চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
  • নির্বাচন ২০২৬
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

রাখী দাশ পুরকায়স্থ: একজন আলোকবর্তিকা

লাইলা খালেদালাইলা খালেদা
১:৩১ অপরাহ্ন ২৩, এপ্রিল ২০২০
মতামত
A A
রাখী দাশ পুরকায়স্থ

আপনাকে নিয়ে দু’কলম লেখা শুরু করতে আমার কয়েকদিন লেগে গেল। আমরা শোকে মুহ্যমান। কিছুই মাথায় স্থির করতে পারছি না। প্রিয় কেউ হারিয়ে গেলে এমনটা হয়। যদিও আমি পারিবারিকভাবে এতোটাই ব্যস্ত যে সামান্যতম সময় কোন রকম বের করা কঠিন।

শুনছি কয়েকদিন ধরেই রাখি দি অসুস্থ। দেখতে যাওয়ার কথা আমার পক্ষে ভাবনাতেই আনা দায়। একদিন বিকেলে একটু তন্দ্রা মতো এসেছি। স্বপ্ন দেখে ধরফর করে উঠেছি। মনে হলো এখনই যাব দিদিকে দেখতে। হলো না। পরের দিন আদিত্যকে সাথে নিয়ে বের হচ্ছি। পঙ্কজদার ফোন এলো। পঙ্কজ দা আদিত্যকে জানালেন ‘তোমার সাথে লাইলাও নিশ্চয় আসছে, বৌদি বলেছেন, বাচ্চাদের যেন নিয়ে না আসি।’ কোন হাসপাতালের পরিবেশ বাচ্চাদের জন্য অনুকূল নয়। তিনি এতটা অসুস্থতার মধ্যে সাবধান করছেন।

রাখী দাশ এমনই একজন অভিভাবক। সব দিকেই নজর রেখে যাকে যখন স্মরণ করা দরকার, সেখানে পৌঁছে গেছেন নিজস্ব কায়দায়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি আকা লেখার জন্মদিন অনুষ্ঠানে তিনি যেতে পারছেন না, আমাকে ফোন করলেন এমন সময় আমি তখন অনুষ্ঠানের ভেন্যুর উদ্দেশ্য কেবল রওনা করছি। গাড়িতে এক পা দিয়েছি, দিদির ফোন পেয়ে নীচে নেমেই কথা বললাম। অনেক আশীর্বাদ করলেন। বললেন- ‘তোমার দাদা (পঙ্কজ ভট্টাচার্য)যাবে। একটু দেখে রেখ। আমি আগামীতে যাব। তোমার বাচ্চাদের আমার আদর দিও। আমি ওদের বাসায় ডাকবো। একটু সুস্থ হই। তুমি ওদের এখন বাসায় এনো না।’

রাখী দির সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি। কমপক্ষে ২০ বছরের স্মৃতি। কিন্তু শেষ সময়ের স্মৃতিই বারবার মনে হচ্ছে। মনে পড়ছে পুরনো দিনের কথাও। প্রথম কবে রাখী দির সঙ্গে দেখা, মনে করার চেষ্টা করছি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় অফিসের সাংগঠনিক দপ্তরে গিয়ে রাখী দি’র হাত ধরেই সেখানকার সদস্য হই। তার আগে রাখী দি আমাদের প্রিয় নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের স্ত্রী হিসেবে, প্রিয় বৌদি ছিলেন। অফিস শেষ করে মাঝে মাঝে পঙ্কজদাকে নিতে গণফোরাম অফিসে আসতেন। দাদা বেশিরভাগ দিনই আমাকে বলতেন ‘চল তোকে পথে নামিয়ে দেব।’ আমি তখন গণফোরামের সাথে যুক্ত।

আমি মাঝে মাঝে আসতাম, কত কত কথা হতো, গল্প করতেন।

রাখী দি যখনই কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতেন, তার সঙ্গে জীবনের অভিজ্ঞতা যুক্ত করতেন। বাড়ি ফেরার পথে বেশীরভাগ দিনই কথা অসমাপ্ত থাকতেই বাসার সামনে চলে আসতাম। আবার হয়তো অন্য প্রসঙ্গেও কথা উঠতো। লক্ষ্য করতাম, প্রসঙ্গ যাই হোক, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধিমত্তা তথ্য কিংবা তত্ত্বে রাখী দি একইভাবে চালিয়ে যান। বারবার অবাক হতাম, একটা মানুষ এতোটা জানে কীভাবে।

