রোহিঙ্গা শিবিরে হাতির আক্রমণের খবর মিলছে কিছুদিন ধরেই। এতে আহত নিহত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবির কুতুপালংয়ে শরণার্থীদের সাথে হাতিদের দ্বন্দ্ব কমাতে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ ন্যাচার (আইইউসিএন) এর সাথে একত্রে কাজ শুরু করেছে।
গত ছয় মাস আগে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে আগমনের পর থেকে মানুষ ও হাতিদের মধ্যেকার ঘটনায় অন্তত ১০ জন লোকের মৃত্যু হয়েছে এর মধ্যে ১২ বছরের একটি ছেলেও রয়েছে।
এই সমস্যার ব্যাপকতা নির্ণয়ে পরিচালিত জরিপের প্রতিবেদনে আইইউসিএন বলেন, আচরণগতভাবে নিয়মিত চলাচলের জন্য হাতিরা সর্বদাই চিরাচরিত পথ ব্যবহার করে থাকে। এই চলাচলের পথে তারা যদি কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় তারা সেটাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা আনুমানিক ৫৬০,০০০ শরণার্থীকে স্থান করে দেয়া উচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ কুতুপালং শরণার্থী শিবিরটি এক সময় ঘন বন হলেও এখন হাজার হাজার অস্থায়ী শরণার্থী বাসস্থান নির্মাণ ও সেবা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে । এই অঞ্চলটি এশিয়ান বন্য হাতিদের মিয়ানমার ও বাংলাদেশে চলাচলের অন্যতম একটা রাস্তার বরাবরে অবস্থিত। এশিয়ান হাতিরা গুরুতরভাবে বিপন্ন একটি প্রজাতি, যাদের সংখ্যা আনুমানিক ২৬৮টি ।
৭০ বর্গ কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকাজুড়ে পরিচালিত এই জরিপে শরণার্থী শিবিরের এই এলাকায় হাতিদের ঘন ঘন চলাফেরা করতে দেখা যায়, এবং পশ্চিম সীমানায় এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি। ধারণা করা হচ্ছে এই অঞ্চলে আনুমানিক ৪৫টি হাতি সক্রিয় রয়েছে।
আইইউসিএন-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যেহেতু হাতিরা বিভিন্ন স্থান দিয়ে প্রবেশ করতে পারে। এই এলাকার আশেপাশে বসবাসরত শরণার্থী এবং স্থানীয় বাংলাদেশীরা ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা শিকার হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে উচ্চমাত্রায় উন্মুক্ত। জরিপটি আরও সতর্ক করে বলে, ভবিষ্যতে জনবসতিতে ঢুকে পড়া হাতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে যেহেতু হাতিরা দল বেঁধে চলে এবং শুকনা মৌসুমে খাদ্য ও পানির সন্ধানে তারা ঘুরে বেড়াতে বাধ্য।
হাতে নেয়া এই প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের সাথে পরামর্শক্রমে স্থানীয় জনগণ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী উভয়ের সাথেই কাজ করা হবে।
তাৎক্ষণিকভাবে নিরসনের উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যাম্পের চারিদিকে প্রধান প্রধান জায়গায় ওয়াচ-টাওয়ার স্থাপন, এবং এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ERT) গঠন করা যেখানে প্রতিটি দলে থাকবে ১০ জন করে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক যাদেরকে ঐ অঞ্চলটি পাহারা দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। হাতির চলাচলের রাস্তা এবং প্রবেশ পথগুলো পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা হবে যাতে মানুষ জানতে পারে কোন এলাকাগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। ঝুঁকির ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হবে।
হাতির প্রবেশ পথ তৈরি করতে আইইউসিএন হাতি বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করছেন, যাতে প্রাণীরা তাদের চলাচলের পথগুলো দিয়ে নিরাপদে আসা-যাওয়া করতে পারে এবং আশেপাশে বসবাসরত মানুষের সাথে সম্মুখ সাক্ষাৎ এড়িয়ে যেতে পারে।
ইউএনএইচসিআর-এর কক্সবাজারের এমারজেন্সি রেসপন্সের প্রধান কেভিন অ্যালেন বলেন, এই অংশিদারিত্ব শুধুমাত্র হাতিদের সংরক্ষণ নয়, শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, যাদের অনেকেই ইতোমধ্যে মর্মান্তিকভাবে নিজেদের জীবন হারিয়েছেন।
আইইউসিএন বাংলাদেশের রিপ্রেজেনটেটিভ রাকিবুল আমিন বলেন, আমরা ইতোমধ্যে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করেছি, বর্ষার আগে বা বর্ষার সময় আরও অনেক আক্রমণ হওয়ার ভয় রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে যে উদ্যোগগুলো নেয়ার পরিকল্পনা হয়েছে সেগুলো বিশালাকার পরিবেশগত সমস্যায় ছোট্ট ব্যান্ডএইডের মতো।
এই প্রকল্পটি ইউএনএইচসিআর এবং আইইউসিএন-এর বড় প্রকল্পের একটি অংশ যেখানে সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা হবে এবং কক্সবাজারে শরণার্থী শিবির স্থাপনের ফলে যে বিভিন্ন পরিবেশগত প্রভাবগুলো সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে ।
অন্যান্য পরিকল্পনার মধ্যে আছে রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় বাংলাদেশীদের মধ্যে বনসম্পদের গুরুত্ব এবং শরণার্থী শিবির ও তৎসংলগ্ন এলাকায় পরিবেশের উন্নতির জন্য পরিবেশগত শিক্ষা এবং সচেতনতা প্রদান করা। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পরিবেশ যাতে ভালোভাবে রক্ষা করা যায় এর জন্য বনায়নের ব্যাপারেও প্রচারণা চালানো হবে।








