নবম ওয়েজবোর্ড সম্পর্কিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য সভ্যতা-ভব্যতার সীমা লঙ্ঘন করেছে বলেও মত প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। সাংবাদিক নেতারা অর্থমন্ত্রীকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার জন্যও বলেছেন।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যগুলো যে সবটাই ঠিক তা যেমন সত্যি নয়, আবার তার কিছু কিছু বক্তব্যকে একেবারে ফেলে দেয়ার মত নয়। কেননা, প্রতিটি মানুষের বক্তব্যের নেতিবাচক দিক যেমন থাকে তেমনি ইতিবাচক দিকও থাকে। অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তারও কিছুটা ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিক রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি কর্মচারীদের চেয়ে বেতন বেশি হওয়ায় সাংবাদিকদের জন্য আর কোনো ওয়েজ বোর্ডের দরকারই নেই। তাদের বেতন প্রতিযোগিতামূলক ভাবে নির্ধারণ হবে। আর ভাল ১০ থেকে ১৫টা পত্রিকা ছাড়া বাকি প্রত্রিকা সরকার বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে।’
নতুন বেতন কাঠামোর দাবিতে সংবাদকর্মীদের আন্দোলনের মধ্যে বুধবার (৮ আগস্ট) সচিবালয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু পাশে থাকলেও সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের একাই উত্তর দেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রীর দাবি, ‘সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড আননেসেসারি, টোটালি আননেসেসারি। বিকজ ইয়োরস স্যালারি স্কেলস আর বেটার দ্যান গভর্নমেন্ট স্যালারি স্কেলস।’
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যটিকে অনেকের কাছে মনে হয়েছে, তিনি কাউকে শাসাচ্ছিলেন, ধমাকাচ্ছেন। যার প্রকাশ দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যমজুড়ে।
আমাদের জানামতে ওয়েজবোর্ড একমাত্র গঠন করা হয়েছে সংবাদপত্রের জন্য এর আওতায় টেলিভিশন চ্যানেল নয়। আর এটাই বাস্তবতা। কিন্তু অর্থমন্ত্রী এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তিনি তার জানাটাকেই সঠিক বলে চাপিয়ে দিচ্ছিলেন। সরকারি কর্মচারীদের মত বেতন কাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা রয়েছে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রীর এমন দাবি প্রকৃত পক্ষে সত্য নয়। কেননা, একজন সরকারি কর্মচারী নানাবিধ সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। সেসব সুযোগ সুবিধে সাংবাদিকরা কখনোই পান না। অনেক সংবাদপত্রে বহু মাস-বছর ধরে বেতন না হবার সমস্যাও আছে।
তবে এক অংশে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন সব পত্রিকা ওয়েজবোর্ড অনুসারে বেতন প্রদান করে না। তার এই কথার সাথে দ্বিমত পোষণ করার রাস্তা নেই। বাস্তব চিত্র হচ্ছে বাংলাদেশে যত সংখ্যক পত্রিকা আছে তার মধ্যে ঠিক কতটা ওয়েজবোর্ড অনুসারে বেতন প্রদান করে? এই বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার মত সক্ষমতা সংবাদকর্মীদেরও নেই। তাই বলে নবম ওয়েজবোর্ডের দরকার নেই? এটা অন্তত মেনে যায় না।
সাংবাদিকদের সর্বশেষ বেতন কাঠামো হয়েছিল ২০১২ সালে। এরপর সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ার পর সংবাদকর্মীদের আন্দোলনে নবম ওয়েজবোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব তাদের প্রতিনিধির নাম না দেওয়ায় বোর্ড গঠন করা যাচ্ছে না বলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে এটুকু অনুমেয় যে পত্রিকার কিছু মালিক চাচ্ছেন না নবম ওয়েজবোর্ড গঠন হোক। অর্থমন্ত্রী বক্তব্যে অনেকে সেই সুর খুঁজে পেয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে জানতে চান কতটি পত্রিকা আছে? এর উত্তরে সাংবাদিক নেতারা জানান ২০১টি। আর এই সংখ্যাটি জানার পরই ভীষণ চেঁচিয়ে উঠেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রাবিশ, ইটস মাই আনসার টু ইউ। রাবিশ। ২০১? এসব পত্রিকায় কোনো সাংবাদিক নেই। এসব পত্রিকা বিনা শুল্কে কাগজ তোলে, সরকারের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন নেয়। এসব পত্রিকার জন্য ওয়েজবোর্ড দেবো?’