Reneta

রাখী দি অসম্ভব পরিশ্রমী একজন মানুষ ছিলেন। সকালে অফিসে ছুট দিতেন, বিকেলে মহিলা পরিষদ, রাতে বাসায় ফিরে সংসার। এর মধ্যেই লেখা পড়া আত্মীয়তা, দেশ দুনিয়ার খবরা খবর রাখা এবং দাদার রাজনৈতিক জীবনের নানা বিষয়, কর্মীদের সুখ দুঃখেও সাথী হতেন।

দাদার সাথে ছিল তার গভীর প্রেম আর খুনসুটিময় জীবন গাঁথা।

রাখী দির বাসায় গিয়ে কিছু না খেয়ে আসার রেকর্ড নেই আমাদের কারোই। শত ব্যস্ততার ভেতর অতিথি আপ্যায়নে রাখী দি ছিলেন অসাধারণ। তার বাসায় আমাদের ছিল অবাধ আধিপত্য। তার ব্যস্ত জীবনে আমরা ঝামেলা হবো ভেবে মাঝে মাঝে বাসায় যেতেও দ্বিধা কাজ করতো।

একবার রাখী দির ছোট বোন বহ্নি দি’র মেয়ে ঋদ্ধি দাওয়াত দিলো ‘মাসী সরস্বতী পূজা, তুমি এসো।’। আমি সকালে যেতে পারলাম না। গেলাম বিকেলে।

রাখী দি আমাকে আর ঋদ্ধিকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বললেন, টিএসসির দিকে একটু কাজ আছে। তারপর সোজা শামসুন্নাহার হলে। শামসুন্নাহার হলে সরস্বতী পূজার আলোকসজ্জা। দল ধরে মেয়েরা পূজার আমোদে ঘুরছে। আমি কোন দিন ওই হলে যাইনি। রাখী দি সবকিছু দেখাচ্ছেন। চিনিয়ে দিচ্ছেন। বয়স্ক একজনের সাথে দেখা হলো। দিদি বলে প্রণাম করতে গেলেন। বললেন- ‘এখন তেমন আনন্দ হয় না দিদি, আপনাদের সময়ের মতো।’ আরও অনেকের সাথে দেখা হলো।

রাখী দি শামসুন্নাহার হলের ভিপি ছিলেন। প্রতিটি জায়গায় তার স্মৃতি। হাসতে হাসতে বললেন-‘তোমাদের নিয়ে এলাম আমার স্মৃতিচারণ হলো। সময় তো পাই না, কত কী জমা হয়ে থাকে।”

আমি ও আদিত্য তাকে বৌদি সম্মোধনে বেশী ডেকেছি। মাঝে মধ্যে দিদি বলেছি। একবার দাদা বললেন, পহেলা বৈশাখে চল রাঙামাটি যাবি। আদিত্যকেও বলিস, তোর বৌদিও যাবে।’

