একপাশে উত্তরা হাই স্কুল, অন্য পাশে মসজিদ; মাঝখানে উত্তরা ৭নং সেক্টর পার্ক। পার্কের পাশে ফুটপাথে পলিথিন বিছিয়ে বসে আছে তিন সদস্যের একটি পরিবার। মা আর দুটি ছেলে শিশু। বড় ছেলেটির বয়স ছয়/সাত আর ছোটটির বয়স তিন/চার বছর হবে। মহিলাটি অর্থাৎ মায়ের বয়স পঁচিশ/ছাব্বিশ হতে পারে। মা বাচ্চাদের প্রথম শ্রেণির বাংলা বই পড়াচ্ছে। দেখে ভালো লাগল। কাছে গেলাম। কথা বলে তাদের সম্পর্কে কিছুটা অবগত হলাম। বাচ্চা দুটির মধ্যে বড়টিকে কোলে আর ছোটটিকে গর্ভে রেখে তাদের বাবা উধাও বা নিখোঁজ। মহিলার দেবর ভাসুরেরা বা শিশুদের চাচারা তাদের এক বছর লালন-পালন করার পর ঢাকায় চলে যেতে পরামর্শ দেয়। মহিলা পঞ্চম শ্রেণি পাশ। উত্তরা ৬নং সেক্টরের একটি বস্তিতে ঘর ভাড়া করে থাকে। খেয়ে পরে তাদের দিন চলছে মন্দ নয়। তাদের সুন্দর জীবন-যাপনের কথা শুনে প্রশংসাসূচক উৎসাহ দিলাম। তাতে এরা আনন্দিত ও উৎসাহিত হয়েছে। সে কারণে আয়-উপার্জনের বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
আবার একদিন দেখলাম একইভাবে বসে আছে উত্তরা ৭নং সেক্টরের মসজিদের সামনে। দূর থেকে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করার পর বুঝতে পারলাম এরা ভিক্ষুক। এক সময় গ্রাম-গঞ্জে চাউল ভিক্ষা করার প্রচলন ছিল বাড়ি বাড়ি ঘুরে। আজকাল আর চাউল ভিক্ষুকরা এইটুকুর মধ্যে তৃপ্ত নয়। তাই অন্যান্য পেশাজীবীর মতো তারাও ঢাকায় অথবা অন্যান্য শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। কম পরিশ্রমে অধিক ভিক্ষা উপার্জন করে তারাও জীবন যাত্রার মান উন্নত করতে চায়।
পাঠ্য বই-এ আমরা পড়েছি, কবির লেখা- ‘নবীর শিক্ষা: তিন দিন হতে খাইতে না পাই, নাহি কিছু মোর ঘরে…নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা মেহনত করে সবে।’
কিন্তু ভিক্ষা দিতে বা অন্যান্যভাবে দান খয়রাত করতে মানুষ পছন্দ করে, প্রশান্তি লাভ করে এক পয়সা দান করলে সত্তর নেকীর সওয়াব পাওয়ার আশায়ও অনেকে দান করে থাকেন। সুদ-ঘুষের ক্ষেত্রে যেমন দাতা আর গ্রহীতা সমান অপরাধী তেমনি ভিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রেও উভয়কেই সমান অপরাধী বলে গণ্য করা উচিত। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে, ভাই ভায়ের পাশে দাঁড়াবে এমনটাই স্বাভাবিক। তবে গ্রহীতা অবশ্যই যদি কাজে অক্ষম হয়। দরিদ্র বৃদ্ধ, আর্ত, পীড়িত, কাজে অক্ষম লোকজনের জন্য একটা দান তহবিল থাকা উচিত। যা দয়া-দক্ষিণা নয়। বরং হওয়া উচিত কর্তব্য আর অধিকার।

এ ক্ষেত্রে সরকারি সুব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন। আমাদের এই উন্নয়নশীল দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ধাপে ধাপে। কিন্তু জাতির এক বিশাল জনগোষ্ঠী ভিক্ষাবৃত্তির মতো ঘৃণ্য পেশার সাথে জড়িত। যা সরকার কিংবা সুধীজনদের দৃষ্টি সীমার মধ্যেই নেই। যে দেশে ডিজিটাল রাস্তা তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে সেই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে, অফিস-আদালতের সামনে, পার্কে, মসজিদের সামনে, রাস্তাঘাটে সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভিক্ষুক।
পৃথিবীতে কোন মানুষই ভিক্ষুক হয়ে জন্ম নেয় না। বেকার ঋণগ্রস্ত, বা যে কোন ধরনের অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। মানুষ জন্ম নেয় নির্মল আলো-বাতাসপূর্ণ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মধ্যে। চারপাশের সবকিছু অবলোকন করে শিশু বেড়ে উঠে। তারপর শিক্ষা অর্জন করে মানুষ পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়।
আবার, অনেক সময় অনুকূল পরিবেশ আর সৎ-সঙ্গের অভাবে মানুষ পরিপূর্ণ মানুষ হতে বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যায়-অবিচার, মিথ্যাচার, স্বার্থপরতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠা শিশুর সুমানুষ হওয়ার সুযোগ থাকে না। তবে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকেও অনেক শিক্ষা গ্রহণ করা যায় এবং সেটাই হওয়া দরকার প্রকৃত শিক্ষা। বর্তমান সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার শিক্ষা নামক বই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পাঠ্য বইয়ের তালিকায়। যা থেকে শিক্ষার্থীরা কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে এবং ক্যারিয়ার গড়ার দিক নির্দেশনা পাবে। তবে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশু কিংবা আদৌ বিদ্যালয়ে যায়নি অথবা শিশুশ্রমে বাধ্য করা হচ্ছে এমন শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
