মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত কবিতার পঙক্তি “জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে”। মানুষ মাত্রই মরণশীল, সবাইকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে।
এ এক অমোঘ সত্য এবং সবাইকে তা মেনে নিতে হবে, মেনে নিতে হয়। তবে কিছু কিছু মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। মেনে নিতে কষ্ট হয় ঐ পরিবারগুলোর এবং তাদের উপর নির্ভর করা মানুষগুলোকে। তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীবের মৃত্যুটাও মেনে নেয়ার মতো নয়। এত অল্প বয়সে পরিবারের গুরুদায়িত্ব পালন করা ছেলেটিকে বাস ড্রাইভারদের হীন প্রতিযোগিতার কারণে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়েছে। রাজীবের মৃত্যুর সাথে সাথে অপমৃত্যু হয়েছে আজন্ম লালিত একটি স্বপ্নের। আজন্ম লালিত স্বপ্নটি এখন ধুঁকে ধুঁকে স্থবির হয়ে যাবে, নিঃশেষ হয়ে যাবে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করা আলোকছটা।

জন্ম থেকেই রাজীবকে সংগ্রামের জীবন বহন করে চলতে হয়েছিল। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মাকে হারায় এবং ৮ম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারায়। তখন থেকেই সংগ্রামী জীবন শুরু হয় রাজীবের। পরবর্তীতে মতিঝিলে খালার বাসায় থেকে পড়াশোনা করে রাজীব এবং ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে তিতুমীর কলেজে ভর্তি হয়। জীবনযুদ্ধের এক সৈনিক হিসেবে ঢাকাতে টিউশনি করে নিজের খরচ মেটানোর পর দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচের যোগান দিতে হত। অতিরিক্ত খরচের যোগান দেওয়ার জন্য একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করত রাজীব। এই ছিল রাজীবের সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি। ভাই দুটোকে মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছিল রাজীব।
রাজীবের মতো দায়িত্বশীল ছেলেকে অস্বাভাবিক মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়েছে। থেমে গেছে তার জীবন। রাজীবের থমকে যাওয়া জীবনের সাথে স্থবির হয়ে গেছে স্কুল পড়ুয়া দুই ভাইয়ের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে রাজীবের এ মৃত্যুর জন্য দায় কার? রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার দুটো গাড়ীর ড্রাইভারকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পূর্ব পর্যন্ত কাউকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত না করা গেলেও কয়েকটি আলোকে আমি ব্যাখ্যা করতে চাই।
প্রথমত: ড্রাইভারের কি আদৌ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল? যদি না থেকে থাকে তাহলে সে কিভাবে রাস্তায় গাড়ি নামানোর সাহস পায়। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিকে দায়িত্বরত পুলিশ সার্জেন্ট কিংবা অন্যান্য এজেন্সিদের দায়িত্বশীল ভূমিকার অভাব ছিল। তা না হলে সে কিভাবে রাস্তায় গাড়ি চালায়। পাশাপাশি বাস মালিকের দায় রয়েছে। একজন অপরিপক্ব কারো হাতে কিংবা লাইসেন্সবিহীন লোকের হাতে কিভাবে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দিয়ে দেয়? ড্রাইভার কিংবা হেলপার নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনরূপ জবাবদিহিতা কিংবা স্বচ্ছতার লেশ মাত্র দেখা যায় না।
আর যদি ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে থাকে তাহলে ড্রাইভারটি যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত না কিংবা রাস্তার গতিবেগ কিংবা অন্যান্য যে নির্দেশক রয়েছে সেগুলো সম্বন্ধে ড্রাইভারদ্বয় অবগত নয়। কারণ, অবগত হলে কোনভাবেই বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো সম্ভবপর নয়। নিয়ন্ত্রণহীন গতি ও বেপরোয়া চালানোর ফলেই রাজীবকে দুই বাসের চিপায় পড়ে হাত হারাতে হয়েছিল এবং মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শেষ পরিণতি মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়েছে। এদিকে রাজীবের মৃত্যুর পরে চতুর্দিকে শোক ছড়িয়ে পড়লেও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বরাবরের মতোই কর্তৃপক্ষকে উদাসীন দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত: বিআরটি থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করা হয় এবং সেখানকার সার্বিক অবস্থা সম্বন্ধে সকলেই কিছুটা অবগত। অনেক সময় দেখা যায় মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বিআরটিএ অফিস পরিদর্শনে গিয়ে কাউকে না কাউকে শোকজ কিংবা বহিষ্কারের আদেশ দেন।