আদিত্যের ছুটি ছাটার বিষয় আছে, তাই দাদাদের সাথে যাওয়া হলো না। আমি আদিত্য ও আমার ছোট ভাই নিউটন গেলাম পরের দিন। বাংলা নববর্ষের আগের দিন। আদিবাসীদের বিখ্যাত বিজু বা বৈসাবি উৎসব সকালেই হয়ে গেছে। কি আর করা? যেহেতু আমরা দাদা বৌদির সঙ্গী আর তারা হলেন আদিবাসী নেতা সন্তু লারমার মেহমান। আমরা সেবার দল ধরে রাঙামাটির গভীর পাহাড়ে আদিবাসী পরিবারে পরিবারে ঘুরেছিলাম। বৈশাখের খাবার ‘পাজন’ খেয়েছিলাম। আমাদের প্রিয় তরুণ আদিবাসী নেতা দীপায়ন খিশা আমাদের দেখভাল করছিলেন। আমরা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে দাদা বৌদির সঙ্গে পাশাপাশি রুমে দুদিন ছিলাম। এখানে সেখানে ঘুরেছিলাম। এক বিকেলে কাপ্তাই হ্রদের নয়নাভিরাম সৌন্দয দেখতে যাই। ঝুলন্ত সেতু ধরে যেতে যেতে অনেক আনন্দস্মৃতিও তর্পন করেছিলেন রাখী দি। সন্ধ্যারাতে চাকমা রাজার বাড়ি দেখতে গেলাম। ওইসব জায়গায় দাদা বৌদির অনেক স্মৃতি। সেবার রাঙামাটির পাহাড়ে বিশাল বৌদ্ধ বিহারে্ও গিয়েছিলাম। নববর্ষে সেখানে বিশেষ প্রার্থনা ও উৎসব চলছিল। বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা বনভন্তে তখনও জীবিত। তাকেও বেশ কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। উদার সংস্কৃতিমনা ও অন্য সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ পঙ্কজ দা ও রাখী দির সঙ্গে সেবার আমাদের বেড়ানোটি ছিল সারাজীবনের এক শিক্ষা সফর। ঘুরতে ঘুরতে কত যে জীবনবোধের কথা শনেছি। দাদা বৌদির স্মৃতির কথা শুনেছি। প্রতি মুহূর্তে অনুপ্রাণিত হয়েছি।

তাদের রেখে আমরা ঢাকা চলে এলাম। সেই ভ্রমণ ছিল আমাদের অনেক আনন্দের ও স্মরনীয়। আমরা নতুন করে আবিস্কার করেছিলাম আমাদের প্রতি দাদা বৌদির অনাবিল স্নেহ মমতা।

বৌদি ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতেন। একবার পয়লা বৈশাখে দাদা বললেন, চল যাই জিন্দা পার্কে। আমি ও আদিত্য সঙ্গী হলাম। দাদার সঙ্গে বৌদি ছিলেন। আরো অনেকেই ছিলেন। একসঙ্গে ঘুরছি গল্প করছি, তার মধ্যেও আমাদেরকে একটু আলাদা করে দিয়ে বললেন, দুজন একটু ঘুরে এসো। দেখ ভালো লাগবে। রাখী দি এমনই ছিলেন। ভাবতেন, নিজস্ব স্বাধীনতা নিয়ে জীবনকে উপভোগ করুক সবাই।

বৌদিকে সাহস করে বলতাম না আমাদের বাসায় আসেন। দাদাকে মাঝে মধ্যে জোর জবরদস্তি বাসায় আনতাম। আমাদের যে কোন কাজে সঙ্গে দাদা-বৌদি গভীরভাবে যুক্ত থাকতেন। আমাদের কথা তারা মনে রাখতেন।

একবার দাদাকে বাসায় এনে আমরা তুমুল আড্ডা দিচ্ছি। বৌদির রিং এলো দাদার মোবাইলে। দাদা স্বভাবসুলভ জানালো সে তার মেয়ের বাসায়। বৌদি জানালো ‘আমি বাসায় একা, আর তুমি মেয়ের বাসায়, তোমার মেয়ে আমার কিছু হয় না?’

এরপর আর কথা নেই। ড্রাইভার শামীমকে গাড়ি দিয়ে পাঠিয়ে ফোন করলাম, বৌদিকে। আপনি এলে আমাদের ভালো লাগবে। সত্যি সত্যি বৌদি এলেন। আমরা যরপরনাই আনন্দিত। আমাদের হাজীপাড়ার বাসার তের চৌদ্দ বছরের মধ্যে ওই দিনটি ছিল এক বিশেষ দিন। সেদিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বৌদি তার জীবনের অনেক গল্প বলেছিলেন আমাদের। বিশেষ করে শিক্ষা জীবন, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ এর পনের আগস্ট ও পরবর্তী দিন। কঠিন দুঃসহ যুদ্ধদিনের সব গল্প। সেদিনের স্মৃতি আমরা কখনোই ভুলতে পারবো না।

