যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কাছে মঙ্গলবার সাইকেল চালানোর পথে ট্রাক তুলে হামলার ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ১১ জন আহত হন। এই হামলাটি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর নিউইয়র্কের অন্যতম বড় প্রাণঘাতী হামলা। এছাড়াও বেশ কিছু সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত হয়েছে যুুক্তরাষ্ট্র।
এমন সন্ত্রাসবাদের ভয় কিভাবে মোকাবিলা করছে তারা? নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তা ফেসবুকে জানিয়েছেন কলামিস্ট, রাজনীতি বিশ্লেষক শাফকাত রাব্বী অনীক।
তিনি ফেসবুকে লিখেছেন,
“9/11 এর প্লেন হামলার দিন ভোর ৫ টায় কম্পিউটার ল্যাবের কাজ শেষ করে এসে ঘুমাচ্ছিলাম। ঠিক ৮ঃ৩০ মিনিটে রুম মেটদের “বিচিত্র” হট্টগোলে ঘুম ভাঙ্গল। সাড়ে তিন ঘন্টার কাঁচা ঘুম। তখনও আমি টুইন টাওয়ারের মর্ম কি জানি না। দুইটা বিল্ডিং এ প্লেন আঘাত করলে যে পৃথিবী উল্টায় যাইতে পারে, সেইটা বুঝার উপায় তখনও কারো নাই।
কাঁচা ঘুম নিয়ে খানিকক্ষন টিভি দেখলাম। এক এক করে দুইটা বিল্ডিং পড়লো। সেই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় আমার একটা কঠিন ক্লাসের পরীক্ষা ছিল। মাথায় প্রথম চিন্তা আসলো যে পরীক্ষাটা হবে কিনা। না হলে খুব খুশী হতাম।
তখন আমাদের কারো গাড়ি নাই। আমরা দুই রুমমেট দুইটা বাই সাইকেল চালাই। ইউনিভার্সিটি অফ মায়ামিতে পড়তাম আমি তখন সেকন্ড ইয়ার শেষ করে কেবল থার্ড ইয়ারে। আমেরিকায় যাকে বলে জুনিয়র ইয়ার। আমার সাইকেল নিয়ে ইউনিভার্সিটির দিকে রওয়ানা হলাম।
ইউনিভার্সিটিতে একটা টি-এস-সি মার্কা জায়গা আছে, সেখানে গেলাম। যেয়েই একটা ধাক্কা খেলাম। দেখলাম হল রুমের মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি দিয়ে কিছু মেয়ে কান্নাকাটি করছে। সামনে একটা বড় টিভি। এমন কান্নার দৃশ্য আমেরিকায় বিরল। টিভিতে বিল্ডিং পড়তে দেখে যা বুঝি নাই, সেইটা মেয়েগুলোকে কাঁদতে দেখে বুঝতে পারলাম। বুঝলাম আসলেই বিশাল কিছু একটা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব মায়ামি অনেক বড়লোক ছেলেমেয়েদের স্কুল হিসেবে পরিচিত ছিল তখন। বড় লোকের বাচ্চারা মায়ামিতে পড়তে যেত মায়ামির আকর্শনে। বুঝতে পারলাম এই মেয়েগুলোর ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করা বাবারা মারা গেছে।
আমার মাথায় পরীক্ষা সংক্রান্ত চিন্তাটা শুধুই ঘুরপাক খাচ্ছে। পরীক্ষাটা পেছাবে কিনা?
এক পর্যায়ে স্কুলের প্রেসিডেন্ট ডনা শালালা আসলেন। তিনি মাত্র ক’ বছর আগে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন খুব সফল স্বাস্থ্য মন্ত্রী ছিলেন। ডনা শালালা মাটিতে লুটিয়ে থাকা মেয়েগুলোর কাছে গেলেন, আদর করলেন। তারপরে আমাদের উদ্দেশ্যে একটা ভাষণ দিলেন।
ভাষণের সারমর্ম হইলো, সন্ত্রাসীরা চায় আমাদের জীবন থামিয়ে দিতে। সুতরাং, আমরা যেন কোন ভাবেই কাজ কাম বন্ধ না করি। স্কুলে যেন ছড়িয়ে পড়ি, নরমাল কাজ কাম করি ইত্যাদি। অর্থাৎ পরীক্ষা দিতেই হবে।
১৭ বছর পড়ে গতকাল নিউ ইউর্কে আবার একটা সন্ত্রাসী হামলা হলো। একেবারে আমার সাবেক কর্মস্থলের রাস্তার কোনায়। যেখানে হামলাটা হয়েছে, ঠিক সেই কর্নারে দাঁড়ায় কলিগ ও বন্ধুদের সাথে গল্প গুজব করেছি অনেক।
সেই একই রাস্তার বেশ কাছেই প্রতি বছর হ্যালোইনের বিখ্যাত মিছিল হয়। হাজার হাজার ছেলে মেয়েরা ভূত সাজে। অনেক মেয়ের গায়ে কিছুই থাকে না পড়ার মতো। তার পরেও নিজেদেরকে তারা কেন ভূত ভাবে এটা নিয়ে এনালাইসিস করে অনেক মিনিট কাটিয়েছি সেই রাস্তায়।
গত কালকের সন্ত্রাসী হামলার ৩ ঘন্টা পড়েই ছিল হ্যালোইনের সেই বিখ্যাত প্যারেড। আমি ভেবেছিলাম প্যারেডটা হয়তো ক্যান্সেল হবে। হামলার এতো কাছে প্যারেডের জায়গাটা! ৮ জন মানুষ মৃত। এই অবস্থায় ভূতের মিছিল কিভাবে হয়?
কিন্তু না। আবার সেই একই থিউরি শুনলাম। নিউ ইয়র্কবাসী বলল, সন্ত্রাসীরা আমাদের থামায় দিতে চায়। থামা যাবে না। চলো হ্যালোইনের মিছিলে যাই। এটাই প্রতিবাদ।
এগুলো হলো মডার্ন সোসাইটির মডার্ন ফিলোসফি। এর পক্ষে বিপক্ষে মতামত থাকতে পারে। যেমন আমি হইলে প্যারেডটা থামায় দিতাম। কিন্তু আমেরিকার সাধারন পাবলিক ও লোকাল নেতারা ভিন্নভাবে চিন্তা করে।”