পরবর্তীতে কিছুদিন হয়তো স্বাভাবিক নিয়মে কাজকর্ম পরিচালিত হয়ে থাকে পরবর্তীতে আবার পূর্বের ন্যায় দৃশ্যপট তৈরি হয়। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে কারোর হুকুম চলে না। অভ্যন্তরীণ যে শৃঙ্খলা কাঠামো তৈরি হয়েছে তার বাইরে কোন পদস্থ কর্মকর্তার আদেশ মানতে নারাজ সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। অর্থাৎ নিজেদের মতো করে নিয়মের অনুসরণ না করেই দালাল চক্র ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স এর অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে।
যদি নিয়মের অনুসরণ করেই লাইসেন্স প্রদান করা হতো তাহলে প্রতিবছর যে পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটতে তা কখনোই হতো না বলে আমি মনে করি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জনের সাথে কথা বলা জানা গেছে, নিয়ম নীতি মেনে যে লাইসেন্স দেওয়া হয় না বিষয়টা তেমন নয়। তবে এ জন্য অনেক বেগ পোহাতে হয়। তবে, অধিকাংশ লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয় না। এমনও শোনা যায়, উৎকোচ কিংবা ঘুষের বিনিময়ে লাইসেন্স প্রদান করা হয়ে থাকে তা না হলে লাইসেন্সধারী ড্রাইভারদের হাতে অহরহ সড়ক দুর্ঘটনার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতো না।
তৃতীয়ত: ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমও অনেক সময় বাস মালিক সমিতি এবং ড্রাইভারদের নিকট অসহায়। আমার মনে পড়ে, দুর্ঘটনায় যাত্রী নিহত হবার কারণে ড্রাইভারদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখার লক্ষ্যে আইন পাশ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। কিন্তু সরকারের সে উদ্যোগ ভেস্তে যায় নানামুখী অপচেষ্টার কারণে। সে সময়ে বাস মালিক সমিতি এবং ড্রাইভারদের সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে সারাদেশে বাস ও অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ করে কার্যত দেশ অচল করে দেওয়ার পায়তারা করা হয়। বিষয়টা এমন যে, আমরা অপরাধ করবো কিন্তু তার কোন শাস্তি হবে না। এ রকম বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেও অহরহ ভাবে নৃশংস সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলছে। এও দেখা যায়, দুর্ঘটনার পরে চালক লাপাত্তা। অজ্ঞাতনামার নামে মামলা করা হয়ে থাকে। তারপরে তদন্ত কতদূর যায় সেটা কখনো কখনো প্রকাশ পেলেও অধিকাংশ সময় অপ্রকাশিত থেকে যায়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় ঘটনা সম্পৃক্ত হত্যাকাণ্ডের কাজ।
চতুর্থত: জনসংখ্যা এবং গাড়ির তুলনায় রাস্তাঘাট বিশেষ করে প্রশস্ততা তথা লেন সংকট রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় লেন থাকলেও সেখানে নিয়ম মানা হচ্ছে না। উল্টো পথে গাড়ি চালনা একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া বাস ড্রাইভারদের মধ্যে যে অসম প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায় সে বিষয়গুলোও রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। প্রতিবছর সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পরে মারা যাচ্ছে অনেকেই হচ্ছে আহত। সে আহতের রেশ বয়ে নিতে হয় সারাজীবন।
রাজীবের মতো অসংখ্য স্বপ্নবাজ ছেলেমেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ভেঙ্গে যাচ্ছে সাজানো গোছানো সংসার। যে মানুষটি পরিবারের মধ্যমণি হয়ে সকলের মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে স্থবিরতা। তাই এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নিরসনে আমাদের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি সরকারি মহলের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ড্রাইভার তথা লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হবে। রাস্তাঘাটে যানবাহন সংক্রান্ত যে কোন ধরনের আইনের কঠোর বাস্তবায়ন এবং আইন ভঙ্গের কারণে উপযুক্ত শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে। আর যেন রাজীবের মতো কাউকে দুর্ঘটনার কবলে পতিত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে না হয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







