সাউদাম্পটন থেকে: সড়কপথে নটিংহ্যাম থেকে সাউদাম্পটনের দূরত্ব ১৬৮ মাইল। বাস ভ্রমণ আরও দীর্ঘ হল লন্ডনের জ্যামে পড়ে। ঢাকার চেয়ে কম নয় এই শহরের যানজট। আধামাইল পাড়ি দিতে কখনও লেগে গেল এক ঘণ্টা!
নটিংহ্যাম-লন্ডন-সাউদাম্পটন, ৮ ঘণ্টার জার্নি। সময় কাটাতে ঘুমকাতুরে হয়ে পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। সেই ঘুম ভাঙল মোবাইলের টুং-টাং আওয়াজ শুনে। মেসেঞ্জারে মুশফিকুর রহিমের ডাইহার্ট ফ্যান হিসেবে পরিচিত তানভির হাসানের অনুরোধ, সম্ভব হলে ২১ জুন প্রকাশিত ইংল্যান্ডের একটি পত্রিকা যেন সংগ্রহে রাখি।
আগেরদিন নটিংহ্যামের ট্রেন্ট ব্রিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মুশফিকের সেঞ্চুরি নিয়ে এখানকার পত্র-পত্রিকায় খুব বেশিকিছু লেখেনি। তবে সাকিব আল হাসান ব্যাক-টু-ব্যাক সেঞ্চুরির পর বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফে।

মুশফিকুর রহিমের নামে ফেসবুক পাতা খোলার মাধ্যমে তানভির ফ্যান ক্লাব চালু করেছেন। সেটির সদস্য ৫৯ হাজার ছাড়িয়েছে। মুশফিকের জন্মদিনে তাদের অনেকেই একত্রিত হন মিরপুরের কোনো রেস্তোরায়। মুশফিক নিজেও আসেন। বছরে ভক্তদের সঙ্গে কাটে একবেলা। ভক্তদের নানা কৌতূহল মেটান প্রশ্ন-উত্তর পর্বে।
বাংলাদেশের প্রায় সব তারকা ক্রিকেটারের নামেই আছে এমন ফ্যান ক্লাব। সদস্যরা সংগ্রহে রাখেন প্রিয় ক্রিকেটারের নানা ছবি, পেপার কাটিং, স্মারক। বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) সংগ্রহে আছে টাইগারদের বিরল কিছু ছবি-স্মারক, পুরনো ম্যাচ টিকিট। মাঝে মাঝে তারা প্রদর্শনীর আয়োজন করেন এবং ক্রিকেটের অজানা অনেক গল্প ছড়িয়ে দেন সর্বস্তরের ভক্তদের মাঝে।

মো. জসিম উদ্দিন নামের এক পাগল সমর্থক আছেন যার ভাণ্ডারে সংরক্ষিত আছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুই যুগের সোনালী অধ্যায়ের সব অলিগলি। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের জার্সি, ব্যাট, বল, গ্লাভস, প্যাড, স্টাম্প আরও কত কি! তার নেশা দেশি-বিদেশি সকল ক্রিকেটারের অটোগ্রাফ সংগ্রহ। এখন ফটোগ্রাফও সংগ্রহে রাখেন। বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ, অভিষেক টেস্ট থেকে শুরু করে যতগুলো অর্জন এপর্যন্ত হয়েছে, তার কোন না কোন স্বারক সংগ্রহে রেখেছেন জসিম উদ্দিন।
১৯৯৮ সালের মিনি বিশ্বকাপ (বর্তমানে যা আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি) থেকে বিশ্ববরেণ্য ক্রিকেটারদের অটোগ্রাফ নেয়া সেই যে শুরু করেছিলেন, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তার সংগ্রহশালাই হয়ে উঠেছে বিশাল এক রত্নভাণ্ডার।
বিশ্বকাপ কাভার করতে যুক্তরাজ্য এসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অনুসরণ করে ঘুরছি বিভিন্ন শহর-ভেন্যুতে। যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। কত বিচিত্র, কত পরিপূর্ণ, কত আধুনিক তাদের একেকটি মাঠের সংগ্রহশালা।
ইংল্যান্ডে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে ১৮টি কাউন্টি দল। প্রতিটি দলেরই নিজস্ব জাদুঘর বা পুরনো স্মৃতি ধরে রাখার আলাদা সংরক্ষিত জায়গা আছে। এখানকার মাঠে হওয়া আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ক্লাব ক্রিকেটের সাফল্য-ব্যর্থতার সব গল্পই এখানে জীবন্ত। ইংলিশদের প্রায় তিনশ বছরের ক্রিকেট ইতিহাসের খুঁটিনাটি তথ্য আছে সংরক্ষিত।

