আমার ধারণা ছিল, উনি বেঁচে নেই। কৈশোরের শুরুতে প্রথম শুনেছি উনার কবিতা কিন্তু উনার ব্যাপারে শুনিনি কিছুই। সংবাদপত্রে বা টেলিভিশনেও দেখা যেতো না উনাকে। স্বাভাবিকভাবেই মনের মধ্যে তখনই গেঁথে গিয়েছিল যে, এতো বিখ্যাত হতে পারে যার কবিতা, সেই কবি নিশ্চয়ই বেঁচে থাকতে পারেন না। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণত মৃত্যুর পরেই প্রাপ্য মর্যাদা পান আমাদের কীর্তিমানেরা। যারা জীবদ্দশায় এই খ্যাতি প্রাপ্তির সৌভাগ্য লাভ করেন, তাদের মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমে দেখা যায়, পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তারা।
বিভিন্ন হিসাবের মারপ্যাঁচে সেসময় মনে মনে যে হিসাব কষেছি, তাতে উনার বেঁচে থাকার কথা না। নেই তিনি পত্রিকার লেখায়, নেই টেলিভিশনে, এমনকি নেই কোনো কবি সংঘের আড্ডায়। শুধু আবৃত্তির ক্যাসেট চালালে তার ‘কষ্ট নেবে কষ্ট…’ কবিতার মতো করে বিষাদের মেঘ হয়ে আমাদের হৃদয়ের ওপরে নেমে আসতেন তিনি। আর লাইব্রেরিতে থাকা কবিতা সংকলন গ্রন্থের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ লাইন- ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’- রক্তে নাচন তুলতো আমাদের।
তখন আমি সবে ক্যাডেট কলেজের ভর্তি হয়েছি। ঘটনাগুলো তখনকার, দেড় যুগ আগের স্মৃতি। ২০০১ সালের শেষের দিকে বা ২০০২ সালের শুরুতে। ছোটখাটো একটা পিকনিকের অংশ হিসেবে রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়িতে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা হয় আমাদের। সেখানেই ইংরেজি বিভাগের মোস্তাফিজুর রহমান স্যারের মুখে ‘কষ্ট নেবে কষ্ট, হরেক রকম কষ্ট আছে…’ কবিতাটি শুনে আমাদের মনে আগ্রহ বাড়তে থাকে। এরপর পরিচিত হই তার নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতার সঙ্গে। তারও পরে একে একে পড়ে ফেলি তার ৬৪টি কবিতার গ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’।
যাই হোক, সেসব অনেক আগের কথা। এতক্ষণে যে কোনও বাঙালিরই বুঝে ফেলা উচিত, আমি আসলে কার কথা বলছি। হ্যাঁ, বলছি জীবন্ত কিংবদন্তি কবি হেলাল হাফিজের কথা। যিনি নিজে বলেন, ‘কষ্টের আরেক নাম হেলাল হাফিজ’। তিনি অবশ্যই কষ্টের কবি। তার অনেক কবিতার পরতে পরতে বুকচেরা কষ্ট বোবা কান্না হয়ে থাকে। যে পড়তে পারে, সে অনুভব করে। তবে তার কবিতার আগুনে নীলাভ শিখায় উড়ে উড়ে বাঙালি কৈশোর ক্রমেই বেপরোয়া হতে হতে তারুণ্য পা রাখে। দুঃসাহসী দিনে পথচলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে নিষিদ্ধ সম্পদাকীয় কবিতার দুটি লাইনই রক্তের কণিকায় কণিকায় বজ্রঝড় তুলে ক্রমেই আমাদের পরিণত করে তোলে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কাছেও এই লাইন দুটি খুব জনপ্রিয়। নিজেদের পিটি প্যারেড, অবসট্যাকল কোর্স, খেলাধুলা, সর্বক্ষেত্রেই এই লাইন দুটো যুদ্ধের দামামা বাজাতো মনে। এভাবেই কৈশোরেই যুদ্ধ এবং কষ্ট বুঝতে কবি হেলাল হাফিজের কবিতার কাছে বারবার ছুটে যেতে হয়েছে।
