ঢাকার যানজট নিয়ে নতুন কিছু বলার আছে বলে মনে করি না। যানজটবিহীন ঢাকার স্বপ্ন দেখেন না এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। যানজটবিহীন ঢাকা আর জেগে থেকে স্বপ্ন দেখা আমার কাছে একই কথা। এক সমীক্ষাতে দেখা গেছে ঢাকা শহরে যানজটের কারনে নগরবাসীর প্রতিদিন ত্রিশ লক্ষের অধিক কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় চার হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য।
সাম্প্রতিক সময়ে যানজটের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু দেখার বিষয় এই উদ্যোগগুলোর প্রভাব কতটা সদূরপ্রসারী, কতখানি আর্থিকভাবে লাভজনক এবং কতটুকু পরিবেশবান্ধব? নতুন নতুন রাস্তা, ওভারপাস এবং ফ্লাইওভার নির্মাণই কি যানজট সমস্যা নিরসনের একমাত্র পাথেয়? নতুন সড়ক নির্মাণ আর তার সমান্তরালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ নতুন প্রাইভেট গাড়ির নিবন্ধন করে কি ঢাকার অন্যতম প্রধান নাগরিক সমস্যার সমাধান সম্ভব?

উন্নত বিশ্বের সব বড় শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনার মূল প্রতিপাদ্য হল আধুনিক পাবলিক ট্রান্সপোর্টের সঙ্গে একটি পরিকল্পিত নন-মোটরাইজড নেটওয়ার্কের মেলবন্ধন। কিন্তু আরবান যোগাযোগ ব্যবস্থার মৌলিক ধারণাটি ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ন নগরীর জন্য এই মুহূর্তে কতোখানি বাস্তবিক? ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট স্টাডি রিপোর্ট অনুযায়ী, নগরবাসীর প্রাত্যহিক যোগাযোগে (কমিউটার ট্রিপ) শতকরা ৩৮ শতাংশ রিক্সা, ২০ শতাংশ হাঁটা আর মাত্র ২ শতাংশ বাইসাইকেলর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। রাজধানীতে রিক্সার সহজলভ্যতা এবং ভাড়া মোটামুটিভাবে সাশ্রয়ী হবার কারনে প্রাত্যহিক যোগাযোগের জন্য রিক্সা ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশই হলো ছাত্র-ছাত্রী আর ব্যবসায়ী। যাদের যাত্রাপথ সাধারণত ১-৩ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে বর্তমানে মাত্র ৭ শতাংশ নগরবাসীর মালিকানাধীন নিজস্ব প্রাইভেট গাড়ি রাস্তার ৮০ ভাগের অধিক জায়গা দখল করে থাকলেও সরকারি ও বেসরকারি মহলে প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার কমানোর মধ্য দিয়ে কীভাবে সচল ঢাকার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায় এটা নিয়ে কোন আলোচনা হয় না বললেই চলে।
যানযট নিরসনে ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ মাধ্যম হিসাবে বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা ইউরোপ-আমেরিকার সব উন্নত শহরগুলোতে থাকলেও আমাদের নগরীতে বাইসাইকেল ব্যবহার মোট অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মাত্র ২ শতাংশ। তবে আশার কথা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার তরুণদের মাঝে পরিবেশবান্ধব এই বাহন আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হচ্ছে। ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাইসাইকেলের বার্ষিক বিক্রয় বিগত বছরের তুলনাতে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং বার্ষিক চাহিদা ৫ লক্ষের অধিক। এখন দেখার বিষয় একটাই: এই সাইকেলের প্রতি ভালোবাসাটা শুধুই কি হালের চাহিদা নাকি প্রযোজনের তাগিদ। উত্তর জানার জন্য অন্তত আরো দুই-তিনটি গ্রীষ্ম অপেক্ষা করতে হবে।
সমগ্র বিশ্বে বাইসাইকেল ব্যবহারের প্রসঙ্গ আসলে দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় শহরে যোগাযোগের অন্যতম মূল মাধ্যম সাইক্লিং। নেদারল্যান্ডসের মোট ট্রিপের ৩০ ভাগ, ডেনমার্কের ২০ ভাগ, জার্মানীর ১২ ভাগসহ সুইজারল্যান্ড, সুইডেনের কমিউটার ট্রিপের একটি বড় অংশ সাইকেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদি সাইকেল ব্যবহার করে এটা বিবেচনায় নেয়া হয় তাহলে দেখা যায় নেদারল্যান্ডসের প্রায় ৯৯ শতাংশ, ডেনমার্কের ৮০ শতাংশ, জার্মানীর ৭৫ শতাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া বিশ্বের ৫০০র অধিক শহরে ভাড়ায় চালিত বাইসাইকেল বা বাইসাইকেল শেয়ারিং ব্যবস্থা আছে। যারা নিজস্ব বাইসাইকেলের প্রতি আগ্রহী না তাদের কথা চিন্তা করেই এই বাইসাইকেল শেয়ারিং সিস্টেম। মূলতঃ এটি হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট বাইক স্টেশন হতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাইকেল ভাড়া করা এবং কাজ শেষে সাইকেলটিকে যেকোন বাইক স্টেশনে ফেরত দেওয়া। বলা বাহুল্য সমগ্র সিস্টেমটি মনিটিরিং করার জন্য একটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২৪০টি বাইসাইকেল শেয়ারিং প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। আর পঞ্চাশ হাজার সাইকেল নিয়ে বিশ্বের সব থেকে বড় বাইসাইকেল শেয়ারিং প্রোগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে চীনের হংজৌ শহরে।

