শিক্ষা বিভাগকে সুষ্ঠু ও সঠিক পথে চালানোর জন্য রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়,প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা ভবন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর। রয়েছে বিভাগীয় শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা অফিস, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস ( মাধ্যমিক) ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ভাবে ও প্রতি জেলা, উপজেলায় শিক্ষা বিষয়ক নানা কমিটিও রয়েছে। যেমন জাতীয় এমপিও কমিটি, শিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রনালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি, জেলা উপজেলায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে প্রধান করে গঠিত নানা কমিটি।
এত কমিটি, এত জনবল ও সরকারী রাজস্ব খাত হতে এত বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয়ে কী শিক্ষা হচ্ছে শিক্ষা বিভাগের? যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তারা এগিয়ে নিচ্ছে এদেশের শিক্ষার অগ্রগতিকে?
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো এত কিছু থাকার পরেও আমাদের শিক্ষা আজ অগ্রগতির উল্টো দিকে ছুটছে। পশ্চাৎগামিতা তার নিত্য সঙ্গী। ২০ জানুয়ারী, দৈনিক সমকালে শিরোনাম হলোঃ বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে:
শিক্ষামন্ত্রী। ঢা,বির কার্জন হল প্রাঙ্গনে বাংলাদেশ ফিজিক্স অলিম্পিয়াড -২০১৭ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ আরও বলেন,‘শিক্ষার মান বাড়াতে পাঠ্যপুস্তক,পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ ও আকর্ষনীয় করা হচ্ছে।বইয়ের বোঝাও কমানো হবে।’

দেশ জুড়ে যখন পাঠ্যপুস্তকে ভুল বানান ও বিকৃত তত্ত্ব সংযোজন নিয়ে সরব আলোচনা শুরু হয়। শিক্ষাবিভাগের বেহাল দশার খবর যখন গাঁও গেরামেও পৌঁছে যায়। এরকম প্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্য আলোচনা সমালোচনাকে আরও বিস্তৃততর করতে সহায়ক হবে। পদায়িত রাজনীতিকদের এমন লাগামহীন বক্তব্যে তাদের সম্পর্কে সাধারণ জনগনের মাঝে কী লজ্জাজনক নেতিবাচক ইমেজ গড়ে উঠছে তা জেগে ঘুমানো ছাড়া ঘুমিয়ে ঘুমানোর সকল ব্যক্তিই বুঝে নিতে পারছেন।
মন্ত্রী বললেন, শিক্ষার মান বাড়াতে পাঠ্যপুস্তক,পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ ও আকর্ষণীয় করা হচ্ছে। আর বাস্তবতা হল, পাঠ্যপুস্তকে ভুল বানান ও বিকৃত তত্ত্বে শিক্ষার মানকে ধ্বংস করে এক বিভ্রান্ত প্রজন্ম সৃষ্টির কর্ম পরিচালনা।
শিক্ষার্থী,অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক সমাজ শিক্ষার এই অধঃপতিত ভবিষ্যত নিয়ে চরম ভাবে শংকিত। যে শিক্ষামন্ত্রী ভুলের দায় স্বীকার করে ভুল সংশোধনে আঠা লাগানোর কথা বললেন তিনিই আবার পাঠ্যপুস্তককে আকর্ষনীয় দাবীও করলেন। বইয়ের বোঝা বইতে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকরা যেখানে চরম ভাবে হাঁপিয়ে উঠছেন সেখানেই বইয়ের বোঝা কমানোর দাবী করলেন। আরও বললেন, শিক্ষার মান বাড়াতে পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ করা হচ্ছে।

পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ হলে শিক্ষার মান বাড়বে না কমবে? এই প্রশ্নের উত্তরে দেশের মানুষ কি একমত হবে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে? আর পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ হলে শিক্ষার মান বেড়ে বিশ্বমানের হবে এই তত্ত্বের সাথে কতজন একমত হবে? শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ আঠা তত্ত্বের পরে পরীক্ষা পদ্ধতি সহজ তত্ত্ব উপহার দিলেন জাতিকে। আরও ঘোষণা দিলেন তার এসব তত্ত্বেই বাংলাদেশের শিক্ষা বিশ্বমানের শিক্ষায় উন্নীত হবে!
