জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক। ১৯৯২ খৃষ্টাব্দ। তখনো বাঙালীদের কোনো দোকানপাট তেমন একটা ছিলোনা। একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে আমরা বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম। অদূরে একজন ইন্ডিয়ান শিখকে ঘিরে বেশ কয়েকজন ইন্ডিয়ান লোকজনকে অতি মনোযোগী ছাত্রের মতো ঐ শিখ পাঞ্জাবীর কথাগুলো গলাধকরণ করতে দেখলাম। ভদ্রলোক দেখতে বেশ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন। হঠাৎ শিখ ভদ্রলোকটি কি মনে করে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমাদের পাশে বসে আমাদেরকে কোনো সুযোগ না দিয়ে ইংরেজীতে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা কি সিরাজুল আলম খান, শেখ মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, এ এস এম রব, মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, স্বপনকে চেনো? তোমরা শেখ মুজিব আর তাজউদ্দিনকে অবশ্যই চেনো!! আমরা মনে করেছিলাম শেখ মুজিবের কেবিনেটে ওরা সবাই থাকবে। পাকিস্তানী আর তাদের দালাল তোমাদের দেশীয় ওয়ার ক্রিমিনালদের বিচার হবে। তা হয়নি। তোমরা বড়ই বিচিত্র জাতি! তোমাদের হাতেই শেখ মুজিব, শেখ মনিরা মারা গেলো। ভুলের পর ভুলের মাশুল ততদিন পর্যন্ত তোমাদের দিতে হবে-যতদিন না ওয়ার ক্রিমিনালদের বিচার তোমরা করতে পারবে। ভদ্রলোকের নাম জিজ্ঞেস করতেই রাগে ক্ষোভে বেরিয়ে গেলেন। আমরা সবাই তাকে রেস্টুরেন্টের বাইরে রাস্তায় থু থু নিক্ষেপ করতে দেখলাম। লজ্জায় আমাদের সকলের মাথা নতমুখী।
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের অন্যতম হোতা কুখ্যাত রাজাকার সাকা চৌধুরী, ধর্ম রক্ষার নামে ধর্মের বারোটা বাজিয়ে হিটলারের গেষ্টাপো বাহিনীর অনুকরণে বর্বর বদর বাহিনীর কমান্ডার যথাক্রমে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদের গাড়ীতে জাতীয় পতাকা পত পত করে উড়েছে। তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ জাতি হিসাবে সকলেরই প্রত্যক্ষ করার কথা। অবস্থার একপর্যায়ে জনযুদ্ধের গণযোদ্ধারা তথা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করতে থাকে। অনেকেই লজ্জায়, ঘৃণায় মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় গোপন করে। অবস্থা এতই মারাত্মক আকার ধারণ করেছিলো যে- মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি হাসি-ঠাট্টার আর করুণার পাত্রের আকার ধারণ করে। প্রবাসী অভিবাসীর অনেককেই বলতে দেখা গেছে যে, ‘যে দেশে সাকা, মইত্যা আর নিজামীর গাড়ীতে পতাকা উড়ানোর মতো অকল্পনীয় ঘটনা ঘটতে পারে-সেদেশ আমার দেশ নয়। সে দেশে আর ফিরে যাবোনা।’ অনেকে রাগে, ঘৃণায়, ক্ষোভে যায়নি। অনেকেই প্রয়াত। 
বিশিষ্ট সাংবাদিক সওগাত আলী সাগরের ফেসবুক ষ্ট্যাটাস- অধিকাংশ পত্রিকায় যে হেডলাইন করলো- ‘নিজামীর ফাঁসি!এটা কি ঠিক? ‘নিজামী’টা আসলে কে? ‘আলবদর কমান্ডার নিজামী’, ‘ওয়ার ক্রিমিনাল নিজামী’, ‘জামাতের আমীর নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, ‘আলবদর বাহিনীর সর্ব্বোচ কমান্ডারের উপযুক্ত বিচার’, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যার নকশাকারের ফাঁসি’-শিরোনাম করার সাহস দেখাতে পেরেছে কোন কোন পত্রিকা/মিডিয়া? শিরোনাম দেখে কি যায় চেনা? ষ্ট্যাটাসে আমাদের দেশের প্রচার ও গণমাধ্যমের পর্দার পেছনের আসল চরিত্র, সংবাদ ম্যানিপুলেশনের বহুরূপী মুখোশধারীদের চরিত্রকে এতো চমৎকারভাবে তুলে ধরতে খুব কমই দেখা যায়।