লন্ডনের দ্য ওভাল সারে কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব মাঠের প্রতিটি কর্নারেই স্থানীয় ও বিদেশি সব ক্রিকেটারের ছবি। তারা কয় মৌসুম খেলেছেন, কি অবদান রেখেছেন, সবই সংরক্ষিত। ব্রিস্টলের গ্লস্টারশায়ার কাউন্টি ক্লাব মাঠের প্রধান ফটকের দেয়ালের ছবিতে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটের অমর বুড়ো ডব্লিউ জি গ্রেস। কার্ডিফে ঝুলে আছে ডাকওয়ার্থ ও লুইসের ছবি। যারা তৈরি করেছিলেন ক্রিকেটের বৃষ্টি আইন।
টন্টনের সমারসেট কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের মিউজিয়াম যেন মেলে ধরেছে ক্রিকেটের আদি ইতিহাস। ক্যারিবিয়ান দুই জীবন্ত কিংবদন্তি স্যার ভিভ রিচার্ডস এবং জোয়েল গার্নার এখানে দীর্ঘদিন খেলার সুবাদে অন্যরকম এক মর্যাদায় আসীন।
নটিংহ্যামের ট্রেন্ট ব্রিজে তেমনি স্যার গ্যারি সোবার্স। এখানকার লাইব্রেরিতে, পত্রপত্রিকা, আত্মজীবনী, ম্যাগাজিন, দুর্লভ কাগজপত্র থেকে শুরু করে সব ইতিহাস লেখা ও ছবিতে আছে। ১৯৩৮ সালে যে ব্যাট দিয়ে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান সেঞ্চুরি করে টেস্টটা বাঁচিয়েছিলেন, সেই ব্যাটও জায়গা পেয়েছে সংগ্রহশালায়।
তিনশ বছরের ক্রিকেট ইতিহাস ইংলিশদের। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রিকেটের পথে যাত্রা পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ করেনি। তবে ক্রিকেটের সঙ্গে বাঙালির যোগসূত্র তারও অনেক আগে থেকে। ১৯৫৫ সালে তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তান দল ভারতের বিপক্ষে টেস্ট খেলার মাধ্যমে সাদা পোশাকের অঙ্গনে যাত্রা শুরু করে ঢাকা স্টেডিয়াম (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম)। টেস্ট আঙিনায় বাংলাদেশের পা রাখা তারও ৪৫ বছর পর, ২০০০ সালে। সময়ের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে বলা চলে। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে তার চেয়েও যোজন যোজন পিছিয়ে।
চাইলেই আপনি দেখতে পারবেন না বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে আমিনুল ইসলাম বুলবুল যে ব্যাট দিয়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন সেটি। সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান মোহাম্মদ আশরাফুল কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফতুল্লায় দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করা শাহরিয়ার নাফীসের সেই ইনিংসের ব্যাটটি। মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবালদের ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানো ব্যাটও। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার অভিষেক ম্যাচের জার্সি কিংবা মাথায় ওঠা গর্বের টেস্ট টুপি দেখার সুযোগ নেই।
সমর্থকরা যেমন নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করে চলেছেন টাইগার ক্রিকেটের স্মারক, ক্রিকেটাররাও নিজ উদ্যোগে ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখেন নিজেদের অমূল্য সম্পদ। অথচ যাদের মাথাব্যথা থাকার কথা এটি নিয়ে, দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা সেই বিসিবি উদ্যোগ নিলেই এসব চলে আসতে পারে এক ছাদের নিচে। হচ্ছে হবে করেও নাজমুল হাসান পাপনের নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী বোর্ড লম্বা সময়েও পারেনি এমন সংগ্রহশালা গড়তে। অথচ আরও দুই মেয়াদ আগে আ হ ম মুস্তাফা কামাল যখন বিসিবির সভাপতি, তখন থেকেই শোনা যাচ্ছিল বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছে ক্রিকেট মিউজিয়াম।
অন্যসব দেশ যখন ইংল্যান্ডকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছে, সমৃদ্ধ করে যাচ্ছে তাদের সংগ্রহশালা, বাংলাদেশ তখন শুরুই করতে পারেনি। আধুনিক স্টেডিয়াম হিসেবে বিবেচিত মিরপুরে শের-ই-বাংলায় দুটি গ্যালারির নামকরণ করা হয়েছে শহিদ জুয়েল ও শহিদ মুশতাকের নামে। অথচ তাদের অবদান সম্পর্কে কিছুই লেখা নেই স্টেডিয়াম চত্বরে।
স্টেডিয়ামে ক্রিকেটারদের দুই ড্রেসিংরুমকে এক করেছে যে লন, সেখানে ঝোলানো আশরাফুলের সেঞ্চুরি উদযাপনের একটি ছবি। কত রান করেছেন সেটিও লেখা ছবির নিচে। কথিত আছে যে, ছবিটি নাকি ওই ম্যাচেরই নয়!








