আন্তর্জাতিক

শেষ মুঘল সম্রাটকে স্মরণ

-4 Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পূর্বে তোলা বাহাদুর শাহ জাফরের একটি বিরল আলোকচিত্র।

শেষ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর। এক শতকের বেশি সময় প্রায় বিস্মৃত ছিলেন তিনি। কিন্তু তার সমাধি খুঁজে পাওয়ার ঘটনা এই সুফি সাধক ও উর্দু ভাষার অন্যতম সেরা কবির লিগ্যাসিকে নতুন করে চেনার সুযোগ এনে দেয়।

জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ উত্থানের এই সময়ে সহনশীলতা ও বহুত্ববাদীতাকে ধারণ করে চলা এই সম্রাটের জীবন হতে পারে দিক নির্দেশক। সাম্প্রতিক সময়ে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক এই সম্রাটের স্মরণে একটি প্রতিবেদন করেছে বিবিসি।।

১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর ৮৭ বছর বয়সে রেঙ্গুনের (এখন ইয়াঙ্গুন) এক জীর্ণ কাঠের ঘরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাহাদুর শাহ জাফর। তখন গুটিকয়েকজন আত্মীয় সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মৃত্যুর দিনই বিখ্যাত শোয়েদাগন প্যাগোডার কাছে এক কম্পাউন্ডে তাকে সমাহিত করা হয়। তাকে বন্দিকারী ব্রিটিশরা কবরটিতে কোন চিহ্ন রাখেনি।

অনুসারীদের দূরে রাখার জন্যই তার কবরটি অচিহ্নিত রাখা হয়েছিলো। তার মৃত্যুর খবর ভারতে পৌঁছাতে ১৫ দিনের মতো সময় লেগে যায় এবং তা অনেকটা অলক্ষ্যেই থেকে যায়। পরবর্তীতে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তার স্মৃতিতে ধুলো পড়তে থাকে।

শেষ মুঘল সম্রাটের স্মরণে ঐতিহাসিক ছবি, পুরনো মুঘল সম্রাটের প্রতিমূর্তি. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
মুঘল শাসনের গৌরব ফুটে রয়েছে বাহাদুর শাহ জাফরের এই প্রতিকৃতিতে

মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে তার কবিতাগুলো, জানান দিয়ে যায় তার উপস্থিতির।

শেষ মুঘল সম্রাটের ডাক নাম জাফর, যার অর্থ বিজয়। বিদ্রোহে হারলেও রহস্যময় কবিতা, সুফী সাধক হিসেবে ভারতীয়দের মন জিতেছিলেন তিনি, চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছিলেন।

১৭ শতকের শেষে মুঘোল সাম্রাজ্য তার প্রভাব ও ভূখণ্ডের অনেকটাই হারায়। ১৮৩৭ সালে জাফর সিংহাসনে বসেন, তখন তার শাসনাধীন ছিলো শুধু দিল্লি এবং তার আশপাশের এলাকা। কিন্তু প্রজাদের জন্য তিনি সবসময় বাদশাহ-ই ছিলেন।

জাফরের শাসন তার পুর্বসূরি আকবর বা আওরঙ্গজেবের সাথে তুলনীয় নয়। অবিভক্ত ভারতের সৈন্যরা যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো, ১৮৫৭ সালের সেই ব্যর্থ ‘সিপাহী বিদ্রোহের’ সাথেই নির্ধারিত হয়েছিলো তার জীবন।

সেই পরাজয়ের পর সম্রাটকে দেশদ্রোহের দায়ে বিচার, কারান্তরীণ করা হয় এবং ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রনাধীন অন্য অংশে নির্বাসনে পাঠানো হয় তাকে, যা এখন মিয়ানমার নামে পরিচিত।

অন্যান্য মুঘোল শাসকদের মতোই তাকেও মোঙ্গল শাসক চেঙ্গিস খান এবং তৈমুর লং এর সরাসরি বংশধর বলে বিবেচনা করা হতো। তার মৃত্যুর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে এক মহান সম্রাজ্যের।