শিক্ষিত যুব সমাজ বেকারত্বকে অবলম্বন করে হতাশার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। একটি আকর্ষণীয় চাকরি পাওয়ার আশায় মূল্যবান সময় নষ্ট করছেন শিক্ষিত অর্থাৎ সার্টিফিকেট অর্জন করা বেকার যুবক। সরকার এবং সমাজ ব্যবস্থাকে দোষারোপ না করে স্ব-স্ব উদ্যোগে কর্ম সংস্থানের চেষ্টা করা একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন নিজেকে দক্ষ, যোগ্য ও কর্মঠ হিসেবে গড়ে তুলতে শ্রমের প্রতি গুরুত্ব দেয়া। হোক সেটা মেধা শ্রম কিংবা কায়িক শ্রম।
কিন্তু শিক্ষিত বেকার যুবক চাকরির সঙ্কট এমন অজুহাতে অলসভাবে ভর করে ব্যর্থ জীবনের গ্লানি নিয়ে হতাশায় ভুগছে। এদিকে আত্মসম্মান বোধের কারণে তারা অন্যের কাছে হাত পাততেও পারে না। লাঞ্ছনার জীবন সইতে না পেরে অনেকেই আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। দুই একটি বাস্তব উদাহরণ- আমার এক সহকর্মী (শহীদুল্লা, সংগীতের শিক্ষক, নাকিব কিন্ডার গার্ডেন এন্ড স্কুল) ঋণের বোঝা এবং অর্থ সঙ্কটের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন শেষ পর্যন্ত।
আবার অপর এক মহিলা (বয়স ২৩/২৪ বছর) বিধবা হয়ে তিন সন্তান নিয়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসেন। আমার ছোট্ট প্রতিষ্ঠান (শামীমা শিল্প সংস্থা) থেকে সেলাই কাজ শিখে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত এবং জয়ীতাদের একজন। এমনটি সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র তার পরিশ্রমের ফলে।

বড় বড় দালান-কোঠা সেতু, রাস্তা-ঘাট নির্মাণ কাজে দেখা যায় নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করছেন। কখনো কখনো দেখা যায় নারী শ্রমিক দক্ষতার সাথে, দাপটের সাথে কঠোর পরিশ্রম করছেন। তাঁদের কিন্তু ঘরে কিংবা কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন হতেও শোনা যায় না। এইসব নারী শ্রমিকরাই সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট। নারী শ্রমিকের অবদানেই আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। শ্রমের মর্যাদা রক্ষার্থে পালিত হচ্ছে মহান “মে দিবস”।
উত্তরা ৭নং পার্কে সংস্কার কাজ চলছে। দেখতে পেলাম ১ মে ২০১৮ মঙ্গলবার সকালে সাত/আট জন শ্রমিক নারী-পুরুষ মিলে কাজ করছেন। একজনের মাথায় ঝুড়ি বদল করে অন্যজন নিচ্ছেন। শ্রমের মর্যাদায় আন্তর্জাতিক ছুটির দিনেও তারা অতি উৎসাহ নিয়ে কাজ করছেন।
শ্রমই মানুষের জীবনকে মহিমান্বিত করে তোলে। অলস-কর্মবিমুখ মানুষের জীবন অধঃপতনের চরমে পৌঁছায়। অলসতাকে আঁকড়ে ধরে অজ্ঞ অসচেতন মানুষ ভাগ্যকে দোষারোপ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে জীবনের সফলতা এবং সমৃদ্ধির স্থপতি মানুষ নিজেই।
আমাদের দেশে এখানো প্রচুর সম্পদ রয়েছে জলে-স্থলে, পাহাড়-পর্বতে। লক্ষ্য করলেই দেখা যায় অনাবাদী জমি, ঝোপ-ঝাড়, বন রয়েছে। যেগুলোর ভেতর ভাগ্য লুকিয়ে আছে। গল্পের মধ্যে বৃদ্ধ যেমন তার অলস পুত্রদের বলেছিল অনাবাদী জমিগুলো দেখিয়ে “এসবের নিচে রত্ন রয়েছে, তোমরা খুঁজে বের কর।” অনেকটা সেরকম।
বিশাল জনসম্পদকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক রপ্তানিমূলক দ্রব্য উৎপাদনে দেশে সমৃদ্ধি আসবেই। তবে অধিক বিনোদনের ব্যবস্থা, বিউটি পার্লার, রেস্টুরেন্টের মতো এমন বাণিজ্যে ততটা সমৃদ্ধি ঘটবে না, যতটা ঘটবে কৃষি আর শিল্পে।
যাহোক, খুব পুরনো হলেও একথা সত্য- পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। আদিমকাল থেকেই মানুষ পরিশ্রম করতে করতে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। সমগ্র বিশ্বে আজকে এই সভ্যতা একমাত্র পরিশ্রমেরই সুফল। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর যৌবনের জয়গান প্রবন্ধে লিখেছেন- “আল্লাহ্ হাত দিয়াছেন বেহেস্তী চিজ ধরিয়া খাইবার জন্য।”
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








