রোহিঙ্গা নিয়ে একটি নিউজ প্রায় সব কটি পত্রিকার পাতায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা কন্যার কান ফোঁড়ানো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে বস্তা ভর্তি টাকা ও স্বর্ণালংকার পাওয়ার কথা জানা যায়। প্রতিবেদনের মাধ্যমে আরো জানা যায়, টেকনাফের দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা ডাকাত নূর মোহাম্মদকে খুশি ও মনোযোগ আকর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে তারই কন্যার কান ফোঁড়ানো অনুষ্ঠানে অতিথিরা প্রতিযোগিতা (কে বেশি উপহার দিতে পারবেন) করে টাকা ও স্বর্ণালংকার দিয়েছে। সর্বসাকুল্যে হিসাব অনুযায়ী উপহার হিসেবে ১ কেজি স্বর্ণালংকার ও ৪৫ লাখ টাকা এবং অন্যান্য উপহার সামগ্রী পাওয়া যায়।
অনুষ্ঠানের অতিথিরা ছিল মূলত রোহিঙ্গা ডাকাত, সন্ত্রাসী ও রোহিঙ্গা ইয়াবা কারবারির দল। একবার ভাবা যায়, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে অথচ তারা এখন সন্ত্রাসী, ইয়াবা কারবারির বলয়ে একত্রিত হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, পূর্বে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা তাদের স্বজাতিকে পেয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, ইয়াবা পাচার সহ অন্যান্য অপরাধমূলক কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অজানা গন্তব্যের দিকে এগুচ্ছে কেননা পরপর দুইবার প্রত্যাবাসনের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ায় সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
রোহিঙ্গা সংকট এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সার্বিকভাবে হুমকি এবং অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশ কয়েকটি কারণে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বৈশ্বিক দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের বিবৃতি প্রদানেই দায়িত্বে সীমাবদ্ধ ভূমিকা আমাদেরকে আরো বিপদাসংকুল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করছে। মোটাদাগে নিম্নোক্ত কারণে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক হয়ে উঠছে বলেই মনে করছি।
প্রথমত: রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের জন্য পরিবেশের যে অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে সেটি পুষিয়ে নিতে বিকল্প যে উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে তার ছিঁটেফাটাও দেখা যাচ্ছে না। এককথায়, আমরা প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তন রোধে যে সব কথার ফুলঝুরি ছড়ায় তার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণ নামমাত্র। সে সব দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে যেয়ে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়ে গেল সেটি পুষিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব। রোহিঙ্গার চলে গেলেও তার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন, যদিও তাদের মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার তেমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত: রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবার ফলে কক্সবাজার ও আশপাশ সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতি হয়েছে। পরিচয় সংকট এবং উদ্বাস্তুদের আগমনে অনেকেই এখন নিজ গৃহে পরবাসের ন্যায় বসবাস করছেন। স্থানীয়দের মাঝে আতংক এবং ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিরাপত্তার বাহিনীর টহল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিয়ত বিচরণ স্থানীয়দের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে।
তৃতীয়ত: রোহিঙ্গা ইস্যুকে সামনে রেখে দেশ এবং বিদেশে ঘাপটি মেরে থাকা অপরাধ চক্র যদি সক্রিয় হয়ে যায় তাহলে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভয়াবহ সংকটের মধ্যে পড়ে যাবে। একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, দেশী এবং বিদেশী চক্রের কারণেই রোহিঙ্গা সংকটের নিষ্পত্তি এখনো হচ্ছে না। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বরাবরের মতোই বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি যদি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তাহলে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সংকটের মধ্যে পড়ে যাবে। জঙ্গিবাদের কার্যক্রম চলমান রাখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাংলাদেশে এনজিওগুলো আর্থিকভাবে সহায়তা করতো বলে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। আবার এমন তথ্যও উঠে আসছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশ কিছু গ্রুপ সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং তাদের মধ্যে নেতাদের দিক নির্দেশনায় অনেকেই পরিচালিত হচ্ছে। গত ২২ আগস্টের সমাবেশ কিন্তু তাই প্রমাণ করে, কাজেই এ সকল গ্রুপ এবং তাদের কার্যক্রমের ব্যাপকতা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে।
