প্যাত্রিক মোদিয়ানো।
তাঁকে বলা হয় স্মৃতির কারিগর।
সাহিত্য বোদ্ধাদের কাছে তিনি স্মৃতি শিল্পের নিপুণ কারিগর – স্মৃতি শিল্পের কথকও বটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ – যুদ্ধের পর মানুষের জীবনে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব, প্রতিক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। সাহিত্যবোদ্ধারা বলছেন মোদিয়ানোর মতো এমন করে এসব বিষয়-আশয় অন্য কারও লেখায় এত গভীরভাবে উঠে আসেনি। তার বেশিরভাগ লেখায় উঠে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট, নিজের শহর, স্মৃতির ভাড়ার, হারানো আত্মপরিচয়ের সংকট, জীবনের অমীমাংসিত সত্যের অনুসন্ধান।
তবে তার সব রচনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি বাহিনীর দখলদারিত্বের সময়ে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের জীবন উপাখ্যান ধ্রুপদী ফরাসি ভঙ্গিমায় অনবদ্যভাবে প্রতিভাত হয়েছে। আর এ সব কারণে সাহিত্যের পরিমণ্ডলে তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়ে থাকে। তাঁর হাতে সাধারণ ফরাসি মানুষের জীবন আরও শিল্পীত ও বাঙময় হয়ে ওঠে।
শুরু থেকেই মোদিয়ানো ফরাসি কথাসাহিত্যে ভিন্নমাত্রার এক স্বাদ উপহার দিয়েছেন। জন্মেছেন প্যারিসের বুলন শহরে ১৯৪৫ সালের ৩০ জুলাই। বাবা ইতালীয় ইহুদি আলবার্তো মোদিয়ানো। মা ছিলেন অভিনেত্রী। বাবার ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকেই মোদিয়ানোর মধ্যে ছিল সংশয়, কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবা আলবার্তো মোদিয়ানোর সুবিধাবাদী চরিত্র ও অবস্থান তাঁর মধ্যে ভিন্ন চিন্তার উন্মেষ যোগায়।
জন্মের পর আপন ভাই রুডি লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে মোদিয়ানো মুষড়ে পড়েন। ভাইয়ের স্মৃতি তাঁকে কাতর করত। বেদনার্ত হয়ে স্মৃতি রোমন্থনে মোদিয়ানো হারিয়ে যাওয়া ভাইকে খুঁজে ফিরতেন। স্মৃতি রোমন্থনের বিষয়টি তাঁর মধ্যে কাজ করতে শুরু করে শৈশব থেকে পরবর্তীতে যার প্রভাব থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পারেননি।
স্মৃতি তাকে নানাভাবে তাড়িত করত। সাহিত্য সমালোচকরা, বলছেন, ভাই হারানোর স্মৃতিই মূলত মোদিয়ানোকে স্মৃতিকার করে তুলেছিল। শুধু তাই নয় মোদিয়ানো ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত সব বই উৎসর্গ করেছেন তাঁর মৃত ভাইকে। বাবার সুবিধাবাদী চরিত্রের জন্য তাঁর সঙ্গে ১৭ বছর বয়সে সম্পর্ক ছিন্ন করে মোদিয়ানো ভিন্ন থাকতে শুরু করেন। মোদিয়ানোর লেখায় তাঁর বাবা নানাভাবে এসেছেন।
মোদিয়ানোর প্রথম উপন্যাসের নাম ‘লা প্লাস দো লেতোয়াল’। প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ। মোদিয়ানোর এই উপন্যাস তার পিতা সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি কারণ লা প্লাস দো লেতোয়াল উপন্যাসে মোদিয়ানো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এক ইহুদি রাজাকারের চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন যা তাঁর পিতাকেই প্রতিনিধিত্ব করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর ফ্রান্স দখলদারিত্বের (১৯৪০-৪৫) সময় আলবার্তো জড়িয়ে পড়েছিলেন সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে। জার্মান দখলদারদের দোসর নিজের বাবাকে মোদিয়ানো কখনোই ক্ষমা করতে পারেননি। সঙ্গতকারণেই মোদিয়ানোর পুরো লেখায়ই নানাভাবে সেই সময়কার চিত্র উঠে এসেছে।