তারপর বহুবার আমাদের বাসায় আসতে চেয়েছিলেন। ব্যস্ততায় আর হয়ে ওঠেনি। আমাদেরও সব সময় ব্যস্ততা ঘিরে রাখে। কত কাজ করার থাকে, কত কথা বলার থাকে কত প্রিয়জনদের সাথে।সময়ই যেন হয়ে ওঠে না।

আমি ও আদিত্য দীর্ঘ দিন ধরেই ‘ক্রিটিক’ নামে একটা সমালোচনা মূলক পত্রিকা করি। সেখানে পঙ্কজ দা উপদেষ্টা। নানা বিষয়ে আলাপ করি। দাদা নিয়মিত লেখা দেন। নিয়মিত একটি কলাম লিখেন ‘দূর্মুখের জার্নাল’।

বৌদিকে বলেছি লিখতে। অনেক ইচ্ছে তার। সরকারি চাকরি করেন। সমালোচনামূলক পত্রিকায় লিখবেন কী করে?

২০১১ সালের কথা। আমরা ‘পারি’ নামে একটি নারী বিষয়ক পত্রিকার কাজ হাতে নিতে যাচ্ছি। বৌদিকে বলাতে তিনি বেশ খুশী হলেন। তাকে উপদেষ্টা সম্পাদক করলাম। অনেক সময় দিয়েছেন ‘পারি’কে। প্রত্যেক সংখ্যা দেখেই খুশী হয়ে ফোন করতেন। ভুল ধরতেন না। বলতেন, আমি সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়েছি। আমি একটি পত্রিকা করেছিলাম ‘চিহ্ন’। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। ‘পারি’ কে বাঁচানো কঠিন হবে। আমি চাই ‘পারি’ বেঁচে থাক। ‘পারি’ সম্পাদকীয় দেখে এডিট করে দিয়েছেন অনেকবার। বাড়ি থেকে বাইরে যেয়ে, ধানমন্ডি লেকে গিয়ে লেখা তৈরি করেছেন পারি’র জন্য। আমাদের জীবনের এই প্রয়াসের সঙ্গে তিনি এটুকু যুক্ত থেকে আমাদেরকে সাহসী করেছেন।

আমি নিজেও নামের বানান নিয়ে বেশ বিচলিত থাকি। রাখী দি তেমন ছিলেন কিনা জানি না। তবে মনে আছে পারি’ পর পর দুই সংখ্যায় তার নামের দুই অংশেই বানান ভুল এসেছে। আমি লজ্জায় তার সামনে যাইনি। তিনি একদিন আমাকে ডাকলেন, আমার আগ থেকেই কান গরম হচ্ছে, না জানি কী শুনবো?

তিনি সে প্রসঙ্গ তুললেন না। অন্য বিষয়ে কথা বললেন।

আর বললেন, প্রেসের ভূত বলে একটা কথা আছে, জনবল কম, টুকটাক ভুল থাকতেই পারে। সেগুলোতে সচেতন হতে হবে।

দীর্ঘদিন মহিলা পরিষদে কাজ করতে কত শতবার দেখা হয়েছে। একসাথে, মিছিলে, ছোট বড় মিটিং, জনসভা করেছি কত কত। অনেক মিছিলে তিনি শ্লোগান শুরু করতেন আমি ও টগর আপা থাকতাম তার ঠিক পিছনে। কত দিন হাঁটতে হাঁটতে তাঁর পায়ের সাথে পা লেগে গেছে, চলার গতিতে ‘সরি’ বলারও সুযোগ হয়নি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ঢাকা মহানগরে আন্দোলন সম্পাদক হিসেবে ‘নির্বাচিত নারী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও তৃণমূলের নারী’দের নিয়ে কাজের দায়িত্ব ছিল আমার। সবার সহযোগিতা নিয়ে আমি কাজগুলো সম্পন্ন করতাম। তাদের মধ্যে রাখী দাশ পুরকায়স্থ, কাজী সুফিয়া আখতার শেলী ও রেহানা ইউনুস অন্যতম। তাদের সবার কাছে আমি বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ।

