জুনের এক ‘প্রাগৈতিহাসিক’ রাত। সেই রাতে মেসি নামের এক মহাতারকার বুক থেকে পাথর সরিয়েছিলেন মার্কোস রোহো নামের এক বছর ২৮’র যুবক।
আজ থেকে শত বছর পরে, যদি কেউ রাশিয়া বিশ্বকাপের গল্প লিখতে বসেন, তবে শুরুটা হওয়া উচিত এমনই। নাহ, মেসি বিশ্বকাপ জেতেননি। কিংবা আরেকবার ফাইনালেও ওঠেননি। তাহলে কী করেছেন?
নিছক একটা গোল করেছেন। সেই গোলে ‘প্রমাণ’ করেছেন তিনি আসলেই মহাতারকাদের একজন। পেশাদার দুনিয়া বড় নির্মম। ফুটবলকে এত কিছু দেয়ার পরও একজন মেসিকে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।
হ্যাঁ হয়েছে। সেটা নিন্দুকের দোষ নয়। কোথাও একটা প্রশ্ন আসলেই উঠে গিয়েছিল। রোনালদো, নেইমার, কিংবা হ্যারি কেনের মতো তারকারা নিজ নিজ দলকে টেনে নিয়ে চলেছেন। সেখানে মেসি কোথায়?

এই রাতের পর হতে পারতো অনেক কিছু। অদৃশ্য কালো কাপড়ে ঢেকে তিনি মাঠ ছাড়তে পারতেন। ঘোষণা দিয়ে দিতে পারতেন অবসরের। সঙ্গে নিয়ে যেতেন ‘আসল জায়গায় না পারার’ তকমা। ফুটবল সেটি হতে দেয়নি। সেটি হতে দেননি জয়সূচক গোলদাতা মার্কোস রোহো। সেটি হতে দেননি মেসি নিজে। সেটি হয়নি ২-১ গোলে নাইজেরিয়া হেরে যাওয়ায়।
এমন চাপের মুখে মেসির পক্ষেই ওভাবে গোল করে দলকে এগিয়ে এগিয়ে দেয়া সম্ভব। আশার কথা হল, এদিন তার শরীরী ভাষা বেশ ভালো মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, খেলা উপভোগ করছেন। যা আগের দুদিন তার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এভার বানেগার কথা ভুলে গেলে চলবে না। প্রথম ৪৫ মিনিটে খেলাটা তিনি একাই পাল্টে দিয়েছেন। মিডফিল্ড সামলে থেকে-থেকে আক্রমণে উঠেছেন। আবার নেমেছেন নিচে। মেসির জন্য বল বানিয়েছেন।
এই কাজটি প্রথম দুই ম্যাচে কেউ করতে পারেননি। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে হারের পর সাম্পাওলির সংবাদ সম্মেলনে নির্মম সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন আর্জেন্টিনার সাংবাদিকরা। দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল সরাসরি এমন, ‘আপনি কী এমন শেখাচ্ছেন যে আপনার খেলোয়াড়রা মেসিকে বল দিতে পারে না!’
বানেগা এদিন পারলেন। মিডফিল্ড আর আক্রমণের লাইনকে যতটুকু পেরেছেন এক সুতোয় গেঁথেছেন। ওই নিখুঁত ক্রস। তারপর উরু দিয়ে নামিয়ে মেসির দৌড়। ফুটবলে প্রথম টাচ সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম টাচ ভালো না হলে নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মেসি ওই প্রথম টাচটি নিখুঁত করতে পেরেছিলেন বলেই গোলটি পেয়েছেন। অবাক করার বিষয় হল এদিন তার সহজাত বাঁ পা ব্যবহার করেননি। ডান পা দিয়ে গোলটি করেন। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে আনতে ইকুয়েডর ম্যাচে যে তিনটি গোল করেছিলেন, সবকটি বাঁ পা দিয়ে।

নাইজেরিয়ার ড্র হলেই চলতো। সেই আশায় তারা অনেক নিচে নেমে নেমে ডিফেন্স করেছে। তবু রোহো আর মেসিকে তারা আটকাতে পারেনি।
আর্জেন্টিনার ডিফেন্স নিয়ে বেশি প্রশ্ন উঠে। আগের গোলরক্ষক রোমেরো থাকলে ডিফেন্সের অনেক ফাঁকফোকর টের পাওয়া যেত না। তিনি না থাকায় প্রথম দুই ম্যাচে ওটামেন্ডিদের যাচ্ছেতাই মনে হয়েছে। মার্কোস রোহো ডিফেন্সে ঢোকায় সেই যাচ্ছেতাইভাব অনেকটা কেটে যায়। ভালো ভালো সব ট্যাকলের দেখা মিলেছে। কিন্তু অভিজ্ঞ মাশ্চেরানো যেটা করলেন, ওটা মেনে নেয়া যায় না।
মাশ্চেরানোর ফাউলটি পেনাল্টি ছিল কী না, সেটি আলাদা প্রসঙ্গ। বক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ওইভাবে দৃষ্টিকটু মার্কিং ওই সময় কেন করতে হবে। কর্নারের সময় রেফারিরা কাছেই থাকেন। এই সময় তাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মাশ্চেরানো সেটি পারেনওনি।

আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় রাউন্ডে গিয়ে মেসিকে বাঁচালেও তাদের নিজেদের বাঁচা অত সহজ হবে না। এই দল নিয়ে আর যা হোক বিশ্বকাপ জেতা যাবে না। এত বড় ম্যাচে এত-এত ভুল পাস কে কবে খেলেছে, তা গুগল করে কিংবা ইউটিউব দেখে ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় রাউন্ডে ভালো করতে হলে এই মোমেন্টাম ধরতে হবে। বড় দলের পক্ষে সেটা সম্ভব। একটি জয়, একটি ম্যাচই তাদের সব বদলে দিতে পারে। গত কয়েকদিনে মেসির বদলে যাওয়া পৃথিবী এদিন যেভাবে বদলে গেছে, আর্জেন্টিনাকে সেভাবে বদলাতে হবে।
বদলাতে হবে একজন মহাতারকার জন্য। ফুটবল যার কাছে ঋণী।