লা প্লাস দো লেতোয়াল উপন্যাসটি যখন বের হয় তখন ব্যাপারটি তার পিতা আলবার্তো মোদিয়ানো সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। ছেলের ওপর তিনি এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে, প্রকাশিত বইয়ের সব কপি কিনে নিয়ে নষ্ট করে ফেলতে চেয়েছিলেন। এর কিছুদিন পর মোদিয়ানা পিতার কাছে আর্থিক সাহায্য চাইতে গেলে পিতা আলবার্তো ক্রোধান্বিত হয়ে তাঁকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুলিশ ডেকেছিলেন। প্রকাশনার বিয়াল্লিশ বছর পর লা প্লাস দো লেতোয়াল ২০১০ সালে জার্মান ভাষায় অনূদিত হয় এবং সেখান থেকে তিনি পুরস্কৃত হন। পোস্ট হলোকাস্ট সাহিত্যকর্মে এই উপন্যাসটি বিশেষভাবে আলোচিত।
এক ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়কে তিনি চিত্রিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন তাঁর রচনায়। লেখার সময় তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই সময়ে ঘুরে বেরিয়েছেন – সে সময়ের জলচিত্র আঁকারও চেষ্টা করেছেন নিরন্তর। সাহিত্য সমালোচকরা এ নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে মোদিয়ানোর সহজ-সরল জবাব ছিল এ রকম, প্রতিটি উপন্যাস লেখার পর আমার মনে হতো, যাক, এবার সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন বিষয়টিকে পরিষ্কার করা গেল। কিন্তু জানি, আমি আবার ফিরে আসব এখানেই। টুকরো টুকরো বিবরণ দিয়ে আঁকব ছোট সব বিষয়, যেগুলো আমার জীবনেরই অংশ। শেষমেশ আমরা যেখানে জন্মগ্রহণ করেছি, সেই স্থান ও কালের দ্বারাই আমাদের সবাইকে নিরুপণ করা হয়।’ এখানে ‘স্থান’ বলতে মোদিয়ানো দ্ব্যর্থহীনভাবে তাঁর একান্ত প্রিয় শহর প্যারিসকেই বুঝিয়েছেন। প্যারিস হলো তাঁর স্বপ্নের শহর। প্যারিসবাসীর আনন্দ-বেদনা-হতাশা তাঁর লেখার আরও একটি প্রধান উপজীব্য।
সাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য যখন নোবেল কমিটি অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত প্যাত্রিক মোদিয়ানের নাম ঘোষণা করলেন তখন অনেকেই চোখ কপালে তুলে চমকে প্রশ্ন তুলেছেন, কে এই প্যাত্রিক মোদিয়ানো? সাহিত্যে মোদিয়ানোর নাম খুব একটা আলোচিত না হলেও তাঁর বিষয়-আশয়, বহুমাত্রিকতার জন্য তিনি একটা বিশেষ শ্রেণীর কাছে গ্রহণযোগ্য। নোবেলে এর আগেও এমন অনেক সাহিত্যিক নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিলেন যাদের অনেককেই নোবেল প্রাপ্তির পর সাধারণ মানুষ চিনতে পেরেছে। তাদের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছে। ফরাসি ঔপন্যাসিক প্যাত্রিক মোদিয়ানোর ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে বলে সাহিত্য বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া না পাওয়া নিয়ে অনেক রাজনীতি, হিসেব-নিকেশ আছে বলেও মনে করেন কেউ কেউ।
