আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে ছেলেদের ক্রিকেটে ঘটতে শুরু আমূল পরিবর্তনের। তিন বছর পর স্বপ্নের টেস্ট আঙিনায় পা রাখে বাংলাদেশ। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়েছে টাইগার ক্রিকেট। একই পথে হাঁটার সুযোগ তৈরি হচ্ছে মেয়েদেরও। আগামী অর্থবছরে বিসিবির পরিকল্পনায় রাখা হবে মেয়েদের ঘরোয়া লংগার ভার্সন ক্রিকেট।
বিসিবি পরিচালক ও ওমেন্স উইংয়ের প্রধান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল জানালেন, সব মানদণ্ড নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আইসিসির কাছে টিম টাইগ্রেসের টেস্ট খেলার আবেদন করবে বিসিবি।
কক্সবাজারে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ চলার সময় সালমা, জাহানারা ও রুমানা জানিয়েছেন, সাদা পোশাকে অভিজাত শ্রেণির ক্রিকেট খেলার জন্য কতটা মুখিয়ে আছেন তারা। দলের ট্রেনার কবিতা পান্ডিয়া মনে করেন, মেয়েদের ফিটনেসে যতটা উন্নতি ঘটেছে তাতে লংগার ভার্সন খেলার সক্ষমতা ক্রিকেটারদের আছে। তাদের স্বপ্ন যে বাস্তবে রূপ নিতে পারে সেটি বিশ্বাস করেন সংশ্লিষ্ট সবাই। শুধু বাংলাদেশের কোচিংস্টাফই নন, পাকিস্তান নারী দলের অস্ট্রেলিয়ান কোচ মার্ক কোলসও মনে করেন টেস্ট আঙিনায় অচিরেই পা রাখবে টিম টাইগ্রেস।
২০০৭ সালে দশম দেশ হিসেবে টেস্ট আঙিনায় পা রাখে নেদারল্যান্ডসের মেয়েরা। একটি টেস্ট খেলার পর গত ১১ বছরে আর সাদা পোশাকে খেলেনি তারা। অভিষেক টেস্ট খেলার পর থমকে আছে শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ড। তবে বেশিরভাগ দেশের নারী দলই নিয়মিত টেস্ট খেলছে।
অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড চালু করেছে মেয়েদের অ্যাশেজও। দুবাইয়ে ছেলেদের এশিয়া কাপ চলার সময় আইসিসি সদর দপ্তর পরিদর্শনে গেলে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের আইসিসির প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসন জানান, বিসিবি মেয়েদের টেস্ট খেলতে চাইলে বিবেচনা করবেন তারা।

টিম টাইগ্রেসের টেস্ট খেলার স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছিলেন মেয়েদের দল, কোচ ও সংশ্লিষ্টরা। তুলে ধরা হচ্ছে তাদের ভাবনা-
সালমা খাতুন (টি-টুয়েন্টি অধিনায়ক)
তামিম-সাকিব ভাইরা যখন খেলে, তখন টিভির সামনে বসে চিন্তা করি কবে খেলব টেস্ট। সাদা একটা জার্সি হবে, ক্যাপ হবে। স্বপ্ন কবে পূরণ হবে জানি না। তবে যদি খেলতে পারি এরচেয়ে আনন্দের আর কিছু হবে না। এখন জাতীয় দলে সিনিয়র-জুনিয়র মিলে যে কম্বিনেশন দাঁড়িয়েছে, আমরা টেস্টেও ভালো খেলতে পারব।
রুমানা আহমেদ (ওয়ানডে অধিনায়ক)
ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা বলে একটা কথা আছে। আমরা যত খেলবো, তত শিখব। কয়টা ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছি আমরা? বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খেললে অনেককিছু শেখা যায়। ব্যাটসম্যান বোলারদের ফোকাস বাড়ে। আমাদের ভেতরে অনেকেই আছে যারা ওয়ানডেতে ১০ ওভার বল করে। টেস্টে সেটিকে ২০ ওভারে টেনে নেয়ারও সক্ষমতা আছে।

সত্যি কথা বলতে লংগার ভার্সন আমার ফেভারিট ফরম্যাট। অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল খেলব এবং অবশ্যই পারব। ওয়ানডে, টি-টুয়েন্টি খেলা তখন আরও ভালো হবে।
জাহানারা আলম (পেসার)
যে টেস্ট না খেলতে পারে সে পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেটার হতে পারে না। আমি চাই ভবিষ্যতে যেন টেস্ট খেলতে পারি। আমিও মুখিয়ে আছি টেস্ট ক্রিকেট খেলার জন্য। টেস্ট খেললে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার শক্তি বাড়বে। আমি সহজাত আউটসুইংঙ্গার। যে কারণে স্বপ্ন দেখি চার-পাঁচটা স্লিপ রেখে বোলিং করছি। লাল বল, সাদা ড্রেসের প্রতি দুর্বলতা আমার মনে হয় সব ক্রিকেটারেই থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয় ইস, আমরা যদি টেস্ট খেলতে পারতাম! আশা করি স্বপ্ন একদিন বাস্তব হবে।
কবিতা পান্ডিয়া (ট্রেনার, নারী দল)
গত কয়েকমাসে মেয়েদের ফিটনেসে অনেক উন্নতি হয়েছে। আপনি এখন তাদের বিরিয়ানি দেবেন তারা খাবে না। অনেক সচেতন মেয়েরা। আমি তাদের যেমন দেখছি তাতে টেস্ট খেলার সক্ষমতা তাদের আছে।