বিশ্বের সবদেশে কার্মা শব্দটির প্রতি একধরনের বিশ্বাস পোষণ করতে দেখা যায়। কর্মফলের কথা আমাদের দেশে বেশ বলাবলি করতে শোনা যায়। পাপের প্রায়শ্চিত্ত দুনিয়াতেই হবে-এজাতীয় বিশ্বাসের কথা প্রায়শ: লোকমুখে বলতে দেখা যায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধচারণ করেও কুখ্যাত সাকা, মুজাহিদ আর নিজামীর গাড়ীতে আমাদের পবিত্র জাতীয় পতাকা উড়ানো সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো বাঙালী মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। সুপ্ত আগ্নেয়গিরি অবশেষে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, অত:পর কাদের মোল্লার সর্ব্বোচ শাস্তিকে কেন্দ্র করে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠা আজ দস্তুরমতো ইতিহাসের আকর।যুদ্ধাপরা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসাবে প্রয়াত কাজী আরেফ আহমদ রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত সকলেই জানার কথা। কাজী আরেফের সাংগঠনিক দক্ষতার বিষয়টি স্বাধীনতার আগে ও পরে দস্তুরমতো বিস্ময়কর বলে কাজী আরেফের চরম রাজনৈতিক শত্রুদেরও বলতে দেখা যায়। ১৯৯১ সালে নির্বাচন পরবর্তী সময় যতই অতিবাহিত হচ্ছিলো বিএনপি সরকারের কার্যক্রম ততই স্বাধীনতা আন্দোলনের শত্রু গোলাম আজম আর জামায়াত কেন্দ্রিকতা আর জামায়াত নির্ভরতা বাড়ছিলো। সেই প্রেক্ষাপটে কাজী আরেফসহ অন্যান্য বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, নাট্য সম্প্রদায়, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, সামাজিক আন্দোলনের সংগঠকদের সমন্বয়ে দিবারাত্রি আলোচনাক্রমে বেগম জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠন করে আন্দোলন পরিচালিত হলে এক পর্যায়ে তা দাবানলের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বানের স্রোতের মতো নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা সদলবলে এগিয়ে এলে অবশেষে তা ‘গণ
আদালতে’র প্রকাশ্য ময়দানে লক্ষজনতার সামনে বিচারের মাধ্যমে পূর্ণত্বপ্রাপ্ত হয়। সেই সময়কার ‘গণআদালত’কেন্দ্রিক তিনকোটি নতুন প্রজন্মের ভোটব্যাংককে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ওয়াদা করেছিলো-ট্রাইবুন্যাল গঠন ও যুদ্ধাপরাধের বিচার তারই স্বাভাবিক পরিণতি। এজন্য ইতিহাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অবশ্যই প্রশংসিত হবে। জ্বলজ্বল করে জ্বলবে। ইতিমধ্যে আবেগতাডিত হোক বা হাইব্রীডদের নিত্যদিনের সুরেই হোক বা অনেকে অনেক কথামালার ফুলঝুরি ছড়িয়ে দলীয় আনুগত্যের সর্ব্বোচ তৈলমর্দনের বহি:প্রকাশ ঘটানো বিচিত্র কিছু নয়! সবকিছু কমনসেন্সকেন্দ্রিক বিচার বিবেচনা করে অনেককে আঁচ করে বলতে দেখা যায় যে, বর্তমানে আওয়ামী লীগ যে পথ পরিক্রম করছে- তা থেকে পেছন ফেরার আদৌ কোনো পথ খোলা আছে কি? চতুর্দিকে গুম, হত্যা, নিরাপত্তাহীনতা, জনগণের আমানত খেয়ানতসহ(রাজকোষের অর্থচুরি)দুর্নীতির বিষবাস্প যেভাবে দেশ ও জাতিকে গ্রাস করেছে, গণতান্ত্রিক আচরণের বিকাশ যেভাবে রুদ্ধ হচ্ছে- তা থেকে যত দ্রুত সম্ভব-মুক্তির পথ বের করতে হবে। ইতিহাসে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডকে উজ্জ্বল করে তুলতে হলে, চিরস্মরণীয় করে ধরে রাখতে চাইলে, গণতান্ত্রিক আচরণের বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে পরিচালিত হতে হলে Pro Independent Strong Opposition Alliance গড়ে উঠতে দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে দলীয়করণ না করে জাতীয়করণ করতে হবে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে- বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন কেবলমাত্র ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত কী? তার আগে কোনো ঘটনায় কি ঘটেনি? বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ কি কোনো ত্যাগ ছাড়াই অর্জিত? কখনো তা হতে পারেনা। একজন বঙ্গবন্ধু তৈরিতে ও মহান স্বাধীনতা আন্দোলনকে জনযুদ্ধে রূপান্তরে জাতীয় পর্যায়ে মহানায়কের সাথে অনেক নায়ক ও বীরদের বীরত্বের কাহিনী নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা বললেই চলে। তৃণমূল পর্যায়ে অসংখ্য স্থানীয় নায়ক ও বীরদের কাহিনী নিয়ে তেমন কোনো জাতীয় উদ্যোগ অনেকটা উপেক্ষিত বললেই চলে।