পরাজিত, হতোদ্যোম, অপমানিত। মুঘল সাম্রাজ্যের সমাপ্তিটা ছিলো এমনই অপমানকর। অথচ তার পূর্বসূরিরা আধুনিক সময়ের ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের বিশাল অংশ এবং বাংলাদেশসহ একটি বিশাল ভূখন্ড ৩০০ বছর ধরে শাসন করেছে।

বাহাদুর শাহ জাফরের গ্রেপ্তারের সময়টি চিত্রিত হয়েছে
বাহাদুর শাহ জাফরের গ্রেপ্তারের সময়টি চিত্রিত হয়েছে

কিন্তু সাম্প্রতিক দশকে জাফরের লিগ্যাসির প্রতি আগ্রহ আবারও বাড়ছে।

১৯৮০-এর দশকের ভারতীয় টিভি সিরিয়াল তার স্মৃতিকে আবারও জাগিয়ে তুলে। দিল্লিতে ও করাচিতে তার নামে সড়ক রয়েছে। ঢাকাতেও একটি পার্ক তার নামে নামকরণ করা হয়।

‘লাস্ট মুঘোল’ গ্রন্থের লেখক ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিম্পল বিবিসিকে বলেন, জাফর একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন হস্তলিপিবিদ, উল্লেখযোগ্য কবি, সুফি পীর (আধ্যাত্মিক নেতা), যিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের গুরুত্ব বুঝতেন।

ডালরিম্পল তার বইয়ে লিখেন, “নায়কোচিত বা বিপ্লবী নেতা হিসেবে জাফরকে মুছে ফেলা যাবে না, পূর্বসুরি সম্রাট আকবরের মতো তিনিও থাকবেন, ইসলামি সভ্যতার সবচেয়ে সহনশীল এবং বহুত্ববাদী সময়ের এক আকর্ষণীয় প্রতীক হিসেবে।”

কারও মতে, জাফরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা তার অভিভাকদের মাঝে প্রতিফলিত হয়। তার বাবা দ্বিতীয় আকবর শাহ ছিলেন মুসলিম এবং মা লাল বাঈ ছিলেন একজন হিন্দু রাজপুত।

সিপাহী বিদ্রোহ
সিপাহী বিদ্রোহ

১৮৫৭ সালের ‘সিপাহী বিদ্রোহ’
১০ মে উত্তরের শহর মিরুতে ভারতীয় সেনারা ব্রিটিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহ দিল্লি, আগ্রা, লক্ষ্ণৌ ও কানপুরে ছড়িয়ে পড়ে। নতুন সংস্কার, আইন, পশ্চিমী মূল্যবোধ এবং খ্রিস্টান ধর্ম আরোপের প্রচেষ্টা বৃদ্ধিতেই এই অসন্তোষে জন্ম। এই বিদ্রোহ হাজারো হিন্দু মুসলিম সেনাদের ঐক্যবদ্ধ করে, যারা তখনকার মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে বেছে নিয়েছিলো তাদের প্রধান হিসেবে। ব্রিটিশ জেনারেলরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাঞ্জাব ও পাঠান থেকে শিখ সেনাদের নিয়োগ করে। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে দিল্লি পুনর্দখল করা হয়। উভয় পক্ষকেই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ নারী ও শিশুদের হত্যা করে। ব্রিটিশরা হাজারো রাজদ্রোহী এবং তার সমর্থকদের গণহারে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১৯৫৮ সালের জুলাইতে এই বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। একই বছর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অবলুপ্ত হয়ে ভারত সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হয়।
(সূত্র: ব্রিটানিকা, বিবিসি হিস্টোরি)

ইয়াঙ্গুনের একটি নীরব অ্যাভেনিউতে রয়েছে জাফরের অনারম্বর সমাধি। ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে টালমাটাল সময়কে নীরবে স্মরণ করিয়ে যাচ্ছে তা।

সমাধি ক্ষেত্রের দরজায় শেষ মুঘল সম্রাটের নাম লেখা রয়েছে
সমাধি ক্ষেত্রের দরজায় শেষ মুঘল সম্রাটের নাম লেখা রয়েছে

