সেটা ১৯৯৬ সাল, তারিখ মনে করতে পারছি না তবে সেটা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক পরের ঘটনা। ছিলো ছুটির দিনের সকাল। কোথায় কার কাছে যাওয়া যায় ভাবছি। হঠাৎ করেই বাসায় এসে হাজির হলেন আমার ইয়াং, অবিবাহিতা মেয়ে সহকর্মী, একটু অবাক হলাম। তার কিছুক্ষন পরেই হাজির হলেন আমার আরেক ইয়াং, অবিবাহিত ছেলে সহকর্মী। ঘটনায় যে প্যাঁচ লেগে গেছে তখন তা বুঝতে আমার আর আমার গিন্নির অসুবিধা হয়নি। কারণ তখন আমার অফিসে আমিই সব চেয়ে পুরাতন বিবাহিত বাঙ্গালী অফিসার। মেয়ে সহকর্মীটি কিন্তু বাঙ্গালী না, চাকমা। তাঁর এক খালু ছিলেন শান্তিবাহিনীর খুব বড় মাপের নেতা, নামের শেষে আছে ‘খীসা’। আরেক খালু সাংবাদিক, ইংরেজি পত্রিকার, তাঁর নামের শেষেও ‘খীসা’ আছে। সেটা জেনেছি কিছুদিন পরে।
লজ্জা রাঙ্গা হাসি মুখ নিয়ে দুজনেই আমার গিন্নি মানে অফিসের সবার বড় ভাবিকে সাথে নিয়ে বেডরুমে ঢুকে গেলেন। আমি মনে মনে পুলকিত, আজ খাবারের মেনুটা লম্বা হবে। নতুন মেহমান এলে আমার গিন্নির রান্নার প্রদর্শনী হবে, অভিজ্ঞতা তাই বলে। যা হোক, জানা গেলো তাঁরা বিয়ে করে ফেলেছেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ে কোন পক্ষের অভিভাবকরা কিছু জানে না। ছেলের বাবা অমুসলিম বৌ মেনে নিতে নারাজ হবেন, তা প্রায় নিশ্চিত। আর মেয়ের খালুদের সবাই যেহেতু শান্তিবাহিনীর সাথে খুব সক্রিয় তাই সুযোগ পেলে তাদের মেরেও ফেলতে পারে। সাংবাদিক খালু ঢাকা শহরেই থাকেন, তিনি ছিলেন শান্তিবাহিনীর বড় অফিসার। গুলি খেয়ে আধা পঙ্গু হয়ে চিকিৎসা শেষে এখন সাংবাদিক। তাই খুব সাবধানে এগুচ্ছে তাঁরা। তারা অনেক ভেবে আমার কাছে এসেছে। বিয়ে হয়েছে অনেকদিন আগেই কিন্তু বলতে পারছে না কাউকে, নানা শঙ্কায়। আমার কাছে এসব সমস্যা কোন সমস্যাই না, কারণ বয়স খুব কম। সব থোড়ায় কেয়ার করি ভাব। আর মেয়ের খালু যেহেতু সাংবাদিক তাতে আমার অনেক সুবিধা। কারণ তখনো আমার গায়ে থেকে সাংবাদিকের গন্ধ মুছে যায়নি পুরোপুরি। নেতাদের সবাইকে চিনি, আমাকে ভালো জানেন খীসা বাবুর পত্রিকার সম্পাদক সাহেবও।
অনেক ঘটনা আর আলোচনার পরে ছেলের বাবাকে রাজী করিয়ে নতুন ক’রে বিয়ে দিলাম। আমার পরিবার হলো মেয়ের পরিবার, সেই বন্ধন আজো অটুট আছে। কিন্তু বিয়ে দেবার কিছুদিন পর থেকেই আমার উপর হুমকী আসা শুরু হলো। তখন আমার বাসায় ছিল ২টা টেলিফোন নাম্বার। থাকি শেওড়া পাড়ায় এমন জায়গায় যেটি মীরপুর আর শের-এ-বাংলা নগর এক্সচেঞ্জের বর্ডার। একটা নাম্বার ৩২৫২৯৪, আরেকটা ৮০৮২৩৪। এই ফোন দু’টো আমাকে বাঁচিয়ে দিল অনেক ঝামেলা থেকে। সাংবাদিক খীসা বাবু ৩২৫২৯৪ নাম্বার আমার বলে জানতেন। আর ৮০৮২৩৪ নাম্বারটি আমার সহকর্মী জুলফিকার আলী সাহেবের বলে জানতেন, যা ছিল ভুল। যা হোক খীসা বাবু ৩২৫২৯৪ নাম্বারে কল করে আমাকে হুমকি দিলেন। খুব চড়া মেজাজ তাঁর। আমি খুব নরম সুরে কথা বলছি, কারণ বুঝে গেলাম যে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে। মাথা গরম করা যাবে না, এত তাড়াতাড়ি। ফোনে সাবধানে কথা বলতে হবে। হঠাৎ করে ৮০৮২৩৪ নংএ রিং বেজে উঠলো। একটু মেকি সুরে সালাম দিলাম। অপর দিকে সেই খীসা বাবু। বললেন, ‘জুলফিকার আলী সাহেব, আপনার সহকর্মী আরেফিন খুব ঝুঁকিতে। তাকে বলেন আমাদের মেয়েকে ফেরৎ দিক, তা নাহলে তাকে ৪ঠা মে, ১৯৮৯ সালে লংগদু ঘটনার পরিণতি ভোগ করতে হবে,। জুলফিকার আলী রুপি আমিও তাল দিলাম তাঁর সাথে, আরেফিনের বিরুদ্ধে হাল্কা কিছু বলে। আমি বুঝে গেলাম, খীসা বাবু ভুল করেছেন ফোন নাম্বার জোগাড়ে।
