সাধারণ লোকজনের ধারণা অনুযায়ী ‘যুক্তফ্রন্ট’ শব্দের অর্থ অনেকগুলি ফ্রন্টের সংযুক্তি। অর্থাৎ কিছু লোক যারা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তারা কোনোভাবে কোনো একটি বা বিশেষ কিছু উদ্দেশ্যে সকলেই সহমত পোষণ করে একাত্মতা ঘোষণা করেছে।
ইদানীং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘যুক্তফ্রন্ট’ শব্দটি বারবার আসছে। এর আগে বাঙালির রাজনৈতিক জীবনে ১৯৫৪ সালে আরেকবার যুক্তফ্রন্ট এসেছিল প্রবলভাবে। তখন বাঙালি আন্দোলিত হয়েছিল এবং সচেতন পাঠকমাত্রই সহজাতভাবে জানেন যে, সেই ইতিহাস বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বেশ পাকাপোক্তভাবে আসীন। এবং তা ইতিহাস, কাল, স্বার্থ কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় ইতিবাচকভাবে আলোচিত। কিন্তু আজ যে যুক্তফ্রন্টের কথা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে তাতে নেতিবাচকতা ও বক্র সমালোচনার স্থান অনেক বেশি। তাই একটু সচেতনভাবে যারা রাজনীতি নিয়ে ভাবেন তারা প্রায় সকলেই বাঙালির প্রগতিশীলতার বিচারে বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারছেন না।
২০১৮ সালের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে তাতে তারা সরাসরি না বললেও তাদের উদ্দেশ্য জনগণের কাছে পরিষ্কার। ইনিয়ে বিনিয়ে তারা বলার চেষ্টা করেছে যে, তারা আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে দেখতে চায় না। কেন চায় না সে ব্যাখ্যা অবশ্য ফ্রন্টভেদে বিভিন্ন রকম। কারণ, তাদের ফ্রন্টে আরও কেউ কেউ নাকি যোগদানের অপেক্ষায় আছেন। আরও সহজভাবে বললে, তারা আর বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চান না।
আচ্ছা ঠিক আছে, দেখতে চান না, তাহলে কী চান? এবার শুরু হলো রাজপথ কাঁপানো ছাত্রনেতার ইনিয়ে বিনিয়ে বলা। তিনি বলতে চান, আওয়ামী লীগ সরকারের এটা খারাপ, ওটা খারাপ, সেটা খারাপ ইত্যাদি। তাহলে ভালো কে? বলুন, এবার তিনি খানিকটা নির্বাক এবং নিরুত্তর। কারণ এবার তার খোলস উন্মোচিত হওয়ার সময় এসে গেছে। এবার অনেকেই তার দিকে বাঁকাভাবে তাকাবে। তারপরও তিনি লাজ শরমের মাথা খেয়ে একজন নারী নেত্রীর মুক্তির কথা বললেন। তিনি বললেন, এতিমের টাকা চোর একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে। এবার থলের বিড়াল লাফ দিয়ে বাইরে চলে এসেছে। না পারেন বিড়াল ধরে থলেতে ঢুকাতে আবার না পারেন ছেড়ে দিতে।
তবে বিড়াল কিন্তু সহজাতভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি আর শব্দ করে বেশ বুঝিয়ে দিল যে, যুক্তফ্রন্টের সেসব লোকজন আসলে বেশি রা করতে শিখেনি। তাদের ওই একই কথা বিএনপিকে ক্ষমতায় চাই। বিএনপি তো নিজেদের ক্ষমতার মসনদে বসাতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট তাহলে কী করবে? তারাওতো বিএনপিকেই ক্ষমতায় চায়। তাই তারা নিজেদের বিএনপিপন্থী আদর্শ লুকিয়ে বিএনপির একটি অগ্রবর্তী সমর্থক ফ্রন্ট তৈরি করল যে, তারা বিএনপির জন্য তথা তাদের নেত্রীর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তখনই ইতিহাসের পাঠাভ্যাসে ব্যস্ত সুবোধ বলে ওঠে যে, এসব জঞ্জাল আওয়ামী লীগে না থেকে অনেক ভালো হয়েছে। তাহলে এটি স্পষ্ট যে, যুক্তফ্রন্ট আসলে একটি উদ্দেশ্য নিয়েই গঠিত হয়েছে।

আবার ইতিহাসের সুবোধ যদি এটিকে অন্যভাবে বিবেচনা করার কথা বলে তাহলে কিন্তু কোনো সমালোচকেরই আর পিঠটান দেয়ার ক্ষমতা থাকে না। কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে তা আসলে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে ঘনীভূত এবং তা হলো জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরোধিতা। কিন্তু কেন এই নেতিবাচকতা সামলে ইতিবাচক লোকদেখানো যুক্তফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা?
একসময় এদের অনেকেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক গঠিত সরকারের অংশবিশেষ ছিলেন। এমনকি আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগেরও নেতা ছিলেন অনেকে। তারা মনে করতেন যে, তাদের নামের কারণেই দল চলে, দল ভোট পায়, দল ক্ষমতায় বসে বা সরকার গঠন করে। তারা রাজনীতি বিজ্ঞানের শিক্ষা ভুলে গেলেন যে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। ফলে একসময় তাদের স্খলন শুরু হলো এবং বিচ্যুত হলেন দল থেকে, আদর্শ থেকে।
কিন্তু কোনোভাবেই নিজেকে বড় ভাবার প্রবণতা গেল না আর ক্ষমতার স্বাদ তো জিহ্বাতে লেগে রইল-ই। আজও আবার সেই আকাঙ্ক্ষাই নতুন করে আড়মোড়া ভেঙেছে। বিরোধিতা করার জন্য যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে তাদের কারোরই জননেত্রীর আশেপাশে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জিত হয়নি। কারণ, তিনি বাংলাদেশের সকল বয়সী জনসমাজকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গঠনের এমন এক স্থানে আছেন যেখান থেকে সারা বিশ্বকে দেখা যায়। তেমনি বিশ্ববাসীও তাকে দেখতে পাচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সকল ক্ষেত্রেই তার অবদান অসামান্য। আর তার জনপ্রিয়তাও সকলের জন্যই ঈর্ষার।
মনে রাখতে হবে যে, জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামক এমন একটি জনপ্রিয় সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতা যে সংগঠন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে সংগঠিত। শুধু বিরোধিতার খাতিরেই নয়, তার অর্জনকে স্বীকার করে নিয়ে বিরোধিতা করতে হবে। দেশের জন্য তার ত্যাগ, উন্নয়নের মহাসড়কে সারা দেশের সংযুক্তি, সারা দেশের সকল ক্ষেত্রে সমান্তরাল উন্নতি বাঙালির হৃদয়ে তাকে আসীন করেছে। কোনো জামানত বাজেয়াপ্ত নাম সর্বস্ব নেতার যুক্তফ্রন্টভিত্তিক চোখরাঙানির তোয়াক্কা এখনকার তরুণ সমাজ করে না। তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, স্বাধীন বাঙালির সুবোধ চেতনা আর কখনোই বিরোধিতাকারীদের ফ্রন্টকে কোনোভাবে সাহায্য বা স্বাগত জানাবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







