২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও সংযোজন বান্ধব নীতি গ্রহণে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বক্তব্যকে মোবাইলফোন সংযোজন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাগত জানিয়েছে। তবে বাজেটের সঙ্গে জারি করা মূল্য সংযোজন কর বিষয়ক প্রজ্ঞাপনের কয়েকটি শর্ত নিয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ মোবাইলফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিআইএ)।
এসব ‘অযৌক্তিক’ শর্তে মোবাইল ফোন শিল্পে মেড ইন বাংলাদেশ স্বপ্ন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে সংগঠনটি।
প্রজ্ঞাপনের শর্ত নিয়ে আপত্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে আশঙ্কার কথা জানাতে আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএমপিআইএ।
সংগঠনটির সভাপতি রুহুল আলম আল মাহবুব বলেন: প্রস্তাবিত বাজেটের সঙ্গে জারি করা প্রজ্ঞাপন-১৬৮’র কয়েকটি শর্ত দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
প্রজ্ঞাপনের শর্ত ক, ঘ, ঙ এবং চ ধারা নিয়েই সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তি।
প্রজ্ঞাপনের শর্ত (ক)-তে বলা হয়েছে, “সংযোজন প্রতিষ্ঠান ব্যতীত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।”
এই শর্ত নিয়েই বিএমপিএ এবং মোবাইলফোন সংযোজনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল আপত্তি। কারণ এই শর্ত অনুযায়ী শুধু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতামুক্ত থাকবে, সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান নয়।
গত অর্থ বছরের বাজেটের সময় জারি করা প্রজ্ঞাপনে সংযোজন এবং উৎপাদনকারী উভয় প্রতিষ্ঠানকেই ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা হয়েছিল।
এবার তার বিপরীত প্রজ্ঞাপন জারির সমালোচনা করে বিএমপিআইএ সভাপতি বলেন: গত বছরের প্রজ্ঞাপন সুবিধার কারণে স্যামসং, ওয়ালটন, সিম্ফনি, আইটেল, উইয়ের মতো কোম্পানি দ্রুততম সময়ে সংযোজন কারখানা স্থাপন করেছে। তাই মাত্র গত বছর প্রজ্ঞাপন জারি করে এবছরই তার বিপরীত প্রজ্ঞাপন বিস্ময় ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।
হতাশার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন: মোবাইল প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোই একটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল ফোন তৈরির জন্য অনেকগুলো সহযোগী শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রাংশ সরবরাহ নিয়ে তা সংযোজনের মাধ্যমেই নিজস্ব ব্র্যান্ড-এর মোবাইল উৎপাদন করে। যেখানে বিশ্বের কোনো কোম্পানিই এককভাবে সবগুলো যন্ত্রাংশ প্রস্তুত করে না, সেখানে বাংলাদেশে তা কীভাবে সম্ভব? এক বছরের মধ্যে অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হলে স্থানীয়ভাবে সংযোজিত মোবাইলের খরচ আমদানি করা মোবাইল সেটের চেয়ে বেশি পড়বে। ফলে এই সংযোজনশিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
প্রজ্ঞাপনের ঙ- শর্ত অনুযায়ী যেসব যন্ত্রপাতি স্থাপনের কথা বলা হয়েছে, তাও ‘অবাস্তব’ বলে মনে করে বিএমপিআইএ। সংগঠনটির মতে চ- শর্ত অনুযায়ী ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনও ‘বাস্তবসম্মত নয়’।
প্রজ্ঞাপনের ঘ-শর্তের মাধ্যমে কেউ একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ পাচ্ছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মোবাইল ফোনের সংযোজন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
শর্ত ঘ-তে বলা হয়েছে: মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম পার্টস বা যন্ত্রাংশ যেমন- প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (পিসিবি), চার্জার, ব্যাটারি, হাউজিং এবং কেসিং উৎপাদনের সক্ষমতা থাকতে হবে।
এরকম সক্ষমতা বাংলাদেশের কয়টি মোবাইল উৎপাদন ও সংযোজনকারীর আছে প্রশ্ন রেখে ‘ওকে মোবাইল’-এর প্রেসিডেন্ট কাজী জসীমুল ইসলাম বলেন: আমরা তো সংযোজন শিল্পে বিনিয়োগ করেছি। হয়তো কারও কাছে ইতোমধ্যেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্লান্ট আছে যেখানে ফ্রিজ, টেলিভিশন তৈরি হচ্ছে। এখানে পিসিবি বোর্ডটা দরকার হয়। প্রতিষ্ঠানটির হয়তো ৫-১০ লাখ পিসিবি বোর্ড করতে কোন সমস্যা হয়না। কিন্তু আমরা তো কেবল মোবাইলের জন্য পিসিবি বোর্ড তৈরি করতে পারছি না। কারণ দেশের এই বাজারে একটি মডেলের মোবাইল ফোন ১০ হাজারের বেশি মার্কেট পায় না। তো আমি এই বোর্ড বানিয়ে করবো কী?
প্রস্তাবিত বাজেট এর সঙ্গে জারি করা প্রজ্ঞাপন নিয়ে মোবাইল আমদানিকারকদের সংগঠন হতাশ হলেও স্বাগত জানিয়েছে কম্পিউটার অ্যান্ড মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ নামে যাত্রা শুরু করতে চলা একটি সংগঠন।
সংগঠনের মহাসচিব মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন (এসিএস) বলেন: প্রস্তাবিত বাজেট দেশীয় মোবাইল ফোন উৎপাদন শিল্পের জন্য খুবই সহায়ক হবে, হাই-টেক শিল্প বিকাশের পথ সুগম হবে। দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতির সুবিধা দিয়ে অর্থমন্ত্রী যে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে মাদারবোর্ড, ডিসপ্লে, হাউজিং অ্যান্ড কেসিং, ব্যাটারি, চার্জার, এয়ারফোনসহ সকল প্রকার অ্যাক্সেসরিজ উৎপাদন শিল্পের জন্য সহায়ক হবে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন উৎপাদকদের জন্য এটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন খাতে দেশী-বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।