একজন মন্ত্রীর বক্তব্য অসংলগ্নতা, স্ববিরোধিতা ও বেফাঁস, অবাস্তবতার দিক থেকে যে দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বমান ছাড়িয়ে যাচ্ছে তা বুঝে নিতে এখন যে আর কারও অসুবিধা হচ্ছেনা এটা স্পষ্ট।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, ইতিহাস বিকৃতি, কোচিং বাণিজ্য, নোট গাইডের রমরমা বাণিজ্য সরকারের অবৈতনিক ও সার্বজনীন শিক্ষাকে শতভাগ ব্যর্থ করে দিচ্ছে। শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে পাঠদানের চেয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কোচিং বাণিজ্য ও প্রাইভেট টিউশনিতে। খোদ মহাবিদ্যালয় ও বিদ্যালয়গুলোতেও উচ্চ হারে কোচিং ফি নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের কোচিং করতে বাধ্য করা হয়। জেলা উপজেলায় কোচিং বিষয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে কিন্তু এগুলো শুধুই কাগজে কলমে। শিক্ষাখাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয় কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা হিসেবে। জেলা, উপজেলায় শিক্ষা অফিস রয়েছে। রয়েছে কর্মকর্তা, কর্মচারী। শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিক্ষাবিধি লংঘনের ব্যাপারে তাদের কোন ভূমিকা নেই।
নতুন, ভুলে ভরা ও বিকৃত তত্ত্ব সম্বলিত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে নোট গাইড ব্যবসায়ীরা বিপুল উদ্দীপনায় ছাত্রছাত্রীদের কাঁধে বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। অভিভাবকরা হাঁপিয়ে উঠছে নোট গাইড কেনার অর্থ জোগার করতে যেয়ে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন রয়েছে নির্বিকার ভূমিকায়। সার্বিক অর্থে শিক্ষা বিভাগ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গুনগত মানের তোয়াক্কা করছেনা। বাণিজ্যিকীকরণ প্রতিরোধ নিয়ে ভাবছেনা। শিক্ষা মন্ত্রী তৃপ্তির ঢেঁকুর ফেলছেন পাশের পার্সেন্টেজ নিয়ে।`আমার আমলে কোন পরীক্ষার্থী ফেল করেনি’ এটা বলেই বুঝি তিনি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে চাচ্ছেন।

গুণগত মান ধ্বংস করে শুধু এই সংখ্যা বাড়ানোর কুফলও প্রকাশ হতে শুরু করেছে। খবরে বের হয়েছে,এ প্লাস প্রাপ্ত ছাত্র ছাত্রীরা জানেনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির নাম কী। তারা স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসও জানেনা। বিজ্ঞান বিভাগ হতে এ প্লাস পাওয়ার পরও জানেনা নিউটনের সূত্র কী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ৫ হতে ১৩ শতাংশ পাস করে। ২০১৪ সালের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজী বিভাগে মাত্র দুজন কৃতকার্য হয়েছিল।
১৫ জানুয়ারী ২০১৭ সাপ্তাহিক নতুন কথার একটি প্রতিবেদনে লিখেছে,শিক্ষা ক্ষেত্রে গুণগত মানের ক্রমাগত অবক্ষয়ের কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে শিক্ষকদের উদার মনোভাবের নম্বর প্রদানই এর জন্য দায়ী। আর এই কাজে শিক্ষকদের বাধ্য করছে শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ। বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন করেন এমন বেশ কয়েকজন শিক্ষকের নিকট থেকে জানা গেছে,শিক্ষার্থীদের ফেল করালে হুমকি প্রদান করা হয়। বেতনের পাশাপাশি খাতা মূল্যায়ন করলে টাকা