রাখী দি ছবি তুলতে পছন্দ করতেন এবং সংগ্রহ করতেন। একবার পঙ্কজ দা’র ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কথা ভাবছিলাম আমরা। কিছু পুরাতন ছবি লাগবে। দিদিকে বললাম। তিনি বেশ কিছু ব্যক্তিগত অ্যালবাম বের করে আনলেন। অসংখ্য স্মৃতিময় সব ছবি। প্রতিটি ছবির সাথেই রয়েছে গল্প। সেসব গল্পও শোনালেন। আমি সেখান থেকে কিছু ছবি স্ক্যান করে নিজের সংরক্ষণে রেখেছিলাম।

মহিলা পরিষদেও রাখী দি বিশেষ মুহূর্তে ছবি তোলা পছন্দ করতেন, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলা তার পছন্দ ছিল না। তিনি সব বিষয়ে পরিস্কার থাকতে ও রাখতে পছন্দ করতেন।

আর সবার মতো আমাদের অন্যবন্ধুরা বিশেষ কোনো ব্যক্তি এলে তার সাথে ছবি তুলতে ব্যস্ত হোক তা তিনি পছন্দ করতেন না। নিজের ভাবমূর্তি সুরক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সদা সচেতন। পেছনে কারো কথা তিনি শুনতে পছন্দ করতেন না। তার কর্মী বোনদের ক্ষেত্রেও না।

রাখী দি ছিলেন আধুনিকমনস্ক একজন মানুষ। এক পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ব্যবহার শুরু করেছিলেন। যুগের প্রয়োজনটুকু মাথায় রেখে এর ইতিবাচক সুফলটুকু তিনি নিতেন।

তিনি ছিলেন দূরদর্শী চিন্তার মানুষ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নীতিনির্ধারকদের একজন হিসেবে অসংখ্য লেখালেখির কাজ তার হাত দিয়ে মাথা থেকে নেমেছে। ঢাকা মহানগর কমিটির অফিস তো বটেই, দেশের সব জেলায় ছিল তার অবাধ যাতায়াত। সংগঠনের সব শাখায় ছিলো তার ঘর গোছানোর তাগিদ। কর্মীদের সঙ্গে ছিল তার দাবি নিয়ে শাসন ও বন্ধুত্বসুলভ দিক নির্দেশনা। শত শত কর্মী তার হাতে গড়া। মনে হয় যেন সবারই নাম জানেন। দেখা হলেই কর্মীদের পরিবারের খোঁজ নিতেন। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে হাজার হাজার কর্মী ধরে রাখতে নেতার বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। এই বিশেষ যোগ্যতাটি ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুফিয়া কামালের আদর্শে গড়া নারীর অধিকার আন্দোলন নিয়ে কাজ। যেন উপর থেকে নীচ আর নীচ থেকে উপর সবাইকে প্রাণবন্ত করে রাখে।

রাখী দি সেমিনার, ওয়ার্কশপে ক্লাশ নিতে গেলে প্রায়ই উপমা অর্থে বলতেন, নারীর দশ হাত। তিনি নিজেই ছিলেন দশ হাতের দুর্গা। একসঙ্গে অনেক কাজ করেছেন। আমদের কাছের কর্মীদের তিনি সেই আদর্শে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

আমি অনেক কাছ থেকে দেখেছি আমাদের প্রিয় নেতা পঙ্কজদা অসুস্থ হলে তার প্রতি রাখী দির অপরিসীম দায়িত্বশীলতা ও সেবা। একটুও মুষড়ে পড়তে দেখিনি। দাদার প্রথমবার হার্ট অ্যাটার্ক হলে আমরা মাঝে মাঝেই যেতাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে দাদার রিলিজ দেয়ার সময় ছিলাম। দেখলাম ড. কামাল হোসেন ঢুকলেন। বৌদির সাথে কথা বললেন। পরে শুনলাম হাসপাতালের খরচটা কামাল হোসেন দিতে চেয়েছিলেন। বৌদি বিনিতভাবে বলেছিলেন ‘না ভাই থাক এবার, আমি পারবো, যদি কখনও প্রয়োজন হয় আপনাকে অবশ্যই বলবো।’ তখন পঙ্কজ ভট্টাচার্য গণফোরামের সহসভাপতি। বৌদি টাকাটা নিলেও তেমন অসুবিধা ছিল না। কিন্তু বৌদি তখনও চাকরি করেন। তিনি নিজের সাধ্যের প্রশ্নে সবসময়ই দৃঢ় থাকতেন।