সাহিত্যে নোবেলের জন্য কেনো প্যাত্রিক মোদিয়ানোকে বেছে নেয়া হলো তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সুইডিশ নোবেল কমিটি বলেছে, ‘অনায়ও মানব ভাগ্যকে স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলার জন্য তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।’ মোদিয়ানো খুব সহজ-সরল ভাষায় তাঁর লেখায় নিজের দেখা, না দেখা ভুবনের ভূগোল নিয়ে আসেন। স্বচ্ছন্দ গতিতে তিনি গেঁথে চলেন তাঁর আশেপাশের মানুষের জীবন আখ্যান। ‘আমি লিখি শুদ্ধতম ধ্রুপদী ফরাসি ভাষায়। কারণ আমার উপন্যাসের জন্য এ শৈলীই প্রয়োজন যাতে ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন, ভাসমান, অস্থির আবহকে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ভাষায় সুশৃঙ্খল করে তুলতে পারি এবং দিতে পারি স্বচ্ছতম রূপ,’ নিজের লেখা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি এ রকমই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি ভাষা ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক লেখক ম্যাকগুইনসের কাছে।
নোবেল পুরস্কার পেয়ে প্যাত্রিক মোদিয়ানো আবেগাপ্লুত হয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘একজন লেখক হিসেবে যে যা-ই লেখেন না কোনো, এ বিষয়ে তার এক ধরনের অন্ধ পক্ষপাত থাকে। আমি প্রতীক্ষায় আছি, তাদের (নোবেল কমিটি) কাছ থেকে শুনব, কেনো তারা আমাকে এ পুরস্কারের জন্য বেছে নিলেন।’ নোবেল জয়ের পর ‘নোবেল প্রাইজ ডট ওআরজি’র পক্ষ থেকে নেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমার সব সময় মনে হয়, একটি বই-ই লিখে চলেছি আমি।’
নিখোঁজ মানুষ (মিসিং পারসন) তাঁর আরও একটি অন্যতম সেরা উপন্যাস। ১৬৩ পৃষ্ঠার মিসিং পারসন উপন্যাসে দেখা যায় এক স্মৃতিলুপ্ত বেসরকারি গোয়েন্দাকে যে কি না দুনিয়া ঘুরতে থাকে তার আত্মপরিচয় খুঁজে বের করার জন্য। এই আত্মপরিচয় খুঁজে বের করা ছিল তার জীবনের শেষ অনুসন্ধান। সে জানতে চায়, সে আসলে কে? কারণ সে তার স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে। মিসিং পারসনে দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেঁচে যাওয়া এক মানুষ, যে তার নতুন নতুন পরিচয়ের ভেতর আসল পরিচয়টা হারিয়ে ফেলেছে। জার্মানদের হাত থেকে বাঁচার জন্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সে তার স্ত্রী, বন্ধু সবাইকে হারাল। সবাইকে হারিয়ে শুরু হলো তার নতুন এক জীবন যে জীবনের পরতে পরতে চমক, বিস্ময় আর হতবাক হওয়ার পালা।
মোদিয়ানোর লেখা বিশ্লেষণ করে পাঠকরা ‘স্মৃতি’, ‘আত্মপরিচয়’, ‘অপরাধবোধ’ ও ‘সময়’-এর সঙ্গে
নিবিড়ভাবে পরিচিত হবেন। জীবনের এই চার চরম সত্যকে উপলব্ধি করা যায় তাঁর লেখায়।
লেখালেখি করে পঞ্চাশ বছর পার করেছেন মোদিয়ানো। এ যাবত তাঁর বারোটি বই ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। লেখালেখির শুরুর দিকটা কেমন ছিল সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোদিয়ানোর সহজ-সরল স্বীকারোক্তি, ‘লেখালেখির শুরুর দিকে পাণ্ডুলিপিতে চোখ বুলাই, আর আহত বোধ করি। এ কী, ওইসব লেখায় কোনো স্পেস নেই… নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ নেই। ঠিক এভাবেই অনুভব করতাম তখন.. যেন দম ‘আমার বন্ধ হয়ে আসছিল।’
সাম্প্রতিককালে ফরাসি দৈনিক লা ফিগারোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মোদিয়ানো বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে ফিরে একটি স্বপ্ন দেখি আমি – স্বপ্ন দেখি, আমার আর কিছু লিখতে হবে না, তখন আমার মুক্তি। কিন্তু হায়, মুক্তি তো মেলে না। এখনো এক ভূখণ্ড পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে চলেছি যে, এ কাজ কখনো ফুরোবে বলে মনে হয় না।’
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