যদিও স্থানীয় লোকজন জানতেন, জাফরকে স্থানীয় সেনানিবাসের কমপাউন্ডের কোন এক স্থানে সমাহিত করা হয়েছে, যেখানে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা কারান্তরীণ ছিলেন। কিন্তু তারা ১৯৯১ সালের আগপর্যন্ত তা খুঁজে পাননি।

ড্রেইন তৈরির জন্য খননের সময় এই সমাধি খুঁজে পাওয়া যায়। জনসাধারণের অনুদানের সাহায্যে পরবর্তীতে তা সংস্কার করা হয়।

জিনাত মহল
জিনাত মহল

ভারতে তার পুর্বসূরিদের সমাধির তুলনায় জাফরের সমাধি একেবারেই সাদাসিধে। ধনুকাকৃতির একটি লোহার গ্রিলে তার নাম ও পদবী লেখা রয়েছে। এর নিচ তলায় তার এক স্ত্রী জিনাত মহল ও নাতি রৌনাক জামানির কবর রয়ছে।

জাফরের সমাধিতে ছড়িয়ে রয়েছে গোলাপের পাপড়ি ও নানা ধরণের ফুল। উপরে রয়েছে একটি দীর্ঘ ঝারবাতি। তার একটি পেইন্টিং দেয়ালে ঝুলানো রয়েছে। পরের ঘরেই রয়েছে একটা মসজিদ।

ইয়াঙ্গুনের মুসলিম অধিবাসীদের জন্য দরগাটি পবিত্র স্থান হয়ে উঠেছে। দরগার ব্যবাস্থাপনা বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ আল-হাজ উ আয়ে লুইন বলেন, “সকল শ্রেণী-পেশার লোক দরগায় আসেন, কারণ তারা তাকে সুফি সাধক মনে করেন।”

“তারা এখানে আসে ধ্যান করতে, তার কবরের পাশে বসে প্রার্থনা করতে। যখন লোকজনের আশা পূর্ণ হয় তারা অর্থসহ অন্যান্য জিনিস দান করেন।”

উর্দুতে রহস্যময় কাজের জন্যও বিশেষ ভাবে স্মরণীয় জাফর। জীবন ও প্রেম নিয়ে তার গজল অনেক বিখ্যাত। ইয়াঙ্গুনের মুশায়রাতে (এমন সমাবেশ যেখানে উর্দু কবিতা আবৃত্তি করা হয়) তার কবিতা প্রায়ই পাঠ হয়।

বন্দি থাকা অবস্থায় কলম বা কাগজ ব্যবহার করতে না পারায় কাঠকয়লা দিয়ে দেয়ালে তিনি লিখে রাখতেন। তার কয়েকটি কবিতা তার সমাধিক্ষেত্রে রাখা হয়েছে।

শাসক হিসেবে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ না দিলেও মুসলিম-হিন্দুর মিলিত বিদ্রোহের প্রতীকী প্রধান হয়ে উঠেছিলেন জাফর। মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠায় উভয় ধর্মের হাজারো সেনা ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

জাফরের সমাধিতে ছড়িয়ে রয়েছে গোলাপের পাপড়ি ও নানা ধরণের ফুল
জাফরের সমাধিতে ছড়িয়ে রয়েছে গোলাপের পাপড়ি ও নানা ধরণের ফুল

এ বছরে সিপাহী বিদ্রোহের ১৬০তম বার্ষিকী পার হলো। কিন্তু ভারত এবং অন্যান্য জায়গায় তা তেমনভাবে পালিত হয়নি।

জাতীয়তাবাদ এবং মৌলবাদের উত্থানের এই সময়ে জাফরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা প্রাসঙ্গিক, বলে অভিমত ইতিহাসবিদদের। পদবী বা সাম্রাজ্য হারালেও, একজন সুফী সাধক এবং রহস্যময় কবি হিসেবে তিনি হৃদয় জয় করছেন, এভাবেই তিনি বেঁচে রয়েছেন আজও।

বিষয়:মুঘল মুঘল সম্রাট

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…