যাই হোক, সেসব নিয়ে আরও অনেক কথা হতে পারে। আজ অন্য প্রসঙ্গে এই অবতারণা। বলতে চাচ্ছি, কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে আমার পরিচয় যেভাবে। কলেজ জীবন শেষ, এক পর্যায়ে এইচএসসির রেজাল্ট হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অবাধ বিচরণ শুরু হলো আমার। ২০০৮ সালের ঘটনা। জহুরুল হক হলের ১২১ নম্বর রুমে বন্ধু সুমনের সঙ্গে রুম শেয়ার করে থাকি। তুমুল রাজনীতি করি তখন আমরা। রাতভর আড্ডা। শেষ রাতে একাকী কম্পিউটারে বসে ব্লগে কবিতা লিখি। মাঝে মাঝে ফেসবুকেও দিতাম দুয়েকটা। এরই মধ্যে কবিতার সুবাদে অনেকের সঙ্গেই পরিচয়। অনেকের ব্যাপারে কথা হয়। এমনই একদিন কে যেনো প্রথম জানতে চাইলো, কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে পরিচয় আছে কিনা? ও হ্যাঁ, আমি তখন সাংবাদিকতা বিষয়ে লেখাপড়া করি। আর কবি হেলাল হাফিজ একসময় সাংবাদিকতা করতেন। তাই কবিতা লেখা এবং আমার ডিপার্টমেন্টের নাম শুনে হয়তো কারো মনে হয়েছিল যে, কবি হেলাল হাফিজ আমার পরিচিত হতে পারেন। তবে বাস্তবতা হলো, নতুন ক্যাম্পাস জীবনে ঢুকেই হাজারো রকমের প্রতিবন্ধকতায় আমার মনে ওই চিন্তাই আসেনি কখনো। কিন্তু প্রশ্ন শোনার পর ঠিক যেনো চমকে গেলাম আমি। পাল্টা প্রশ্ন করলাম, উনি বেঁচে আছেন নাকি? আমার কথা শুনেই হেসেই দিলেন প্রশ্নকর্তা। বললেন, নিয়মিত প্রেস ক্লাবে বসেন উনি। দেখা করে এসো গিয়ে একদিন।
এরপর যাবো যাবো করেও যাওয়া হয় না। তবে বিভিন্নভাবে কবির নাম্বার জোগাড় করে ফেললাম। ফোন দিতে চাই, দেই না। এভাবে কিছুদিন গেলো। তারপর একদিন ফোন দিলাম। জহুরুল হক হলের ছাত্র পরিচয় দিয়ে কথা বললাম। কবি জানালেন, উনি আমার কয়েকটি রুম আগের একটি রুমে থাকতেন। সম্ভবত ১১৬ বা ১১৭ নম্বর রুমে। এরপর আমি দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করলে একদিন দেখা করতে বললেন। ততদিনে বছর খানেক কেটে গেছে। মাঝে মাঝে কবির সঙ্গে ফোনে কথা হয়। রাজনীতির পাশাপাশি নিজের পকেট খরচ চালানোর জন্য ততদিনে আমি সাংবাদিকতা শুরু করেছি। সাংবাদিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। বহুমুখী ব্যস্ততার একমাত্র স্বস্তির সময় আমার লেখালেখির সময়টুকু। মধ্যরাতে কবিতা লিখি। বন্ধু হিমেলের চাপে প্রথম কবিতার বইটাও প্রকাশ হয়ে গেছে ততদিনে। তারও পরে এক অখণ্ড অবসরের বিকালে, প্রচণ্ড মনখারাপ ও হতাশার লগ্নে কবির নাম্বারে ফোন দেই। কথায় কথায় সেদিন দেখা করতে বললেন উনি। ব্যস, সরাসরি গিয়ে হাজির প্রেস ক্লাবে। সেই প্রথম পরিচয়। এরপর কারণে অকারণে অনেকবার গিয়েছি। এখনও যাই। অনেক কথা হয়। কথার পরে কথা লেগে থাকে।
এরপর থেকে কারণে অকারণে প্রেস ক্লাবে যাই। একে ওকে সঙ্গে নিয়ে যাই। তরুণ কবি বন্ধুদের কবিতা শোনাই। একদিন কবি বললেন, ‘তোর নিজের কবিতার ব্যাপারে তো কিছু বলিস না। একদিন তোর কবিতা নিয়ে আয়। তোর বই দে।’ অন্যের কবিতা কোনটা কেমন হচ্ছে জানতে চাই, নিজের কবিতার ব্যাপারে কিছু না বলায় কবি একদিন বললেন, ‘তোর নিজের কোনও চাওয়া পাওয়া নাই?’ আমি বললাম, ‘আপনাকে আমি আমার কবিতা পড়তে দিয়েছি। আরও দেবো হয়তো। তবে মতামত প্রয়োজন নেই। খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয় এটা। আপনি নিজে থেকে বললে সেটা অবশ্যই আলাদা ব্যাপার। সেটা আপনার ব্যক্তিগত মতামত।’ ভেবেছিলাম মাইন্ড করবে কিন্তু আমার কথা শুনে যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলেন কবি। এরপর তিনি আমাকে বললেন, ‘কবিতা আসলে এমনই।’ এরপর হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমি তো আরও ভেবেছিলাম, বই বের করিস তুই। রিভিউ টিভিউ লিখতে চাস কিনা? তোর কথা শুনে খুশি হলাম। তবে, কোনও চাওয়া নাই, তাহলে আসিস কেনো?’
