কাকরাইল মোড় থেকে মালিবাগ সড়কে ঢোকার সময় মনে হয় যেন স্বেচ্ছায় কোনো এক মৃত্যুপুরিতে প্রবেশ হচ্ছে সবার। এলোপাতাড়ি পড়ে আছে ফ্লাইওভার তৈরির সরঞ্জামাদি। ধুলো আর বালিতে সেখানে চোখ মেলা দায়, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া দুষ্কর।
এমন অরাজক এক সড়ক দিয়েই প্রাণ হাতে চলাচল করছে অসংখ্য মানুষ। সেখানে চোখ তুলে ওপরের দিকে তাকালেই ভয়ে বুক চিনচিন করে উঠে, যেন এখনই গার্ডার ভেঙে পড়ে জীবন শেষ হয়ে যাবে।
পথচারীদের সেই শঙ্কাই নিষ্ঠুর সত্যে পরিণত হলো গতরাতে। রাজধানীর মালিবাগে রেলগেট এলাকায় নির্মাণাধীন উড়ালসড়কের (ফ্লাইওভার) গার্ডার ধসে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন একজন। এ ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দু’জন। নিহত ব্যক্তির নাম স্বপন (৪০)। আহতদের মধ্যে একজন প্রকৌশলী নূরুন্নবী এবং আরেকজন পথচারী পলাশ বলে জানা যায়।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় রক্তের ছোপ শুকিয়ে যাচ্ছে। উৎসুক মানুষের প্রচণ্ড ভীড়, চোখে-মুখে তীব্র আতঙ্ক, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেই মাঝে মধ্যে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। মৃত্যুকূপে রূপ নেয়া আতঙ্কিক সড়ক দিয়েই নিরুপায় পথচারী ও বাস, রিকশা চলাচল করছে।
যমুনা ব্যাংকের বুথের সামনেই দেখা মিলল মাহির সাহারিয়ার নামের স্থানীয় তরুণের। তিনি গতরাতের ভয়াবহ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বলে জানালেন। গত রাত আনুমানিক ১টা বেজে ৫০ মিনিটে
তিনি ভয়াবহ শব্দ শুনতে পান। ভূমিকম্প মনে করে বাসার বাইরে চলে আসেন মাহির। রেলগেটের দিকে তাকাতেই দেখতে পান অনেক ধূুলোবালি উড়ছে। প্রায় দশ মিনিট পর্যন্ত ধুলোবালিতে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ধুলো কমে যাবার পর সামনে গিয়ে দেখতে পান ভয়াবহ অবস্থা। গার্ডার ভেঙ্গে নিচে পড়ে আছে। আর তার ভেতরে মানুষের আর্তচিৎকার।
মাহির বলছেন, তিনি একজনকে পা কেটে বের করতে দেখেন। আরও কয়েকজনকে মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাতে দেখেন এবং একজনকে ঘটনাস্থলে মৃত দেখতে পান। এমন ভয়াবহ ঘটনা তিনি আর দেখেননি জীবনে। তার ধারণা আরও অনেকে আহত হয়েছেন।
হাফিজ নামক এলাকার আরেক যুবক বলেছেন, হতাহতের ঘটনা আড়াল করা হচ্ছে। অনেকে মারা গেছেন। তার অভিযোগ, রাতে ঘটনাস্থল থেকে বস্তা ভরে লাশ সরাতে দেখেছেন স্থানীয়রা। কিন্তু হাফিজ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
শফিকুল ইসলাম নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, একজন ঘটনাস্থলে মারা গেছেন। যে তিনজনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে তারাও মারা গেছেন বলে শুনেছেন তিনি। তবে তিনিও লোকমুখের কথা শুনে বলছেন।
আমিরুল নামক স্থানীয় আরেকজন ব্যবসায়ীর গুরুতর অভিযোগ: ভেঙ্গে পড়া গার্ডার দেখলাম অত্যন্ত নিম্ন মানের রড, সিমেন্ট, পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। তাহলে তা তো ভেঙ্গে পড়বেই।’ তিনি
বলেন, গার্ডার স্থাপনে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞদের কাজে ডেকে আনা হয়েছে। নিহত কাঠমিস্ত্রি স্বপন তাদেরই একজন।
স্বপনের বাড়ি কুমিল্লা। পরিবার পরিজন রেখে তিনি ঢাকায় থেকে রোজগার করেন। মালিবাগ রেল গেইটে তার দোকান। দোকানে গিয়ে কয়েকজন স্থানীয়দের উৎসুক অবস্থায় পাওয়া যায়। তাদের একজন শেখ রমজান আলী। তিনি বলেন, ‘স্বপন মিয়া খুব ভালো লোক ছিলেন। আমি তাকে ১৫ বছর ধরে চিনি। গতরাতে তাকে ডেকে নিয়ে যায় ফ্লাইওভারের কর্মচারিরা। ৫শ’ টাকার জন্য নাইট ডিউটি করতে গিয়ে বেচারার জীবন শেষ হয়ে গেলো!’
মুহাম্মদ কবিরও কাঠের মিস্ত্রি। স্বপন মিয়ার দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা মোবাইল নাম্বারে ফোন করলে মুহাম্মদ কবির রিসিভ করেন। তিনি বলেন, ‘স্বপন রাতে এসে আমার কাছে কয়েকজন লোক চায় ফ্লাইওভারে কাজ করার জন্য। আমি রাজি হইনি। পরে তিনি নিজেই ওই কাজে গিয়ে জীবন দিয়ে দিলো!’ স্বপন নেই মনে হতেই ভীষণ কষ্ট হচ্ছে – বলে তিনি ফোন রেখে দেন।
দুপুরেই ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা দক্ষিণেরর মেয়র সাঈদ খোকন। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা। এতে একজন পথচারী নিহত ও দু’জন আহত হয়েছেন। তাদের একজন প্রকৌশলী। আমরা ব্যথিত, দুঃখিত। নিহতের পরিবারের প্রতি আমি সমবেদনা জানাই। নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে এবং আহতদের দ্রুত
চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, এই ঘটনা তদন্তের জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটির তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে দোষীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হবে বলে জানান মেয়র।
২০১২ সালে চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট জংশনে নির্মাণাধীন উড়ালসড়কের গার্ডার ভেঙে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছিলেন। এর কয়েক বছর পরই মালিবাগে ঘটলো একই ধরনের দুর্ঘটনা।








