্দ। সেই মেঘকে দেখে আমরা সবাই কষ্ট চেপে রাখি। চোখের সামনে খুন হয়ে যাওয়া, বাবা-মায়ের স্মৃতি ধারণ করা মেঘের কষ্ট কি আমরা অনুভব করতে পারি? মোটেই না। কারণ শিশু বয়সে আমাদের কারো বাবা-মা এভাবে চোখের সামনে খুন হননি! তারা যদি খুনই না হবেন তাদের হত্যার বিচার হবে কেনো? ‘বাচ্চারা তালিয়া বাজাও’।
তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও মেঘ?
-ক্রিকেটার।
ওয়াও। তুমি কী হতে চাও? ব্যাটসম্যান না বোলার?
-অলরাউন্ডার।
ওয়াও। বোলার হিসেবে কোন ভূমিকা তোমার পছন্দ? পেস না স্পিন?
-আমি ফাস্ট বোলার হতে চাই। ইয়র্কার মারতে আমার খুব পছন্দ।
মেঘের এসব কথাবার্তা তার সপ্রতিভ স্বত্ত্বার পরিচয় দেয়। আমি মেঘ-মনফুলের জন্যে কিছু কিনিনি। চিন্তা করে রেখেছিলাম তাদের পছন্দমতো কিছু কিনবো। খাবার টেবিলে বসে গল্পচ্ছলে মেঘকে জিজ্ঞেস করি, তোমাকে কী উপহার দিলে তুমি খুশি হবে? মেঘ জবাব দেয়, ক্রিকেট ব্যাট। মনফুল চাইলো পুতুল। খাবার শেষে আমরা মেঘ-মনফুলের উপহার কিনতে বেরোই। মেঘ এতোদিন চার নাম্বার ব্যাট ব্যবহার করতো। এবার নিলো এক সাইজ বড় পাঁচ নাম্বার ব্যাট। বেশ চওড়া।
এখন মেঘ এটি দিয়ে তার ভণ্ড মামা-চাচাকে না পেটালেই হয়!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







