মনিপুরের ‘লৌহ মানবী’ খ্যাত ইরম শর্মিলা চানুর দীর্ঘ ১৬ বছরের অনশন ভাঙ্গা, নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত এবং ডেসমন্ড কুটিনহোর সাথে প্রেমের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি প্রশ্ন ছুড়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন স্বাধীন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ফৌজিয়া খান।
টেলসফ্রমমারজিনস, ইরমশর্মিলা এবং কবিতাযোশী –এই তিনটি হ্যাশট্যাগ দিয়ে ফৌজিয়া খান লিখেন,
“গতকালই ফেসবুকে কয়েক বন্ধুর ওয়ালে খবরটি চোখে পড়ে। মনিপুরের ইরম শর্মিলা দীর্ঘ অনশনের পর এখন নির্বাচন করবেন! অবাকই হয়েছি।
ইরমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় বেশ কয়েক বছর আগে। পুনে ফিল্ম ইন্সস্টিউটে আমাদের দু’বছরের সিনিয়র কবিতা যোশীর বানানো প্রামাণ্য ছবি টেলস ফ্রম মারজিনস-এ ইরমকে প্রথম দেখি। ভারতের মনিপুর রাজ্যের মানুষ ইরম। মনিপুরে সেনাসদস্যদের অসম্মানজনক, অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে সেখানে নারীরা বস্ত্রহীন শরীরে সরকারি কোনো অফিসের (সংসদ জাতীয় কিছু হবে, এখন মনে পড়ছে না) সামনে সমবেত হয়। সেই সমাবেশে সেনাদের অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে ইরম শর্মিলা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আমরণ অনশন শুরু করেন। সরকার পক্ষ নানাভাবে তার অনশন ভাঙানোর চেষ্টা করে। তাতে সাফল্য না পেয়ে শর্মিলাকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা মানে স্যালাইন দেয়ার নামে অন্তরীণ করে রাখা হয়। সেনা আগ্রাসনের প্রতিবাদে তার এই অনশনে পরিবারসহ পুরো মনিপুরের সকলের সমর্থন ছিল। মনিপুরে মানুষের অধিকার আদায়ে লড়াইয়ের তিনি ছিলেন এক অনন্য প্রতীক। আজ থেকে ৮/৯ বছর আগে ছবিটি দেখে আমি বেশ মুগ্ধ এবং অবাক হয়েছিলাম। ফিল্ম ইন্সস্টিটিউটে কবিতাকে ফ্যাশন দুরস্ত পাংক ধরনের একজন হিসেবেই জানতাম। আমাদের ছাত্রজীবন শেষ হবার বেশ কয়েক বছর পর বোম্বেতে একটা ফিল্ম উৎসবে কবিতার ‘টেলস ফ্রম মারজিনস’ দেখি। এর বিষয় এবং এই বিষয়ের দৃশ্যায়নে পরিচালকের ভীষণ সংবেদী, মানবতাবাদী স্টাইল কবিতা যোশী সম্পর্কে আমার আগের ভাবনা পাল্টে দেয়। মানুষের বাইরেটা দেখে আমরা কত কী যে ভেবে নেই!
কবিতার এই ছবিটি দেখার আগে তরুণ বয়সী ইরম শর্মিলা এবং মনিপুরের মানুষের এই আন্দোলনের বিষয়টা জানা ছিল না। রাষ্ট্রীয় নানা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদে জারি থাকা আন্দোলনের ঘটনাটি তখন আমাকে নাড়া দিয়েছিল। নতুন করে মাধ্যম হিসেবে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের শক্তির দিকটাও অনুধাবন করেছিলাম তখন। তারপর পত্র-পত্রিকার খবরেই জেনেছি, ইরম তার অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। তার অধিকার আদায় হয়নি। জীবন থেকে চলে গেছে ষোলোটি বছর।
ষোল বছর ধরে অনশন করার পর তিনি অনশন ভেঙেছেন- স্ব-ইচ্ছায়। ইরমের বয়স এখন চুয়াল্লিশ। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নির্বাচন করবেন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে আইন পরিবর্তন করে তার দীর্ঘ আন্দোলনের একটা পরিণতি দেখতে চান তিনি। অবাক কাণ্ড যে, এই সিদ্ধান্তে ক্ষেপে গেছেন তার পরিবার ও সমাজের সকল মানুষ। তারা ক্ষেপেছেন কারণ ইরমের প্রেম হয়েছে ডেসমন্ড কুটিনহো নামের এক ব্যক্তির সাথে। ডেসমন্ড আধা ইংরেজ আধা ভারতীয়। কাগজ পড়ে ডেসমন্ড বিষয়ে এরচে বেশি কিছু জানা গেল না।
ইরমের প্রেম হবার ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছেন না কেউ! খবরের কাগজ লিখেছে, প্রেমের ফাঁদে ফেলে সরকার তার অনশন ভাঙিয়েছে বলে মনে করছে শর্মিলার আন্দোলনের সঙ্গীরা। আর তার অনশন ভঙ্গের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারতে সবচেয়ে বড় সত্যাগ্রহ আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে।
এখন মা এবং ভাই ইরমকে বাড়ি ঢুকতে দিচ্ছে না। তাকে ফিরে যেতে হয়েছে হাসপাতালেই। কারণ আপাতত তার থাকার মতোন কোনো জায়গা নেই।
খবরটি পড়ে কয়েকটি বিষয় মাথায় কুটকুট করছে:
– সিস্টেমেটিক সশস্ত্র আগ্রাসনের বিরূদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কৌশল দীর্ঘমেয়াদে চালানো গেলেও তাতে কোনো ফল পাওয়া সম্ভব নয়?
– আন্দোলনের কৌশল হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পন্থা বেছে নেয়ার সিদ্ধান্ত ইরম কি সকল দিক ভেবে নতুন উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়েছেন?
– ইরম কি প্রেমের ঘোরে আছেন? তিনি কি এই ঘোর দশা পাড় হয়ে বাস্তবে তার দীঘর্ আন্দোলনের পথে হাঁটার লড়াই জারি রাখতে পারবেন?
– নাকি তিনি সত্যি সত্যি ভারত সরকারের টোপ গিলেছেন?
– টোপ হউক আর যাই হউক ডেসমন্ড কুটিনহোর সাথে ইরমের প্রেম হয়েছে। সেই প্রেম এতটাই শক্তিশালী যে দীর্ঘ ষোল বছর ধরে করা অনশন ভেঙেছেন ইরম। হারালেন পরিবার, সম্প্রদায়ের সকলের ভালোবাসা, দীর্ঘ সংগ্রামের সাথীদের। ডেসমন্ড কুটিনহো ইরমের এই দুনির্বার আবেগের যথাযথ মূল্য দেবেন তো?
– ইরম প্রেমে না পড়লে মনিপুরের মানুষ এত কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতেন কি?
উত্তর মিলবে??????????? ”