সবার কোন না কোন দুর্বল দিক থাকে। ভাবলাম, আমাকে বাঁচতে হলে খীসা বাবুর দুর্বলতা বের করতেই হবে। তাই অনেক ভেবে, ২০০০ টাকা দিয়ে ১০ জন বেকার ছেলেকে ৫ দিনের জন্য নিয়োগ দিলাম। খীসা বাবুর বাসায় কী হয়, কে যায়, কত বাসাভাড়া ইত্যাদি সব খোঁজ নিতে। ২ শিফটে তারা কাজ করবে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। এসময় খীসা বাবু বা কয়জন মেহমান কী পোশাকে কয়টার সময় খীসা বাবুর বাসায় ঢোকে, কখন বেরোয় তা রেকর্ড করার জন্য। ৫ দিন পরে যা পেলাম, তাতে যা দেখা গেলো তা হলো খীসা বাবু বাসা ভাড়া দেন তাঁর বেতনের চেয়ে বেশী। দৈনিক গড়ে তাঁর বাসায় ২০/২৫ জন বিভিন্ন ধরণের, পোশাকের আসে। তাদের এবং খীসা বাবুর ৫ দিনের পরা পোশাকসহ সব বিবরণ আমার হাতে এসে গেল। বিভিন্ন সুত্র থেকে খবর নিয়ে জানলাম যে, খীসা বাবু চাকরী, বেতন একটা বহিরাবরণ মাত্র। তাঁর টাকা আসে শান্তিবাহিনীর চাঁদাবাজির তহবিল থেকে। এসব খবর নিশ্চিত হবার পরে আমার কন্ঠস্বর আর আলী সাহের কথার ধরণ পরিবর্তন হতে শুরু করলো। খীসা বাবুর ফোনের কথার জবাবে একদিন আলী সাহেব বললেন, ‘আরেফিন খুব খারাপ মানুষ। সরকারের উচ্চ পর্যায়সহ অনেক খারাপ লোকের সাথেও তার যোগাযোগ, তাই একটু সাবধান। আপনার পত্রিকার সম্পাদক তার ঘনিষ্ঠ। আপনার পত্রিকার সম্পাদক সাহেবকে আজ আপনার কথা বলেছে সে, আমি পাশ থেকে শুনেছি’।
এর কিছু সময় পরেই আমার ৩২৫২৯৪ ফোন এ কল এলো খীসা বাবুর। আমি বললাম আপনি আমাদের সহকর্মীর খালু তাই কিছু বলছি না। গলা প্রায় সপ্তমীতে উঠিয়ে বললাম, ‘অনেক বলেছেন। এবার হুমকি ধামকি বাদ দিন’। আমি তাঁর বেতন, বাসাভাড়া, কয়জন লোক কোন দিন কখন কীভাবে এসেছে তাঁর বাসায় আর তিনি কখন কীভাবে কোন রঙয়ের পোশাকে বাসায় ফিরেছেন তাঁর সবিস্তার বর্ণনা দিলাম। বললাম, ‘ভালো থাকতে চাইলে কাল সকালে আপনার সম্পাদক যা বলবেন তা মেনে নেবেন। না হলে বুঝতেই পারছেন এটা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চলে যাবে,। ইঁদুরের মত চ্যাঁ চ্যাঁ করে খীসা বাবু সেই যে ফোন রাখলেন আর কখনো আমাকে ফোন করেন নি। এর কিছু দিন পরেই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী সাথে সরকারের চুক্তি সাক্ষর হয়।
তখন সব থেমে যায়। অবশ্য এর আগে ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ঘটে বর্বরতম এই ঘটনা। এই দিন শান্তিবাহিনীর লোকেরা ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিকৃত করেছিল তাদের প্রতিটি লাশ।
