কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গভীর রাতে মেয়েদের হলের গেট ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, মেয়েদের নিরাপত্তার শঙ্কায় তিনি সারারাত ঘুমাতে পারেননি।
একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর গুজব শুনে মেয়েরা রাতে বেরিয়ে আসা প্রসঙ্গে তিনি ফেসবুকের অপব্যবহারের কথা বলেন।
বাংলাদেশকে ডিজিটাল দেশ হিসেবে গঠনে আওয়ামী লীগ সরকারের কৃতিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আমরা যে শিক্ষার সুযোগ দিয়েছি, সেই শিক্ষা গঠনমূলক কাজে ব্যবহৃত না হয়ে, এখন গুজব ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বুধবার জাতীয় সংসদের প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে ঢাকা ১৩ আসনের সাংসদ জাহাঙ্গীর কবির নানক কোটা বিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এ কথা বলেন।
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে দেওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেহেতু তারা (সাধারণ শিক্ষার্থী) কোটা চায় না, তাই কোটা থাকবে না।
নারী ক্ষমতায়নে আওয়ামী লীগ সরকারের কৃতিত্বের দাবি করেন তিনি। বলেন, অথচ এই মেয়েরাই এখন বলছে কোটা লাগবে না। মেয়েদের এই দাবিকে অনেক আনন্দের বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘কোটা থাকলেই আন্দোলন হবে, আজ এরা-কাল আরেকজন আসবে। এর থেকে আমি মনে করি কোটা পদ্ধতিই বাতিল করাটাই ভালো হবে।’ এসময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রেখে সরকারি চাকুরিতে কোটা না রাখার কথা জানান তিনি। বলেন, নারীসহ তরুণ শিক্ষার্থী এবং জেলা পর্যায়েও শিক্ষার্থীরা যেহেতু কোটা চায় না তাই কোটা পদ্ধতি রাখার দরকার নেই। সেই সঙ্গে,আন্দোলনকারীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘লেখাপড়া বন্ধ করে রাস্তায় বসে থাকা। পড়ার টেবিল বাদ দিয়ে তারা রাস্তায় নেমে আসলো। ডিজিটাল বাংলাদেশ আমরা করেছিলাম। ফেসবুক-টুইটার ব্যবহার আমরাই শিখিয়েছিলাম। আর আমাদের বিপক্ষেই এখন এগুলোর অপব্যবহার করা হচ্ছে।
‘আমরাও আন্দোলন করেছি। কিন্তু এমন তো আমরা কখনও দেখিনি! একজন উস্কানি দিলো-একজন আন্দোলনকারী মারা গেছে। আর সবাই রাস্তায় নেমে এলো। রাত একটার সময় পর্যন্ত, গেটের তালা ভেঙে মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে। এমনটা কখনও দেখা যায়নি। যদি তাদের কিছু হতো, এর জবাব কে দিতো।’
এসময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে হামলার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান।
রোববার পাঁচ দফা দাবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাকর্মীরা রাজধানীর শাহবাগে পূর্ব ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। রাতভর সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের তাণ্ডব। উপাচার্যের বাসভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারী ও ভিসি নিজেও এই হামলাকারীদের শিক্ষার্থী নয়, বহিরাগত বলে উল্লেখ করেছেন।
রাজু ভাস্কর্য থেকে জাতীয জাদুঘর পর্যন্ত দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যেই রাত সাড়ে ১২টার দিকে এক ছাত্র মারা যাওয়ার গুজব ছড়ানো হয়। তবে পরে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে রাত দেড়টার দিকে কুয়েত মৈত্রী হল, সুফিয়া কামাল হলের মেয়েরা গেইট ভেঙে বের হযে আসেন। রোকেয়া ও শামসুনান্নাহার হলে গিয়ে সেখান থেকেও তারা ছাত্রীদের বের করে আনেন। প্রায় পাঁচ শতাধিক ছাত্রী মিছিল নিয়ে জড়ো হন টিএসসিতে।
যার মৃত্যু নিয়ে গুজব ছড়ানো সেই আবু বকর সিদ্দিক পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাত নিয়ে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তার চোখের কোনে জখম হয়। তিনি বঙ্গবন্ধু হলের আবাসিক শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
এছাড়া আরও কয়েকজনকে রাবার বুলেটের আঘাত নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।
ধাওয়া আর পিটুনিতে আন্দোলনরত ছাত্ররা বাংলা একাডেমির দিকে চলে যায়, আর ছাত্রীরা টিএসসির ভেতরে ঢুকে যায়। কর্মচারীরা ভেতর থেকে গেইটে তালা লাগিয়ে দিলে ছাত্রীরা সেখানে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সকাল ৬টার দিকে টিএসসি থেকে আন্দোলনকারী ছাত্রীদের হলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সোমবার তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিকালে সচিবালয়ে ওই প্রতিনিধি দলের আলোচনা শুরু হয় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের একটি প্রতিনিধি দলের। সরকারের আশ্বাসে ১ মাসের জন্য কোটা সংস্কার আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের এক অংশ এই সিদ্ধান্ত না মেনে আন্দোলন চালিয়ে যান। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্যও বিক্ষুদ্ধ করে আন্দোলনকারীদের। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে সামিল হয়ে রাস্তাঘাট অবরোধ করলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।