পাওয়া যায়। তাই বাড়তি আয়ের আশায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ যা নির্দেশনা দেয়-সেভাবেই তারা খাতায় নম্বর প্রদান করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রধান পরীক্ষক জানিয়েছেন,খাতা দেয়ার সময় বোর্ড কর্তৃপক্ষ উদার ভাবে নম্বর প্রদানের ইঙ্গিত প্রদান করেন। নম্বর দেয়ার ক্ষেত্রেও নাকি বেশ কিছু অলিখিত নীতিমালা আছে। এসব নীতিমালা হলো-কোনো শিক্ষার্থী ২০ পেলে তাকে পাস করানোর চেষ্টা করতে হবে। ৬০ পেলে ৭০ বানিয়ে এ গ্রেড,৫০ পেলে ৬০ বানিয়ে এ মাইনাস,৪০ পেলে ৫০ বানিয়ে বি গ্রেড এবং ৩০ পেলে ৪০ বানিয়ে সি গ্রেড দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা ৬৫ থেকে ৭০ পেলেই তাদেরকে ৮০ দিয়ে এ প্লাস দিতে হবে।’
এছাড়াও রয়েছে নামে বেনামে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিকৃত তত্ত্ব ও তথ্য চর্চা করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভুল শিক্ষায় পাঠদান করা। রাজাকারকে শহীদ বলে প্রচার,জাতীয় সঙ্গীত গাইতে না দেয়া,উচ্চ ভর্তি ফি ও মাসিক বেতন রীতি চালু রয়েছে এগুলোতে। ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজার এলাকায় ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত অন্বেষা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে প্লে গ্রুপের একজন শিক্ষার্থীর ভর্তি ফি ১০,০০০টাকা ও মাসিক বেতন দেড় হাজার টাকা। দশম শ্রেনীতে ভর্তি ফি ১৫,০০০টাকা ও মাসিক বেতন ৫০০০টাকা। এই বিদ্যালয়টি হতে শিক্ষার্থীদের দেয়া সনদপত্র,নম্বর পত্র ও দাপ্তরিক কাগজে `ডেডিকেটেড টু দি মেমোরি অফ শহীদ গভর্নর আব্দুল মোনায়েম খান এইচপিকে (হিলাল-ই-পাকিস্তান) উল্লেখ থাকে। প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রামেও চাঁদ তারার পাকিস্তানী পতাকার চিহ্ন। ২০ বছর ধরে চলে আসা এই দেশদ্রোহী ঔদ্ধত্য কী করে চলতে পারল? কোথায় ছিল ময়মনসিংহের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গুলো? কোথায় ছিল ময়মনসিংহের শিক্ষা প্রশাসন? ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের নব্বই দশকের সাবেক ছাত্র নেতারা এর প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারক লিপি পেশ করেন। জেলা প্রশাসন অভিযোগের সত্যতা পেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয় বরাবরে চিঠি প্রদান করে। কিন্তু অদ্যাবধি পর্যন্ত মন্ত্রনালয় কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

এরকম হাজারো অভিযোগ শিক্ষা বিভাগে। শিক্ষার মান উন্নয়ন ভিত্তিক মন্ত্রনালয় পরিচালনায় শিক্ষা মন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদকে শতভাগ ব্যর্থ বললেও অত্যুক্তি হবেনা। সেই তিনিই যখন ভুল ও বিকৃত তত্ত্বে ভরা পাঠ্যপুস্তক দিয়ে শিক্ষাকে বিশ্বমানে পৌঁছানোর ঘোষণা দেন তা হাসির খোরাকই হয়। আসলে আমাদের চরম দুর্ভাগ্য এই দায়িত্ব কর্তব্য জ্ঞানহীন,অথর্ব শিক্ষা বিভাগকে শিক্ষা দেবার মত কেউ নেই। যে শিক্ষা বিভাগ নিজেই শিক্ষার আলোবিহীন সে শিক্ষা বিভাগ যে আলোর বদলে আঁধারই ছড়াবে সেটাইতো বাস্তব। প্রজন্মকে আলোকিত প্রজন্ম হিসাবে গড়ে তুলতে শিক্ষা বিভাগকে শিক্ষা দিতে উদ্যোগ নিতে হবে। এ উদ্যোগ বিলম্বিত ভাবে নয় প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