সে সময় নীজের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে অবাক হলাম যে, চাকমাদের একটা বিশেষ গ্রুপ (সবাই না) নিজেরদের সুখ সাচ্ছন্দ নিশ্চিত করতে অপপ্রচারে খুব দক্ষ। বিদেশী বিভিন্ন মাধ্যমে তারা খুব সক্রিয়। আদীবাসীদের জন্য সরকার যে সব সুবিধা দেয় তার অধকাংশই চলে যায় চাকমা আর গারোদের ভাগে। কারণ তারা প্রচারে একটু বেশি সক্রিয়। বিদেশে, দেশে সবাই জানে তাদের কথা। অন্য উপজাতি গোষ্ঠীর কথা, সুবিধা-অসুবিধার কথা মানুষ তথা বিশ্বসম্প্রদায় বেশী জানেন না। এই প্রচারের সুযোগ নিয়েই তারা বিদেশ থেকে লেখাপড়ার বৃত্তির সুযোগ ও অর্থ সাহায্য পেয়ে থাকে যা যায় যাদের হাতে তার নেতৃত্বে থাকে হয় চাকমা না হয় গারো কেউ। এই দুই সম্প্রদায়ের শিক্ষার হার কত জানেন? গারোদের শিক্ষার হার ৮০% এর উপরে। চাকমাদের আরো বেশী। চাকরীতেও এই দুই উপজাতি অনেক বেশী এগিয়ে, সরকারী কোটা সুবিধার মোটা অংশ খান এরাই। নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করতে এখনো তাদের ‘রাজাকার অংশটি’ নানা অপকর্মেও লিপ্ত হন, আগে যেমন হয়েছিলেন শান্তিবাহিনীর নামে। চলতো বেশুমার চাঁদাবাজি, নিরীহ গরিব চাকমাদের উপর, নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে।

যে কারণে এই উপরের ঘটনা মনে পড়ে গেলো তার কথা এবার বলি। ২৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় একটা খবর বেরিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যার মূলে। আরএসও বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমারের ভিতরে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমন ক’রে কিছু হতাহত করে গেরিলাদের মত করে চলে আসে বাংলাদেশে। এর পরই বদলা নিতে তখন মিয়ানমারের সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় চালায় ধরপাকড়, জ্বালাও, পোড়াও, ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন, ইত্যাদি। অত্যাচার বা প্রতিশোধের মাত্রা হয় আরএসও কর্তৃক মিয়ানমারের ভিতরে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমনের মাত্রার উপর। আর রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমন হলেই আরএসও তার ছবি তুলে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। চলে কান্নাকাটি, চাঁদাবাজি, নিজেদের সুখ সাচ্ছন্দের জন্য। এদের সাহায্য করে পাকিস্তান, বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র বিভিন্ন সংগঠন ও দেশ, যারা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি। আমার কাছে এটা গরীব চাকমাদের মেরে শান্তিবাহিনীর সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের বানিজ্যের মত। যে ঘটনা আগে বললাম তা আমার জীবন থেকে। আরএসও এর প্রচার শাখা শান্তিবাহিনী বা বিশেষ সুবিধাভোগী চাকমাদের প্রচার শাখার মতোই শক্তিশালী। তাই বিভ্রান্ত হওয়া থেকে আমাদের সবারই সাবধান হওয়া উচিৎ।
জানি আমার এই লেখার পরে অনেকেই মনঃক্ষুণ্ণ হবেন। কষ্ট পাবেন আমার চাকমা বন্ধুরা যাদের অনেকেই আমার বাড়িতেও এসেছেন, খেয়েছেন। কিন্তু এটা তো আমার জীবন থেকে নেওয়া, তাই আমার কিছুই করার নেই। সত্য এমসময় বলতেই হয়, উপায় থাকে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