রাখী দি সবসময়ই চাইতেন মেয়েরা রাজনীতিতে আসুক, টিকে থাকুক। পঙ্কজ দার সাথে রাজনৈতিক কাজে অনেকবার ঢাকার বাইরে গেছি। দেখেছি দিদি বারবার দাদার খোঁজ নিয়েছেন। সাথে আমি আছি শুনলে আমার সাথেও কথা বলতেন। অন্য নেতাদের সঙ্গেও কথা বলতেন। তিনি বাইরে কোন জেলা ট্যুরে গেলেও নিজের ব্যস্ততার মধ্যে খোঁজ নিতে ভুলতেন না।

কোনো বিষয়ে হয়তো রাখী দি’র কথা যথাসময়ে পালন করতে পারিনি। সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তার সামনে চুপ করে থাকাটা মনে হতো বেয়াদবি। তাই উত্তরটা দিতেই হতো। তিনি অন্যরকম একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। চেহারাটাই ছিল আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বের আয়না।

আমাদের নেতা পঙ্কজ দা’র অনেকগুলো মেয়ে আছে, রাখী দি এই সব মেয়েদেরই ভালোবাসতেন। আমি একটু বেশিই ভালোবাসা পেয়েছি। কখনও দেশের বাইরে গেলে আমাদের জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসতেন। আমি ও আদিত্য রাখী দির অনেক উপহার পেয়েছি। হাতে কিছু একটা দেবেন আর ছোটদের মতো করে বলবেন কাউকে বলো না। আজ বলেই দিলাম।

আমি ছিলাম পঙ্কজ দা ও রাখী দি দুজনেরই সাংগঠনিক কর্মী। বন্ধু মনে করতেন। আমাদের ভালো মন্দের সাথে মিশে থাকতেন। একদিন আদিত্যকে সঙ্গে নিয়ে বেঙ্গল একাডেমিতে যেতে বললেন। একটা আর্ট প্রদর্শনী চলছিল। উদ্বোধন হলো, খাওয়া হলো, প্রদর্শনী দেখা হলো দাদা বৌদিসহ আরও পরিবারের অনেকের সাথে। সেখানে আমরাও তার পরিবারের সদস্য হয়ে উপস্থিত ছিলাম। ফিরতি পথে মনে হলো বৌদি মনে করেছেন, আমার মন খারাপ, তাই মন ভালো করার জন্য ডেকেছিলেন।

আমি তখন আইন পড়ছি। বৌদি জেনে বেশ খুশি হলেন। শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজেই আগ্রহ করে একদিন আমাকে কোর্টে নিয়ে গেলেন। এছাড়া গুলশানে তার সিনিয়রের চেম্বারেও নিয়ে গেলেন একদিন। এলএলবি পাস করলে বার কাউন্সিলের পরীক্ষার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে কোচিং করার জন্য অ্যাডভোকেট নঈম স্যারের কাছেও নিয়ে গেলেন। আমাকে আইন পেশায় উৎসাহিত করার জন্যই ছিল তার এসব তৎপরতা। রাখী দির বাবা একজন অ্যাডভাকেট ছিলেন। তাই এই পেশার প্রতি তার এক ধরণের শ্রদ্ধা ছিল। একারণেই তিনিও আইন পেশায় আসেন।

আমি একবার খুবই অসুস্থ হয়ে আকস্মিক হাসপাতালে ভর্তি হই। তেমন কেউই বিষয়টি জানতো না। বেশ অসুস্থ। ইমার্জেন্সি থেকে আমাকে হাসপাতাল বেডে দেয়া হয়েছে। ফোন করেছেন রাখী দি। প্রথমবার ধরিনি। আবার কল। আমার দিকে আদিত্য তাকিয়ে বলল কী করবো? আমি বললাম ফোন ধরে, কী বলেন আগে শোন। রাখী দির প্রথম বাক্যটিই ছিল, ‘আমার খুব লাইলার কথা মনে পড়ছে, ওর শরীর কেমন আছে?’ তখন দিদিও বেশ অসুস্থ ছিলেন। কেবলই তার পায়ের অপারেশন হয়েছে।