স্বভাবতই প্রশ্ন চলে আসে ঢাকায় সাইক্লিং জনপ্রিয় আর সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হলে এই মুহূর্তে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিৎ। এই প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলব প্রথমত দরকার নগরীর উচ্চপর্যায়ের নাগরিকদের ইচ্ছা সেসঙ্গে মুখে নয়, করে দেখানোর মানসিকতা। ঢাকার রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকার অনুভূতি যে কিরূপ তা অনুধাবন করাটা ঠাণ্ডা হাওয়াতে বসে চলাচলকারী মানুষের জন্য একটু কষ্টকরই বটে। তবে সমসাময়িক সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের নির্বাচনী ইশতেহারে সচল ঢাকার জন্য নিকটতম যোগাযোগে বাইসাইকেলের ব্যবহারকে উৎসাহিত করার চিন্তা, রাজশাহীর মেয়র কর্তৃক আলাদা সাইকেল লেন করার ঘোষণা, বিভিন্ন দিবসে রাস্তায় সরকারের মন্ত্রী-এমপি-আমলাদের সাইকেল শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন ঘটনা সাইকেল চালকদের কাছে মেঘলা দিনে ধরণীতে প্রবেশ করা সূক্ষ্ম সূর্যালোকের মতো।
নগরীর যোগাযোগে সাইকেলের ভূমিকা বিষয়ে রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যসিফিকের (ইউএপি) পুরকৌশল বিভাগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান ঢাকার সাইকেল ব্যবহাকারীরা মনে করেন সাইক্লিং জনপ্রিয় না হবার জন্য প্রধান তিনটি কারণ: অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা, সাইকেলের নিরাপত্তা আর নিরাপদ সাইকেল পার্কিং এর অভাব। অন্যদিকে যারা সাইকেল ব্যবহার করেন না তাদের কাছে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা, সাইকেলের নিরাপত্তা, অধিক দূরত্বের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য শারীরিক সমস্যা এবং সাইকেল পার্কিং এর অপ্রতুলতা।
গবেষকদের মতে রাজধানীতে পর্যাপ্ত নিরাপদ সাইকেল পার্কিংপ্লেস এর ব্যবস্থার মাধ্যমে সাইকেলের নিরাপত্তা ও পার্কিং সমস্যাটি অনেকাংশেই দূর করা সম্ভব। আর সাইকেল ব্যবহাকারীদের মতে অধিক দূরত্বের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য শারীরিক সমস্যা মূলত একটি মানসিক ব্যাপার। সাইকেল ব্যবহারের অভ্যস্ত না হবার কারনেই নগরবাসীর কাছে এটি একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, একজন প্রারম্ভিক পর্যায়ের সুস্থ সাইক্লিস্টের পক্ষেও বিশ্রাম ছাড়া ৮-১০ কিমি সাইকেল চালানো সম্ভব।

বাংলাদেশের বিদ্যমান ট্রাফিক সম্পর্কিত কোন আইনে সুনির্দিষ্টভাবে রাস্তায় সাইকেল ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে কিছু বলা নেই। সাইক্লিং জনপ্রিয় করতে হলে আইন সংশোধনের মাধ্যমে এই পরিবেশবান্ধব বাহনের সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার যানযট সমস্যা নিরসনে ইতিমধ্যে এমআরটি লাইন-৬ এর প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে এবং আরো দুটি প্রকল্প বিবেচনাধীন (এমআরটি লাইন-৪ এবং এমআরটি লাইন-৫)। এর সঙ্গে ২০৫০ এর মধ্যে তিনটি বিআরটি লাইনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তাই অনেকটা বুকভর্তি আশা নিয়ে বলা যায় অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের ঢাকার পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিয়ে ভাবতে হবে না কিন্তু অল্প দূরত্বের ক্ষেত্রে কী হবে? বাসা থেকে এমআরটি বা বিআরটি স্টেশনে যাবার কী হবে? এটা নিয়ে পরিকল্পনা করার এখনই উপযুক্ত সময়। এক্ষেত্রে প্রারম্ভিকভাবে আলাদা সাইকেল লেনের কথা চিন্তা না করে মিক্সডলেন এবং শেয়ারলেন প্রদান করা যেতে পারে, যেখানে সাইকেল চালকদের অগ্রাধিকার থাকবে। এছাড়া এইসব লেনে গাড়ি পার্কিংসহ যেকোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীর জন্য ট্রাফিক আইনে শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১১.২ নং টার্গেটে পরিষ্কারভাবে বলা আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, সুলভ ও টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া আরো অন্তত একাধিক টার্গেটে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ মাধ্যমের নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। যদি এসডিজি ১১.২ নং টার্গেটের কথাই চিন্তা করা হয় তাহলে আমাদের সরকারের পরিকল্পনা সঠিক পথে আছে বলা যায় কিন্ত তার সঠিক বাস্তবায়ন, সুদূরপ্রসারিতা এবং উপযোগীতা নিশ্চিত করতে হলে ঢাকাতে সাইকেল নেটওয়ার্কের কোন বিকল্প নেই।