চতুর্থত: খবরের বরাতে জানা যায়, রোহিঙ্গা ডাকাত এবং সন্ত্রাসী চক্র টেকনাফের গভীর জঙ্গলে নিজেরা সশস্ত্রভাবে টইল দিতে থাকে এবং দুর্গম এলাকা হওয়ায় পুলিশ তাদেরকে সহসাই আইনের আওতায় আনতে পারছে না। পাশাপাশি এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ বাহিনীকেও ব্যাপক পরিশ্রম ও কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। তবে যে বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসতে হচ্ছে তা হল: পূর্বে যারা আরাকান থেকে বাংলাদেশে এসে নাগরিকত্ব পেয়েছে এবং অনেকেই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত তারা স্বদেশী রোহিঙ্গাদের পেয়ে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে।
পঞ্চমত: বাংলাদেশে একটি চক্র রয়েছে যারা দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে দিতে চায় এবং তারাই রোহিঙ্গাদের মোবাইল ও সিম সরবরাহ করেছে। এই চক্রটি রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফিরে না যেতে উৎসাহ দিচ্ছে। ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দিনে যে সমাবেশের আয়োজন করেছে রোহিঙ্গারা বিষয়টি খুবই দুশ্চিন্তার। তারা মায়ানমারে ফিরে যাবার জন্য বেশ কিছু শর্ত আরোপ করেছে এবং তাদের মধ্যে মায়ানমারে ফিরে যাবার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশী যারা রোহিঙ্গাদের মোবাইল ফোন ও সিম সরবরাহ করেছে তাদেরকে কঠোর নজরদারিতে রেখে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয় পত্র প্রদানে যারা সহযোগিতা করছে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করতে হবে।
অধিকন্তু কক্সবাজারে রোহিঙ্গারা দায়িত্বপ্রাপ্তদের (সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, দেশি-বিদেশি এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকজন) প্ররোচনায় আর্থিক সুবিধার জন্য বিভিন্ন এনজিওতে চাকরি করছে। এর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার এবং ক্রমান্বয়ে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে, এনজিওগুলো মিয়ানমারে ফিরতে রোহিঙ্গাদের নিরুৎসাহ করছে। পাশাপাশি এটিও নিশ্চিত করে বলা যায়, মায়ানমারে রাখাইনে ফিরে গেলেও রোহিঙ্গাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাবার সম্ভাবনা কম এবং তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে বিধায় নিরুৎসাহ করছে। পাশাপাশি এনজিও কর্মীরা তাদের নিজেদের সুবিধার জন্য তাদের প্রকল্প সময় বৃদ্ধির জন্য রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থানের জন্য উৎসাহ প্রদান করছে।

অন্যদিকে খবরে জানা যায়, পুলিশের হাতে আটক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াবা গডফাদার নূর মোহাম্মদকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। রোহিঙ্গা উগ্রপন্থী সংগঠন, মাদক কারবারি সিন্ডিকেটের সশস্ত্র সদস্যরা পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে আহত নূর মোহাম্মদকে হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করে ডাক্তার এবং পুলিশের আহত সদস্যদের চিকিৎসা চলছে। সন্ত্রাসীরা পিছু হটে গভীর জঙ্গলে চলে যায় এবং ঘটনাস্থল থেকে ৪টি এলজি, ১টি থ্রি কোয়াটার, ১৮ রাউন্ড গুলি এবং ২০ রাউন্ড খালি খোসা উদ্ধার করে।
পরিশেষে যে মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল সে বিষয়টিকে কর্তাব্যক্তিদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দ্রুতগতিতে যেভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের যে সকল এনজিও ও কর্তাব্যক্তিরা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বিরোধিতা করে রোহিঙ্গাদের নিরুৎসাহ করছে তাদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। সাথে সাথে আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করে মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যার প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের জন্য মায়ানমার সরকার নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