আবার আমার আকা- লেখার ইস্যু, টেষ্ট রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। তেমন কেউ জানে না। বৌদি ফোন করেছেন আদিত্যকে আমি কেমন আছি জানতে চেয়ে। শোনা মাত্রই বললেন, কাউকে কিছু বলো না। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবকতুল্য। তার আদেশ উপদেশ ছিলো আমাদের আশীর্বাদ। তেমনটিই মেনে চলেছি।

আকা লেখার জন্মের সময় আমি আমেরিকা থাকাকালীন অনেক বার কথা হয়েছে। তিনি খু্ঁজতেন আমেরিকায় পরিচিত কে আছে, যার সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দেবেন।

দেশে এসে শুনলাম রাখী দি অনেক অসুস্থ। মনটা ভীষন খারাপ হলো। ফোন করলেই রিসিভ করতেন। না হলে ব্যাক করতেন। কখনও শুনিনি তার শরীর খারাপ।

গত বছর দাদার জন্মদিনে আমরা আকা- লেখাসহ আকস্মিকভাবে দাদার বাসায় হাজির হলাম। আমার মনেই ছিল না বৌদি তখনও বেশ অসুস্থ। ডাকতে ডাকতে বৌদির ঘরে গিয়ে মেয়েকে কোলে দিয়েছি। বহ্নিদি বুঝতে পেরে কোলে নিতে গেলেন, কিন্তু না দিয়ে সে খুশীতে মেয়ে নিয়েই ধীরে ধীরে এসে সোফাই বসলেন। কত কত গান ছড়া কবিতা আকা লেখাকে শোনালেন সবাই। ঋদ্ধি গান শোনালো ‘চলো চলো চলো যাই, আজ শুভদিনে পিতার ভবনে…’ নম্রতা শোনালো কবিতা। দাদা শোনালেন বিখ্যাত গণসঙ্গীত ‘আয় রে আয়…আয় রে আয়…’। বৌদি বার বার বললেন- আমি অনেক বার বলেছি তোমার দাদাকে, চল বাচ্চাদের দেখে আসি। তোমার দাদা একাই ঘুরে এলো। আমি অনেক রাগও করেছি। ” আকা লেখার জন্মের পর সেই ৬ আগস্টের রাতের সামান্য সময়, আমাদের জন্য ছিল অন্যরকম আনন্দের। সেটিই ছিল অন্যরকম এক অভিষেক। সবাই কি যে খুশী হয়েছি সেদিন।

ঘুরে ফিরে বিআরবি হসপিটালের সেই সন্ধ্যের কথাই মনে পড়ছে। বসে আছি আলো আধারি কক্ষে। বৌদি তার শয্যায় উঠে বসেছেন। দিব্যি সুস্থ মানুষ। আমাদের দেখেই এমন সুস্থ হয়ে উঠলেন। কত কথা হলো। আমাদেরকে বেশিক্ষণ থাকতে বারন করলেন। বললেন, বাসায় যাও, বাবুদের রেখে এসেছো। ওদের রেখে কোথাও যাবে না। ওরাই তো তোমাদের সব। আমি সুস্থ হলে যখন বলবো, তখন ওদের নিয়ে বাসায় এসো। না বলা পর্যন্ত এসো না। বাচ্চাদের কখনো রোগীর ঘরে আনতে নেই’।

জানি, বৌদি আর ডাকবেন না। বলবেন না, তোমরা বাসায় এসো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Jui  Banner Campaign
ট্যাগ: পঙ্কজ ভট্টাচার্য
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

প্রচলিত রাজনীতির বাইরে তারেক রহমানের এক ভিন্ন সন্ধ্যা

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬

পাকিস্তানকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে সুপার এইটে ভারত

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬

মাথায় টিউমার, জরুরি অস্ত্রোপচার- কেমন আছেন তানিয়া বৃষ্টি?

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬

মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস!

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬

নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারে বড় উত্থান

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: মীর মাসরুর জামান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT