মধ্য মিশরের নীল ডেল্টা অঞ্চলের ছোট একটি গ্রাম ‘নাগরিগ’। সেখানকার শিশুদের জীবনের একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য আছে। ফুটবলার হওয়ার লক্ষ্য। ঠিক মোহাম্মেদ সালাহ’র মত। চলতি মৌসুমে লিভারপুলের টপ স্কোরার ও আফ্রিকার সেরা খেলোয়াড় সালাহ’কে এখন ডাকা হচ্ছে ‘মিশরীয় মেসি’ নামেই।
প্রত্যন্ত একটি গ্রাম থেকে উঠে আসা সালাহ লিভারপুলে যোগ দেয়ার পর থেকেই দলের প্রাণভোমরায় পরিণত হয়েছেন। রোববারও সাউদাম্পটনের বিপক্ষে দর্শনীয় একটি গোল করেছেন। যা চলতি মৌসুমে অল রেডসদের হয়ে তার ২৯তম লক্ষ্যভেদ। অলরেডসরা এখন তাকে ডাকতে শুরু করেছে ‘লাল সালাহ’ বলে।
শুধু লিভারপুলই নয়, সালাহ পরিণত হয়েছেন জাতীয় বীরেও। মিশরকে রাশিয়া বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার পেছনে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন এ ফরোয়ার্ড।
রাজধানী কায়রো থেকে ১২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সালাহ’র গ্রাম ‘নাগরিগ। খাল-খন্দে ভরা সরু রাস্তার সেই গ্রামের শিশুদের এখন একটাই লক্ষ্য, সালাহ’র মত হওয়া। আবদেল গাউয়াদ নামের ১২ বছরের একটি শিশু আন্তর্জাতিক এক বার্তা সংস্থাকে বলেছে, ‘নৈতিকতা এবং নম্রতার কারণে মোহাম্মদ সালাহ একজন পেশাদার খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন। বড় হতে হতে আমিও তার মত হতে চাই।’
সালাহ’র গ্রামের কাছে শহর বাসুয়ান। নাগরিগের পাশাপাশি বাসুয়ানের যুব কেন্দ্রগুলোর নাম মিশরীয় তারকার নামে নামকরণ করা হয়েছে।
এটা নিশ্চিত যে সালাহ’র সাফল্য মিশর এবং আফ্রিকান শিশুদের জন্য একটি ব্যাপক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। সালাহ নিজেও তা স্বীকার করেছেন। জানুয়ারিতে আফ্রিকান সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জয়ের পর বলেছেন, ‘কখনোই স্বপ্ন দেখা বন্ধ করো না, আত্মবিশ্বাসটা আটকে দিও না।’
নাগরিগ আক্ষরিক অর্থেই একটি নীরব গ্রাম। সেখানকার বাড়িগুলোতে কখনো জানালা খোলা থাকে না। বাইরে থাকে না কোন কাপড় নাড়া। কিন্তু এই নীরব গ্রামই মিডিয়া আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শুধু সালাহ’র কারণে।
নাগরিগের যুব সেন্টারে সালাহ’র জুনিয়র কোচ ছিলেন ঘামরি আবদেল–হামিদ এল-সাদানি। ৮ বছর বয়সেই সেখানে অনুশীলন শুরু করেন সালাহ। ঘামরি বলেন, ‘তার প্রতিভা স্পষ্ট হতে শুরু করে প্রথম থেকেই।’ ঘামরি আরও জানান, শুধু মেধার জোরেই নয়, সালাহ সফল হয়েছেন তার ইস্পাত কঠিন মনোবল, প্রচেষ্টা ও দৃঢ় সংকল্পের কারণে।
সালাহ’র জন্য গর্বে বুক ভরে গেছে তার গ্রামের মেয়র মাহের সাত্থিয়ারও। গ্রামের বিখ্যাত সন্তান সম্পর্কে তার ভাষ্য, ‘মাত্র ১৪ বছর বয়সে এক আরব মালিকানাধীন ক্লাবে যোগ দেন সালাহ। সেই ক্লাবে অনুশীলনে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন তাকে ১০ ঘণ্টা বাসে বসে থাকতে হত।’
সালাহ অবশ্য একটি ক্রীড়াপ্রেমী পরিবারে বড় হয়েছেন। তার বাবা ও দুই চাচা নাগরিগের যুব ক্লাবে খেলেছেন।
‘যখন তার বাবা সালাহ’র প্রতিভা দেখল, তখনই তাকে ক্লাবে ভর্তি করে দেয়। শুরুতে সালাহ বাসুয়ান টাউন দলের হয়ে খেলেন। পরে চলে যান তানতা শহরে ’-বলেন মেয়র।

সুইজারল্যান্ডের ক্লাব বাসেলে যাওয়ার আগে পাঁচ বছর তানতানাতে কাটান সালাহ। মূলত ওই সময়টাতেই ডানা মেলতে শুরু করে তার প্রতিভা।
বাসেল থেকে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল চেলসিতে যান সালাহ। কিন্তু শুরুতে প্রথম একাদশে নিয়মিত হতে ব্যর্থ হন। পরে চলে যান ইতালিতে। সঙ্গে সঙ্গেই যেন সবকিছু পাল্টে যায়। এএস রোমার হয়ে তার পারফরম্যান্সে আকৃষ্ট হয় জায়ান্ট ক্লাবগুলো। অন্যদের সঙ্গে পাল্টা দিয়ে গত মৌসুমে তাকে ৪৪ মিলিয়ন ইউরোয় দলে ভেড়ায় লিভারপুল। এখন বিশাল অর্থে সালাহ’কে দলে পেতে মরিয়া ম্যানসিটি থেকে রিয়াল মাদ্রিদের মত জায়ান্টরা।
সালাহ’র পরিবার গ্রামে ঐতিহ্যবাহী পরিবার হিসেবেই খ্যাত। তার মা-বাবা দুজনেই সরকারি চাকরি করেন। তবে সরকারি কাজের পাশাপাশি জেমমিন ফুলের ব্যবসা আছে তার বাবার।
পারফিউম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অন্যতম রপ্তানিকারক স্থান আবার সালাহ’র গ্রাম নাগরিগ। বসন্তে ফোটা জেসমিন ফুলে ঢেকে থাকে নাগরিগ।
মাঠের মত ব্যক্তিজীবনেও অল্প বয়সেই থিতু হয়েছেন সালাহ। বিয়ের কাজটা অল্প বয়সেই সেরেছেন। বর্তমানে ২৫ বছরের সালাহ নিজ গ্রামের মেয়ে ম্যাগিকে বিয়ে করেন ২০ বছর বয়সেই। একটি কন্যা সন্তান আছে তাদের। সৌদি আরবের পবিত্র শহরের নামে নাম রেখেছেন ‘মক্কা’।

সামাজিক কাজেও জড়িত আছেন লিভারপুল তারকা। নিজের গড়া দাতব্য সংস্থায় প্রতি মাসে ৫০ হাজার মিশরীয় পাউন্ড দেন তিনি। ওই সংস্থা চালাতে মাসে এটাই খরচ হয়।
ছুটি দিনে বিদেশ নয়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে নিজ গ্রাম নাগরিগেই ফেরেন সালাহ। মানে শিকড়ের টান ভোলেননি ক্যাতির চূড়ায় পৌঁছেও।
শুধু দাতব্য সংস্থাতেই নয়, সালাহ নিয়মিত অনুদান দেন বাসুয়ান হাসপাতাল এবং নির্মানাধীন বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও।
গ্রামের মানুষজন গর্ব করেই বলেন, ‘আট বছর বয়সী সালাহ আর বর্তমান সালাহ একই রকম বিনয়ী।’