আমি তখন তাকে কৈশোরের কথা খুলে বলি, তিনি যে আমাদের কাছে একজন কিংবদন্তি, ভেবেছিলাম বেঁচে নেই, এখন দেখা করতে আসি, ভালো লাগে। প্রভৃতি বাস্তব কথাগুলো বলি। আরও অনেক কষ্টর কথা, কষ্টদিনের কথা, রাজনীতির গল্প, প্রেম-ভালোবাসা-হতাশা-নেশা-পেশা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলি আমরা। সম্পর্কটা এক পর্যায়ে এসে জমে যায়। বিশ্বাস বাসা বাঁধে। অনেক দিন দেখা করতে না গেলে, কবি নিজেই ফোন দিয়েছেন এমনও কম হয়নি।
এভাবেই কবিসঙ্গ আমার গতানুগতিক ক্রেজি মুডকে কিছুটা যেনো বদলে দিলো। চলার পথে বেশ কয়েকবার হোঁচট খাওয়ার পরে থমকে গিয়েছি যখন, প্রত্যেকবারই শরণাপন্ন হই তার। তিনি অবলীলায় সমস্যাটাকে নগণ্য বলে চিহ্নিত করেন। এরপর আমারও মনে হয়, আসলেই তো, জীবন সমুদ্রে এসব সমস্যা খড়কুটার মতো। কবি হেলাল হাফিজ জাদু জানেন। তিনি তার কষ্ট পিয়াসী মন নিয়ে রীতিমতো জীবন যুদ্ধে লিপ্ত নবীন সেনানীর কাছে দ্রোণ-তুল্য হয়ে ওঠেন। তার মনের মধ্যে অভিমান বাসা বেঁধে থাকে নীরবে। ক্রোধ নেই। ক্ষমা আর দয়ার সমস্ত মিশ্রণ তিনি, কোনও রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, কী নির্বিকার! বুক ভরা কষ্ট নিয়ে জীবন রাঙিয়ে যাচ্ছেন একাকী। আমরা কী চাইলেই তার মতো এতো নির্মোহ, এতো দয়ার্দ্র হৃদয়ের মানুষ হতে পারি!
যে কারণে এতো কথা বলা, তার মূল উদ্দেশ্য হলো- কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন। ৭০ তম জন্মবার্ষিকী তার (৭ অক্টোবর, ২০১৮), ৭১ এ পা দিলেন এই কবি। বহুবার তাকে রাগানোর মতো কাজ করেছি। প্রথম পরিচয়ের আগেও বেশ কয়েকবার দেখা করতে চেয়েও পারিনি। বিভিন্ন কারণে মিস হয়ে গেছে। পরেও অনেকবার হয়েছে এমন। মিস হয়, আমার শুধুই মিস হয়। এতোবড় একজন মানুষ। তারপরও প্রতিবারই আমাকে আস্কারা দিয়েছেন আরও। পাহাড়ের মতো ব্যক্তিত্ব সহজে টলানো যায় না, আর সাগরের মতো হৃদয় মেলে দিয়ে বসে থাকেন তিনি। যেনো এক নিপুণ তপস্বী।
কখনও কখনও চুপ করে শুনি, শুধু কবির জীবনের কথা শুনি। প্রাপ্তি নিয়ে খুব একটা মাখা ঘামান না তিনি। শুনি তার প্রেম, ভালোবাসা। বোহেমিয়ান জীবন। পালানোর গল্প। হারানোর গল্প। চোখ ভেজে না আমার। চুপ করে বসে থাকি। চা খেতে দেন কবি, নাস্তাও দেন। চুপচাপ খাই। কখনো কবির মুখ মলিন হয়ে ওঠে। কখনও কোনও ইস্যুতে প্রাঞ্জল তিনি। তার অভিব্যক্তি মুগ্ধ করে। হৃদয়ের দেরাজে দেয় ধাক্কা। মনের জলাশয় ভরে ওঠে। কষ্টের সায়রে ঝরে অবিরত টপ টপ বৃষ্টি… মনে হয়, বেঁচে আছি। দুঃখের আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হয়ে ওঠা জীবন নিয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকুন প্রিয় কবি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