অঞ্জু জৈন (হেড কোচ, নারী দল)
সুযোগ করে না দিলে সক্ষমতা দেখানো কঠিন। দুদিন-চারদিনের ক্রিকেট চালু করলে স্পষ্ট হবে ব্যাপারটা। টেস্ট খেলা শুরু করলে অন্য ফরম্যাটে তারা দ্রুত উন্নতি করবে।
মার্ক কোলস (হেড কোচ, পাকিস্তান নারী দল)
বাংলাদেশ দলে বেশ ভালো কয়েকজন ক্রিকেটার আছে। আমি মনে করি তারা টেস্ট খেলতে পারবে। আয়ারল্যান্ড, পাকিস্তানের টেস্টে ফিরে আসা উচিত, বাংলাদেশের শুরু করা উচিত। সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, এমনকি ভারতও অনেক ক্রিকেট খেলে। এশিয়া যদি মেয়েদের ক্রিকেটে দাপট দেখাতে চায় তাহলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার আরও বেশি খেলা উচিত। একমাত্র দল ভারত যারা সারাবছর ক্রিকেট খেলে। বাংলাদেশও তেমনটি করতে পারে।
নাজমুল আবেদিন ফাহিম (ইনচার্জ, নারী ক্রিকেট)
আমরা স্ট্যান্ডার্ড ক্রিকেট খেলতে পারি, এটা প্রমাণ হয়েছে। এখান থেকে কত উপরে খেলবো সেটা নির্ভর করবে আমরা কী কার্যক্রম নিচ্ছি, কতজনকে খেলার সুযোগ দিতে পারছি এবং তাদের কতটা পরিচর্যা করতে পারছি সেটার উপর। আমরা যদি অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা ঠিকমতো করতে পারি, তাহলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই ভালো জায়গায় যেতে পারব।

তখন বয়সভিত্তিক দল, এ দল, ইমার্জিং দল করলে অনেক খেলোয়াড় তৈরি হবে। ১০-১২ জন ভালোমানের খেলোয়াড় নিয়ে চলবে না। ছেলেদের ক্রিকেটে আমরা যা দেখি সে ধরনের কার্যক্রম এখানেও লাগবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
যারা ভাল দল তারা কিন্তু সেভাবেই আগাচ্ছে। আমরা যদি টেস্ট খেলতে চাই তার জন্য ঘরোয়া পর্যায়ে লংগার ভার্সন খেলতে হবে। আমরা চাইবো টেস্ট খেলতে। আমার ধারণা আমরা যে পর্যায়ে আছি মানসম্পন্ন খেলা খেলতে পারবো টেস্ট ক্রিকেটেও। স্ট্যাটাস পেলে খেলোয়াড় তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা আসবে, খেলোয়াড়রা সেভাবে নিজেদের তৈরি করবে। জাতি হিসেবে ক্রিকেটে আমরা এগিয়ে যাব। আমরা এখন মোটামুটি তৈরি টেস্ট খেলার জন্য।
শফিউল আলম চৌধুরী (চেয়ারম্যান, নারী ক্রিকেট বিভাগ, বিসিবি)
আমাদের প্রচেষ্টা রয়েছে। আইসিসির কাছে প্রস্তাব করার আগে আমরা নিজেদের টেস্টের কাঠামোতে আনতে চাই। যে মানদণ্ড লাগে সেটি নিশ্চিত করতে চাই। আগামী বছর মেয়েদের জাতীয় লিগ ওয়ানডের জায়গায় লংগার ভার্সন করতে চাই। হতে পারে দুই দিনের ম্যাচ।

টেস্ট খেলতে যোগ্যতার যে মাপকাঠি রয়েছে সেটি পুরোপুরি না হলেও ধারেকাছে পৌঁছানোর মতো জায়গায় আমরা রয়েছি। এখন আমরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি এটা যদি ধরে রাখতে পারি, আমরা আইসিসির সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের যদি কোনো শর্ত থাকে তা পূরণ করে টেস্টের পথে হাঁটবো।
জানুয়ারিতে দেশের সব বিভাগে আমরা মেয়েদের স্কুল ক্রিকেট শুরু করছি। আগামী অর্থবছরেই লংগার ভার্সন চালু করার ব্যাপারটি অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং আরও কিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়ার প্রস্তাব করা হবে ক্রিকেট বোর্ডের কাছে।