এভারেষ্ট শৃঙ্গসম বঙ্গবন্ধুকে সম্মানিত করে তুলতে হলে, সামগ্রিকভাবে নতুন প্রজন্মকে সত্যিকার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হলে হিমালয়ের চতুর্পাশ্বের পর্বতরাজী ও দূরবর্তী বৃক্ষরাজীকেও সুশোভিত করে তুলতে হবে। ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘বাংলাদেশ’ দুটোই সমার্থক বিধায় আগামীর বাংলাদেশে এ দুটো বাদ দিয়ে রাজনীতি করা ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখেই বেশ কঠিন হবে। মুসলিম লীগের মতো আওয়ামী লীগ বিলীন হয়ে যেতে পারে- তবে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘বাংলাদেশ’ অমর-অক্ষয়-অব্যয়। তাই আমাদের মনে রাখা দরকার- বঙ্গবন্ধুকে কেবলই দলীয় ও পারিবারিক সম্পদ হিসাবে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টাও একধরনের ব্ল্যাকমেইল বলে বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞদের লেখায় দেখা যায়। 
১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চের আগে একজন অখ্যাত মেজরকে নেতা হিসাবে কেউ শুনেছেন, জানেন বা চিনেন বলে এ পর্যন্ত সরাসরি কেউ দাবী করেনি। তাই স্বভাবতই দেশের সকল নাগরিকের প্রতি পূর্ণশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে একথা বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চের আগে অপরিচিত অখ্যাত একজন সাধারণ মেজরকে বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ বানানোর প্রচেষ্টা এক ধরনের চরম ধৃষ্টতা। তবে এই সুযোগ নেয়ার কারণ- বঙ্গবন্ধুকে দলীয়করণ ও পারিবারিকীকরণ। যেখানে সেখানে হাইব্রীডদের যথেচ্ছ ব্যবহার আর কিছু কিছু তৈলমর্দনকারীদের ব্যক্তিগত এ্যাটিচিউড ও রূঢ আচরণও কম দায়ী নয়!! তাই এব্যাপারে আওয়ামী লীগের কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বটে। তথাপি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ইতিহাসে চির অমর, চির অব্যয়, চির উজ্জ্বল করে ধরে রাখতে চাইলে গণতান্ত্রিক আচরণের বিকাশে Pro Independent Strong Opposition Alliance গড়ে উঠতে দেয়ায় একমাত্র পেসক্রিপশন। কথায় কথায় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত লোকজনদের রাজনৈতিক চরিত্র হনন থেকে বিরত থাকা। তীর যে কোনো সময় নিজের গায়ে ফিরে আসার ইতিহাসের নির্মমতার হাত থেকে কেউ নিস্তার পাইনি। তাই আইয়ূবশাহীর মতো যতোই উন্নয়নের জোয়ারে কিংবা শ্লোগানে গগনবিধারী আওয়াজ উঠুকনা কেন-সব তর্জন গর্জন অর্জন বানের স্রোতের মতো ভেসে যাবে। ইতিহাস আনন্দের। ইতিহাস বেদনার। কখনো কখনো নির্মম। ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণের কথা বললেও আমরা কখনো তা গ্রহন করিনা। তাই স্মরণ রাখতে হবে- আমরা কেউ ফেরেস্তা নই। অদূর ভবিষ্যতে কখনো দু:সময়ে হাইব্রীডদের বাদ দিলে দলের দীর্ঘদিনের সৎ ও ত্যাগী নেতা-কর্মী ছাড়াও স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত সকল শ্রেনী, দলমত নির্বিশেষে সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। গণতান্ত্রিক আচরণের বিকাশে আশাবাদের বিকল্প নেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