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য অনেকটা সত্য হলেও এটা ঢালাওভাবে বলাটা মনে হয় ঠিক ছিল না। তবে ভেবে দেখা দরকার এসব পত্রিকা প্রকাশ হচ্ছে কীভাবে? কারা দিয়েছে এসব পত্রিকার ছাড়পত্র? আর সরকারইতো যাকে তাকে সংবাদপত্র প্রকাশনার অনুমোদন দিয়ে দিচ্ছে! যেভাবেই পত্রিকা প্রকাশের অনুমোদন হোক না কেনো, তা চালাতে অবশ্যই সাংবাদিক প্রয়োজন। আর সংবাদকর্মীরা বেতন চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। সেই থেকেই ওয়েজবোর্ডের প্রসঙ্গ এসেছে।
অর্থমন্ত্রীর দাবি, ‘সারা দেশে ভালো মানের পত্রিকা ১৫টি হবে কী না আমার সন্দেহ আছে। এই যে সারা দেশে দৈনিক পাঁচশ কতটা কী আছে খবরের কাগজ, অল বোগাস, ওদের জন্য বেতন স্কেল ঠিক করবো? নো, নট অ্যাটঅল। আই উয়িল ফিক্সড দি বেতন স্কেল ফর দিস ফিফটিন অর টুয়েন্টি নিউজ পেপারস, যেখানে মানুষজন কাজ করে এবং এগুলোতে কী স্যালারি স্কেল আছে আমাকে একটা দ্যান।’
পত্রিকা মালিকদের বেতন দেবার অবস্থা ও সরকার থেকে প্রাপ্ত সুবিধার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী এখানেও ঢালাও মন্তব্য করেছেন বলে মনে হয়েছে।
বাংলাদেশে যে ব্যাঙের ছাতার মত মিডিয়ার সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এসব পত্রিকাগুলোর সংখ্যা বিবেচনা করে যদি ওইসব পত্রিকায় গড়ে পাঁচজন করে সাংবাদিকও কাজ করেন বলে ধরা হয়, তবে এর সংখ্যা কত দাড়াবে? ওইসব সাংবাদিক কী ঠিকমত বেতন পাচ্ছে? সরকার কী এর দায় এড়াতে পারবে?
যে প্রক্রিয়া ও ধাপেই হোক, সাংবাদিকদের চলমান বেতন কাঠামো নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হবে সে প্রত্যাশা রাখছি। পাশাপাশি সারাদেশে যত পত্রিকা ও অনলাইন তৈরি হচ্ছে সেগুলোতে কাজ করা সাংবাদিকদের স্বার্থ দেখা উচিত। সার্বিক প্রেক্ষাপটে নিয়ম বহির্ভূত যেসব সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে বা যারা সাংবাদিকদের বেতনভাতা থেকে বঞ্চিত করছে, সেসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও উচিত।
যদিও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, যেসব বোগাস পত্রিকা আছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার অ্যাকশনে যাবে। আমিও মনে করি নিয়মের বাইরে এসে সাংবাদিকদের ঠকিয়ে যেসব পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে সেসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
সর্বপোরি কথা হচ্ছে, সব কিছুকেই নিয়মের মধ্যে আনা উচিত। অনিয়মতান্ত্রিক যা কিছু তাই সঙ্কট সৃষ্টির মূল হয় উঠে। এক্ষেত্রে সরকার, সংবাদপত্র মালিক ও সাংবাদিক নেতারা জোরালো ভূমিকা পালন করবে বলেই প্রত্যাশা করছি। একই সাথে নবম ওয়েজবোর্ড নিয়ে আগামী ১৭ আগস্ট সাংবাদিক নেতাদের সাথে অর্থমন্ত্রী ফের বসবেন। আশা করছি এই বৈঠকে বোর্ড গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত হবে।








